আক্রান্ত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও ধর্মের দুর্বৃত্তায়ন

তারিখ: ১২/০৭/২০১৫
মদিনায় এক সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়েছি। সদর রাস্তার এক পাশে দেখি মেলার মতো কিছু একটা হচ্ছে। গেলাম। শামিয়ানার নিচে ফলের পশরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। এক কোণে সাদা একটি স্ক্রিন। সামনে কিছু চেয়ার। ডকুমেন্টারি দেখানো হচ্ছে। লোকজন নেই। আমি একা দর্শক হয়ে বসলাম। হজের ওপর চলচ্চিত্র। হযরত মোহাম্মদ (দ.)-এর আগেও মানুষ কিভাবে হজ পালন করত তা দেখানো হচ্ছে। এক সময় দেখা গেল উটে চড়েও কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করছেন কয়েকজন।
এতটুকু পড়ার পর যদি কেউ বলেন, না এটি ঠিক নয়। মোহাম্মদ (দ.) ইসলাম প্রবর্তন করেছেন, হজ তিনিই চালু করেছেন। অতএব যারা এসব বলে তারা মুরতাদ। খারিজ হয়ে গেল ধর্ম থেকে। আপনি তখন কী বলবেন? কী উত্তর হবে এই অজ্ঞতার, মূর্খতার? তাদের এই হুঙ্কার আমাকে মেনে নিতে হবে? হযরত ইব্রাহীম বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেন, যাকে বলা হয়ে থাকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর বা কাবা। তিনি হযরত ইব্রাহীমকে নির্দেশ দেনÑ ‘আমার গৃহকে পবিত্র রাখিও তাদের জন্য যারা তাওয়াব করে এবং যারা সালাতে দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজদা করে এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, ওরা তোমার কাছে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার দ্রুতগামী উস্ট্রের পৃষ্ঠে, ওরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ কাবাকে কেন্দ্র করে তিনিই হজের প্রবর্তন করেন। হযরত মোহাম্মদ (দ.) নয়। এই সত্য বললে কি আমি খারিজ হয়ে যাব?

ধর্ম বিষয়ক এ আলোচনা তুলতাম না, কারণ আমি ধর্মজ্ঞ নই। ধর্মের অপব্যাখ্যা আর ধর্মীয় সূত্রের সাহায্যে নাকচ করে বিতর্ক করাও আমি চাই না; কারণ তাহলে ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করছে তাদের সঙ্গে আমার পার্থক্য থাকবে না। কিন্তু কখনও কখনও বাধ্য হয়ে বলতে হয়। সম্প্রতি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং তা জিইয়ে রাখতে চাচ্ছে হেজাবিরা। তার প্রতিবাদের জন্যই আমাকে লিখতে হচ্ছে। কারণ আরেকটি আছে। বর্তমানে ধর্ম অপব্যবহারকারী এবং স্বার্থগত গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে, যাদের সাংগঠনিক নাম হেফাজত ইসলাম, জামায়াত ইসলাম ও বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। সংক্ষেপে হেজাবি। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্ম সম্পর্কে যাদের জ্ঞান নেই কিন্তু নিজেদের বেজায় ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরতে চান এবং অজ্ঞ ও মূর্খ কিছু লোক। তারা বলতে চান তাদের কথা বার্তায় ও আচরণে যে, বাংলাদেশে তারাই একমাত্র ইসলামের হেফাজতকারী এবং বাংলাদেশ বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যারা আছে তারা হচ্ছে ইসলাম ধ্বংসকারী। সে জন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তারা যত্রতত্র ফতোয়া দিচ্ছেন। খাসজমি দখল করে মসজিদ বানাচ্ছেন, পরে যা মার্কেট হয়। ধর্মের নামে পয়সা নিয়ে নিজেদের পার্থিব সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। তাদের কোন আচরণের আমরা প্রতিবাদ করি না। এ কারণেই আজ তারা সমাজে-রাষ্ট্রে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আমি এবং আমরা অনেকে মনে করি, ইসলাম তাদের কাছে লিজ দেয়া হয়নি এবং আল্লাহ তাদের ইসলামের হেফাজতকারীও বানাননি। ইসলাম তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। একইভাবে বাংলাদেশও তাদের লিজ দেয়া হয়নি। আমরা ছিলাম তাই বাংলাদেশ হয়েছে। তারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। তাদের এ দেশে মাথা তুলে কথা বলার কোন অধিকার নেই। হেফাজতে ইসলামের নেতা ছিলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সৈন্যদের সহযোগী মুজাহিদ। ১৯৭১ সালে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে মসজিদকে আবার মন্দিরে রূপান্তরিত করেছেন। জামায়াতে ইসলামের নেতারা ১৯৭১ সালে বাঙালীদের নির্বিচারে হত্যা করেছেন। বিএনপির জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া এই খুনীদের রক্তাক্ত হাতের সঙ্গে করমর্দন করে খুনীদের নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। এদের এ ধরনের কোন কার্যকলাপ ইসলাম সমর্থন করে না। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কয়েকদিন আগে নিউইয়র্কে একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারই সূত্র ধরে হৈ হট্টগোল শুরু করেছে একটি পক্ষ। নিউইয়র্কেই উত্তাপটি বেশি। নিউইয়র্কে যারা হেজাবি মতবাদে দীক্ষিত, তারাই হৈ হট্টগোল করছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তা প্রতিরোধে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন এমন কোন খবর পাওয়া যায়নি। হেজাবিরা এটি করছে তার কারণ যতটা না ইসলাম তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার কারণে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সমর্থক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন আইকন বা সেনানী। সুতরাং ‘ওই ব্যাটাকেই ধর’। কারণ হেজাবিদের রাজনীতি এখন হালে পানি পাচ্ছে না। তাদের নায়ক তারেক রহমান দুর্বৃত্ত হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন। আমাদের ধারণা ছিল পাকিস্তান ও সৌদি আরব এদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু উইকিলিকসের কল্যাণে জানা গেল, সৌদি আরব তাদের এখন সমর্থন করছে না, এমনকি খালেদা জিয়াকেও! হয়ত সে কারণে সৌদি বাদশার রুটিন আমন্ত্রণে সৌদি সফরও খালেদা স্থগিত করেছেন, তারেকও। নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্য হৈ হট্টগোল করতে হয়। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এই সময়ে পড়ে গেছেন।
নিউইয়র্কে মুুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বা আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তেমন প্রতিরোধ করেননি তার কারণ শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের কেউ সেখানে নেই। সুতরাং ডেমনেস্ট্রেশনটা দেখাবেন কাদের? আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রতি শেখ হাসিনার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি কী, তাও তাদের জানা নেই। সুতরাং ভুল হয়ে গেলে কাফফারা দেবে কে? লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে তারা একবার হাত পুড়িয়েছে। বারবার কেন হাত পোড়াবে তারা? সবশেষে হলোÑ এই সব ঝুট-ঝামেলায় যাওয়ার কী দরকার? অন্তিমে এত অজুহাতের মৌল বিষয় হলোÑ ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দেয়া।
বাংলাদেশেও মূলত হেজাবীরা কয়েকদিন বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতির মূল বক্তব্যÑ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ধর্মদ্রোহী অর্থাৎ মুরতাদ। তিনি খারিজ হয়ে গেছেন ইসলাম থেকে এবং তাকে দেশে ঢুকতে দেয়া হবে না। খুনীরা দেশে থাকতে পারবে; মুক্তবুদ্ধির মানুষ নন।
এখানেও একই জিনিস লক্ষ্য করি। মুক্তিযোদ্ধাদের যে কী একটা সংস্থা আছে, নামও ভুলে যাই তার বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লড়াকু সংগঠনের নেতা বা ব্যক্তিবর্গ বা লেখককুল, রাজনৈতিক দল, এমনকি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ঢাকায় এলে তার জন্য যে নেমন্তন্নের আয়োজন করা হয়, সেখানে যারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন তাদেরও সক্রিয় হতে দেখিনি। কারণ ওইগুলোই। প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন। তারা এমন কিছু করতে চান না যাতে বর্তমান বা ভবিষ্যতের পদ-পদবী হারায়। তাছাড়া ধর্মটর্ম নিয়ে ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই। হেজাবিরা কখন কী করে তার ঠিক নেই। বিখ্যাত সেই ১৫ সাংবাদিক শেখ হাসিনার সব বিষয়ে সমালোচক, আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত শক্তিশালী, তারাও কি হেজাবি নেতার জন্য আকুল হয়ে বিবৃতি দেননি! এটিও এক ধরনের প্রশ্রয় দেয়া। আমি যে লিখছি তার কারণ এ নয় যে, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাকে স্নেহ করেন তার কারণে এ লেখা। বরং আমার মনে হয়েছে হেজবিরা যা করেছে তা অন্যায় এবং এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত।

॥ দুই ॥
আবুল গাফ্ফার চৌধুরী কী বলেছেন?
তিনি সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের কথা বলেছেন ইসলাম ধর্মের আলোকে এবং যা বলেছেন তার একটিও অতিরঞ্জন নয়। তার বক্তব্য নিয়ে তিনি একটি বিবৃতিও দিয়েছেন। বিবৃতিতে কয়েকটি প্রসঙ্গ আছে। আমি আগে পাঠককে তা পড়তে বলব। তারপর তা নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করব। আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী লিখেছেনÑ
১. ‘আমি আল্লাহর ৯৯ নাম সম্পর্কে দেবতাদের নাম বলিনি। আমি বলেছি, কালচারাল এসিমিলেশন কিভাবে প্রত্যেকটি সভ্যতা, এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতা উপকরণ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা বলা হয়। এটা যে সত্য না এটা প্রমাণ করার জন্য বলেছিলাম যে, আরবী ভাষাও ছিল এককালীন কাফেরদের ভাষা। এটা বলা কি আরবী ভাষার অবমাননা?’
২. ‘তারপর বলেছি যে, আল্লাহর গুণাত্মক নামগুলো আগে কাফেরদের দেবতাদেরও নাম ছিল। তা না হলে রাসূলুল্লাহর পিতার নাম আবদুল্লাহ কি করে হয়? এটা তো আর মুসলমান নাম নয়। সেখানে আল্লাহ আছে, সে আল্লাহ ছিল কাবা শরিফের কাবার প্রতিষ্ঠিত মূর্তিগুলোর ভেতরে প্রধান মূর্তির নাম। অবশ্য কেউ কেউ এটাকে ইলাহ বলেন, ইলাহ থেকে আল্লাহ শব্দের উৎপত্তি। এভাবে আল্লাহর রাসূল আরবের যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেটা ধর্মবিরোধী নয় সেটাকে তিনি গ্রহণ করেছেন।’
‘এমনকি হজও ইসলামের হজ নয়, এটাও সেই দু’হাজার তিন হাজার বছর আগের কাফেরদের দ্বারা প্রবর্তিত হজ, তিনি সেখানে এক ঈশ্বর বার্তাটি যুক্ত করেছেন। এটাই আমি বলেছি যে, এটা হচ্ছে একাডেমিক আলোচনা এবং আমি সাহাবাদের সম্পর্কে কোন কটূক্তিই করিনি।’
৩. ‘আমি বলেছি যে, আমরা আরবী ভাষা না জেনে, আরবীতে সন্তানদের নামকরণ করি, সেটা ভুল। আমাদের নামকরণটার অর্থ জানা উচিত। যেমন আবু হোরায়রা। এটা রাসূলুল্লাহর সাহাবার প্রকৃত নাম নয়। রাসূলুল্লাহ তাঁকে ঠাট্টা করে বিড়ালের বাবা ডাকতেন। এখন আমরা যেহেতু আরবী জানি না, সেই বিড়ালের বাবার নামটা আমরা রাখি। যার কাশেম বলে কোন ছেলে নাই তিনি তার ছেলের নাম রাখেন আবুল কাশেম। এভাবে আরবী ভাষা না জানার জন্য অনেক বিভ্রান্তি হয় আমাদের দেশে।’
৪. ‘মোজাক্কার মোয়ান্নাস বুঝতে পারি না আরবের। সেজন্য আমরা স্ত্রীলোকের নাম রাখি, তারও উদাহরণ দিয়েছি। তারপর আবার রাসূল শব্দকে মনে করি রাসূল বললেই বুঝি আমাদের রাসূলুল্লাহকে অবমাননা করা হয়।’
“অথচ প-িত নেহেরু যখন সৌদি আরবে যান তখন তাকে বলা হয়েছিল মারহাবা ইয়া রাসূলে সালাম, ‘হে শান্তির দূত তোমাকে সংবর্ধনা জানাই।’ অথচ বাংলাদেশে গিয়ে যদি কেউ বলেন, রাসূল মানে এ্যাম্বাসেডর তাকে মুরতাদ বলা হবে।”
এর মধ্যে ভুল কি আছে তা তো কেউ উল্লেখ করেননি। তিনি মাদ্রাসা এবং সেক্যুলার দু’ধরনের প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করেছেন। হজ করেছেন। নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে ওমরাহ করেছেন। মাদ্রাসা যদি ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে থাকে তাহলে ধর্ম শিক্ষা তিনি ভালভাবেই করেছেন। নিউইয়র্কে যেসব হেজাবি হৈ হট্টগোল করছেন তাদের কয়জন মাদ্রাসায় ধর্মশিক্ষা করেছেন বা হজ করেছেন?

॥ তিন ॥
একবার পিয়ংইয়ংয়ে খবরের কাগজ দিয়ে কিছু একটা মুড়াচ্ছিলাম। সঙ্গের দোভাষী হা হা করে উঠলেন। কারণ কাগজে কিম ইল সুংয়ের একটি ছবি ছিল। তারা এমনই কন্ডিশন্ড যে, এটিকে তারা ব্ল্যাশফেমি তুল্য অপরাধ মনে করেন। আমাদেরও হয়েছে তেমনি। আরবী কাগজ দেখলে অনেকে ভক্তি ভরে তা মাথায় ঠেকান। আরবীতে কি খালি কোরান শরীফই লেখা হয়েছে, অন্যকিছু নয়? নামের শুরুতে মোহাম্মদ লিখলেই কি শুদ্ধ হলো, মুসলমান পরিচয় পেলাম? আর যে সব নাম আরবী হিসেবে আমরা রাখি তা কি যুক্তিযুক্ত?
একটি হাদিসে আছে, রসূল (সা.) বলেছিলেন, পুত্র সন্তানের নাম যেন আবুল কাশেম না রাখা হয়। তিনি বলেছিলেন, আমার নাম রাখো [অর্থাৎ মোহাম্মদ] কিন্তু আমার কুনইয়ার নাম [পুত্রের নাম] রেখ না। সুতরাং, আমাদের আবুল কাশেম যখন আরবি জগতে যান তখন ধরে নেয়া হয় তার পুত্রের নাম কাশেম। তাহলে ব্যাপার কী দাঁড়ায়?
আল্লাহ নিয়ে তারা যা বলেছেন, তা আকাট অজ্ঞতা। জনাব চৌধুরী ইতিহাসের সত্যটিই বলেছেন এবং তাতে কোন অন্যায় হয়নি। আমাদের দেশে কোন মুসলমান যদি ‘ভগবান’ বলে আপনি তাকে মুরতাদ বলবেন। ঠিক আছে। ‘খোদা’ বললে কী করবেন? মেনে নেবেন কেন? ইরানে যারা অগ্নিপূজক ছিলেন তারা তাদের উপাসককে বলতেন ‘খোদা’। আমাদের দেশে পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব বেশি। অগ্নিপূজক ইরানিদের অনেকে পরে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সর্বশক্তিমানকে পুরানো উপাস্য ‘খোদা’ হিসেবেই সম্বোধন করতে থাকেন। তাহলে কি ঐ ইরানিরা মুসলমান ছিলেন না? কোরআনে ‘খোদা’ শব্দটি নেই।
আল্লাহু আকবর। এই আকবর তাই নাম হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত মনে করেন অনেকে। আমাদের এখানে সম্রাট আকবরের পর থেকে আকবর নামটি জনপ্রিয় হয়েছে। মুসলিম শরীফে দেখুন, রাসূলের (সা.) এক সাহাবীর নাম ছিল আকবর। তিনি তাঁর নাম পাল্টে রাখেন বাশীর। এখন আমি কি বলব, এই দেশে যাদের নাম আকবর রাখা হয়েছে তারা অনুচিত কাজ করেছেন?
আল্লাহর বন্ধু হচ্ছেন নবী ইব্রাহীম খলিলউল্লাহ। এখন আমরা যাদের ইব্রাহিম নামে ডাকি তারা কি আল্লাহর বন্ধু? আমার এক ভাইয়ের নাম কলিমউল্লাহ। ইসলামে কলিমউল্লাহ একজনই আছেন তিনি হলেন মুসা কলিমউল্লাহ যিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। আমার ভাই কি সেই গোত্রীয়?
আমরা খালেক-মালেক বলে ডাকি না আমাদের অনেক বন্ধুকে। এ শব্দ দুটির অর্থ কী? অধীশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা। আপনার ছেলেদের নাম যদি ঐ রকম রাখেন তাহলে কী দাঁড়ায়? আমার এক অনুজপ্রতিম মারুফ সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তিনি জানালেন, কুয়েতে তারা কয়েকজন গেছেন প্রশিক্ষণে। তার এক সহকর্মীর নাম মোহাম্মদ জামাল। এ নাম শুনে সবাই ঠাট্টা হাসাহাসি শুরু করল। কারণ জিজ্ঞাসা করার পর আরবীয় একজন বললেন, জামাল নামের অর্থ উট।
খায়রুল বাশার নাম তো আপনি রাখতেই পারেন না। কারণ সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তো রসূল (সা.)। অনুজপ্রতিম আবদুল হান্নান এই নামকরণ নিয়ে একটি সুন্দর বই লিখেছেন। সেখানে তিনি বাশীর বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল হামীদ আল মাসুমীর ‘ইসলামে নামকরা পদ্ধতি’ নিয়ে যে বই লিখেছেন যা মক্কা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যিনি লিখেছেন তিনি বাঙালী, নাম ছিল খায়রুল বাশার। হান্নান তাঁর বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেনÑ
‘১৯৭৮ সালে সপরিবারে হজের আগে মক্কায় চলে এলাম।... কিছুদিন পরে মক্কায় উন্মুল কুরা ইউনিভার্সিটিতে আরবি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি হলাম। কিন্তু নাম নিয়ে সেখানেও বড় গোলমাল। শিক্ষকগণ স্নেহমিশ্রিত উপদেশে বলেন, ইয়া বুনাইয়া, হাযাল ইস্্ম লা ইয়াজুক’ [হে বৎস, এই নাম জায়েজ নয়]। সহপাঠীরা টিপ্পনী কেটে বলে হা আনতা খায়রুর বাশার [তুমি ই কি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ!] কেউ কঠিন সুরে বলে, ‘হাযা হারাম, ইয়া আলী’ [ভাই সাহেব! এটা হারাম]... এসবের ঊর্ধ্বে যখন কেউ নির্দয় হয়ে বলত, ‘বাল হুয়া খায়রুল বাশার [বরং সে অমানুষ] তখন দুঃখ আর অভিমানের অন্ত থাকত না।... সয়ুদী আরবে সর্বত্রই আমাকে নাম নিয়ে নাজেহাল হতে হয়েছে।’ তিনি তারপর সউদী সরকারের অনুমতি নিয়ে নাম বদল করেন।
হান্নান আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক দিকের উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ফার্সি, সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের ওপর বেশি, শিয়া সম্প্রদায়ের সেই অর্থে। ফলে, নামকরণের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা শিরক করি, শিয়ারা আলী (রা) কে অনেক সময় সবার ওপরে স্থান দেয়। যেমন ‘দমাদম মাস্কালন্দার, আলী-কা পহেলা নাম্বার।’ এটি শিরক এই অর্থে যে, সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (সা.), আলী (রা.) নন। সেই অর্থে গোলাম আলী বা গোলাম নবী নামকরণও তো ঠিক নয়। আমরা আল্লাহর বান্দা, নবী বা আলীর বান্দা হতে পারি না। সাজ্জাদ আলী হচ্ছেন আলীর সেজদাকারী। সেই অর্থে হেজাবিদের পরলোকগত নেতা গোলাম আযমের নাম কতটা যুক্তিযুক্ত? হাননান লিখেছেন, গোলাম আযম তার ছেলেদের নামের সঙ্গে আযমী যুক্ত করেছেন। “আযমী শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘অনারব’। প্রকৃতপক্ষে একজন বাঙালী শুধু অনারব নয়, একজন ‘অইংরেজ’, ‘অভারতীয়’ একজন ‘অচৈনিক’ ইত্যাদিও। নামের শেষে শুধু ‘অনারব’ চিহ্ন একটি ভুল শুধু নয়, বিভ্রান্তিকরও, বিশেষ করে তা যদি হয় মুসলমান আলেমদের পরিবারে।” নাহিদ নামের অর্থ জানেন? উচ্চবক্ষের মহিলা। মোসাম্মাদ-এর কোন মানে নেই। খাতুন বলা যেতে পারে বিবাহিতা হলে, আমরা বালিকা শিশুর নামের শেষেও ইসলামী ভাব আনার জন্য চোখ বুজে ‘খাতুন’ যোগ করি। এসব ক্ষেত্রে হেজাবিরা কী বলেন জানতে চাই।
মক্কায় হজ করতে গেলে ছোট একটি পুস্তিকা দেয়া হয় সবাইকে। বাঙালীদের জন্য বাংলা ভাষায় লেখা। সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত। সেখানে লেখা আছে-
‘কোন মুসলিম পুরুষের জন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন, কোন মহিলার পাশে অথবা তার পেছনে দাঁড়িয়ে মসজিদ-উল হারাম বা অন্য যে কোন মসজিদে নামাজ আদায় করা উচিত নয়। অবশ্য এ অবস্থা হতে বেঁচে থাকার সমর্থ না থাকলে অন্য কথা।’
তা মসজিদে হারামে নামাজ পড়ার জন্য কাতারবন্দী হয়েছি। সামনে দেখি বেশ কয়েকজন মহিলা, তাদের পাশে পুরুষও আছেন। সেজদা দিচ্ছি, দেখি সোমালী কয়েকজন মহিলা আমাকে ডিঙিয়ে অন্য কোথায় স্থান পাওয়া যায় কিনা খুঁজে দেখছেন। একজন মুসল্লিকেও আমি বেদাআত বলতে শুনিনি।
যেই হেজাব নিয়ে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বিরুদ্ধে কথা তুলছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে বলি, ঐ পুস্তিকায় লেখা হয়েছেÑ ‘ইহরাম অবস্থায় মহিলাদের জন্য হস্তদ্বয়ের দস্তানা (হাত মোজা) পরিধান করা এবং নেকাব বা বোরকা দ্বারা মুখ ঢাকা হারাম। তবে মাহরাম নয় এমন পরপুরুষের উপস্থিতিতে ওড়না অথবা ঐ জাতীয় জিনিস দ্বারা চেহারা ঢাকা ওয়াজিব, যেমনিভাবে ইহরামের অবস্থা ছাড়াও পরপুরুষের উপস্থিতিতে ওড়না বা অনুরূপ কাপড় দ্বারা মুখ আবৃত করা ওয়াজিব।’
এটি হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে পবিত্র কর্তব্য হজের সময় দিকনির্দেশনা। এবং শব্দটি লক্ষ্য করুন ওয়াজিব, ফরজ বা সুন্নত নয়। তাহলে সাধারণ অবস্থায় কী হবে?
শুধু তাই নয়, ‘বরকত লাভের উদ্দেশ্যে হাজারে আসওয়াদকে স্পর্শ করা। এটি একটি বেদায়াত।... কা’বা শরীফের সমস্ত আরকান (কোণ) এবং সমস্ত দেয়াল চুম্বন করা ও স্পর্শ করা’ একই রকমভাবে নাজায়েজ। আমি সব দেশের হাজীদের দেখেছি এই বেদায়াত করার জন্য তারা প্রায় উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। আমি কখনও দেখিনি [যতদিন গেছি সেখানে] ভয়াবহ সৌদি রক্ষীদের সেখানে কোন তা-ব চালাতে।
আমাদের আরো অজ্ঞতার ও মূর্খতার আরেকটি উদাহরণ দিই। উলুধ্বনি দিলে আমরা মনে করি চারদিক হিন্দুত্বে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সেই অজ্ঞতার ধারক খালেদা জিয়া বলে বসলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় গেলে মসজিদে উলুধ্বনি চলবে। অর্থাৎ হিন্দুরা সব দখল করে নেবে। এই চরম সাম্প্রদায়িক উক্তির বিরোধিতাও তখন খুব কম বুদ্ধিজীবী করেছেন। সাম্প্রদায়িক এই মহিলা শিক্ষিত হলে এ কথা বলতেন না। কারণ উলুধ্বনি এসেছে আরবীয়দের কাছ থেকে, আনন্দ-ধ্বনি হিসেবে এবং এখনও তা প্রচলিত।
সম্বোধন নিয়েও আমাদের মধ্যে সংস্কার আছে। মুসলমান কেউ নমস্কার বলবে না, কারণ হিন্দুরা বলে নমস্কার, যদিও এটি এক অর্থে সালাম বা প্রণাম। হিন্দুরা বরং অনেক বেশি দক্ষ এখন আসসালামালাইকুম বলায়, যার অর্থ আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এটি আরবি শব্দ। অনেক হিন্দু আবার মনে করেন ধর্মনিরপেক্ষ আদাব ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু আদাব বাংলা বা সংস্কৃত নয়, আরবি। অনেকে এ সবের পরিবর্তে ব্যবহার করেন গুডমর্নিং, সেক্যুলার শব্দ হিসেবে। এই ইংরেজী সম্বোধনও এক অর্থে কুশল বিনিময়, যেমন সালাম বা নমস্কার বিনিময়। ভাষাকেও আমরা কিভাবে সাম্প্রদায়িক করে ফেলি!
মাঝে মাঝে দেখি, আরবি আবওয়া পরে গম্ভীর মুখে অনেকে ঘোরাফেরা করছেন। তারা মনে করতেন এটিই বোধহয় মুসলমানি পোশাক। মধ্যপ্রাচ্যে সবাই পরে। সুতরাং, এ দেশে এটি পরে ঘোরাফেরা করে মুসলমানত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতেন। মূর্খদেরই এরকম ধারণা হয়। আরব দেশে ইসলাম প্রচারের আগেও মানুষ এ ধরনের পোশাক পরত। গরম ও লু থেকে বাঁচার জন্য। এর সঙ্গে মুসলমানত্বের কোন সম্পর্ক নেই।
॥ চার ॥

ইসলাম শান্তির ধর্ম বলি আমরা সবাই কিন্তু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতেই অশান্তি এবং রাজ-রাজড়ার শাসন। ইসলাম শান্তির ধর্ম- এটি যদি মুসলমানরা অনুধাবন করতেন তা হলে তো এই অশান্তির সৃষ্টি হতো না। ধর্ম পালন করলে অশান্তি হয় না। ধর্মের সঙ্গে পার্থিব লোভ ও ক্ষমতার আকাক্সক্ষা যুক্ত হলে তখন আর ধর্ম পালন হয় না। ধর্ম ব্যবহার হয়। শেষ নবীর (দ:) মৃত্যুর পর থেকেই এর সূচনা কেন হলো। তিনি যে রকম জীবন যাপন করে গেছেন তার সাহাবীরা যে রকম জীবন যাপন করে গেছেন তাতে তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। খালিফা ওসমান (রা.) এর সময় থেকেই ক্ষমতা দখল নিয়ে এই রক্তারক্তির শুরু। অনেক আগে উপমহাদেশে মুসলমানদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব ও নেতা বিচারপতি সৈয়দ আমীর আলী বিখ্যাত একটি বই লিখে গেছেন ‘দি স্পিরিট অব ইসলাম’ নামে। দুঃখ করে তাতে তিনি লিখেছিলেন বিশ্বাসীরা দুঃখ পেতে পারেন মানবধর্ম কিভাবে আজ অশান্তিময় হয়ে উঠছে। বিশ্বে যাদের শান্তি আনার কথা তারাই সব দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। প্রায় ১০০ বছর আগে তিনি এ মন্তব্য করেছিলেন। তারা ভাষায়- Ò... to every Islamist devoted to the founder of his faith, it must cause sorrow and shame. Alas! that the religion of humanity and universal brotherhood should not have escaped the curse of internecine strife and discord that the faith which has to bring peace and rest to the distracted world should itself be torn to pieces by angry passions and the lust of power... in Islam, the evils that we shall have to describe arose from the greed of earthly advancement, and the revolutionary instinct of individuals and classes impatient of moral law and order.
আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের এবং মিসরে ফাতিমিদের বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলেছে তা আজকাল কেউ বলেন না। মুসলমান মুসলমানকে কী পরিমাণ নিধন করেছে তা বলার নয়। মুক্তচিন্তা থাকবে কী থাকবে না বা ইলমুল কালাম যাকে বলা হয় তা নিয়ে দ্বন্দ্বও শুরু হয়। আর আগে নবী (দ:) পরে উত্তরাধিকারী কে হবে তা নিয়েও দ্বন্দ্বের শুরু। এ প্রশ্নেই মুসলমানরা প্রথম দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় সুন্নি এবং শিয়াতে। আলীর সমর্থকরাই শিয়া মতবাদ বা শিয়াত ই আলীর উদ্যোক্তা। শিয়ারাও পরে অনেক উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়। রসুলের (দ:) সময় দুই গোত্র বানী হাশেম ও বানী উমাইয়ার গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বও ইসলামে সংঘাতের শুরু করে। হাশেম বংশ প্রভাবশালী ছিল। যেহেতু ইসলামের বাণী তাদের মধ্য থেকেই অনেকে গ্রহণ করেছিলেন এবং উমাইয়ারা বিরোধিতা করেছিলেন ওসমান (রা.) ছাড়া। হাশেম বংশের আবুবকর ও উমর খলিফা হওয়ায় দ্বন্দ্ব এতটা তীব্র হয়ে উঠেনি। এরপর ওসমান (রা.)-এর খলিফা হলে পুরনো দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এছাড়া ইসলাম অনারব দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে আরবরা শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যে গর্ব করতেন অনারবরা তা মানতে রাজি ছিলেন না।
ওসমান (রা.) বিরুদ্ধে প্রথমে বিক্ষোভ ও ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে কিন্তু তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। তিনিই বলা যেতে পারে খাঁটি অর্থে রসুলের (দ:) বাণী উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘আমি মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করতে পারি না। রসুলুল্লাহর খলিফা হয়ে আমি কিভাবে জাতির রক্ত প্রবাহিত করব। আমি সেই খলিফা হতে চাই না। যিনি মুসলিম জাতির মধ্যে রক্তারক্তির সূচনা করবেন।’ খলিফা ওসমান যখন কোরান তেলাওয়াত করছিলেন তখন তাকে খুন করা হয়। তার রক্ত কোরানের যে আয়াতের ওপর পড়েছিল, লিখেছেন ইসলাম বিশেষজ্ঞ সা’দ উল্লাহ, ‘আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট; তিনি প্রাজ্ঞ, তিনি সব শোনেন।’
এরপর আলী (রা.) খলিফা হন। তার এক বছর বয়স থেকে নবী (দ:) তাকে লালন পালন করেন পুত্র স্নেহে। এরপর রসুলের (দ:) কন্যা ফাতিমার জন্ম। রসুল তাদের বিয়ে দেন।
আলীকে সিরিয়ার শাসনকর্তা মাবিয়া না মানায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। রসুলের (দ:) পুত্রতুল্য আলী যুদ্ধ করেন রসুলের (দ:) প্রিয় স্ত্রী আয়েশার সঙ্গে। সেই শুরু যা এখনও বিভিন্ন ফর্মে চলছে।
এই সমস্ত সংঘাত পর্যবেক্ষণ করে বিখ্যাত ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুই যা মন্তব্য করেছেন তা যুক্তিযুক্ত। লিখেছেন তিনিÑ
ÒWhenever a grievance or a conflict of interest created a faction in Islam, its doctrines were theology its instrument a sect, its agent a missionary, its leader usually a messiah or its representative. But to describe these socially motivated religious heresies as ÔcloaksÕ or ÔmasksÕ behind which men hid their real and material purposes in order to deceive the pious is to distort history.
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই বাক্যগুলো যখন পড়ি তখন জনাব গোলাম আযম বা জনাব আহমদ শফী বা বিভিন্ন চরের পীর যারা রাজনীতি করছেন তাদের কথা মনে পড়ে। তবে এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ পাকিস্তানের আবুল আলা মওদুদী যার খেদমতগার হচ্ছে আদালত কর্তৃক ক্রিমিনাল হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতী ইসলামীরা।
ইসলামের ইতিহাসের খ- খ- চিত্র তুলে ধরলাম এ বিষয়টি অনুধাবনের জন্য যে, এই যে সংঘাত, একে অপরের চেয়ে বেশি ধার্মিক তা প্রমাণের চেষ্টা, পরিণামে জঙ্গী মৌলবাদের বিকাশÑ এর পেছনে যতটা না ধর্ম তার চেয়ে বেশি হচ্ছে পার্থিব লোভ, ক্ষমতা আহরণ ও কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টা। যে কারণে লক্ষ্য করবেন মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ রাজতন্ত্রের অধীন, যা ইসলামের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
যেসব রাষ্ট্রে রাজতন্ত্র নেই সেখানে ধর্মকে সামনে রেখে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল ও কুক্ষিগতকরণ। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া বা বাংলাদেশ এর উদাহরণ। একই বিষয় লক্ষণীয় ছিল ইরাক সিরিয়া প্রভৃতি দেশে। আইএস যা করছে তা সেই শিয়া-সুন্নি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান বা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর উদাহরণ। তবে এখনও বাংলাদেশে ঐ ধরনের শাসন দীর্ঘকাল করা সম্ভব হয়নি। তার কারণ সমাজের অন্তর্নিহিত সেক্যুলার বোধ ও জনসমাজের সজীবতা। যে কারণে এখানে শিয়া-সুন্নি গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নেই। আহমেদীয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত সক্রিয়, মৌল জঙ্গীবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায়, যার উদাহরণ ব্লগারদের হত্যা, যারাই তাদের বিরোধিতা করে তাদের মুরতাদ হিসেবে ঘোষণা করা, সুস্থ ইসলামের প্রতীক শেখ হাসিনাকে ডজনখানেকবার হত্যার চেষ্টা, বিশিষ্ট জনকে হত্যার চেষ্টা বা হুমকি দিয়ে তাদের নিঃশব্দ করা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে মুরতাদ ঘোষণা এর সর্বশেষ উদাহরণ।

॥ পাঁচ ॥

পাকিস্তান আমলে ধর্মের পীড়ন ছিল। ধর্ম নিয়ে ব্যবসাও ছিল। কিন্তু নতুন শতাব্দীতে বাংলাদেশে ধর্মীয় পীড়ন ও ব্যবসা মাত্রা ছাড়িয়েছে। এবং এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে কেউ আগ্রহী নন। ধর্ম এখন কিছু লোকের কারণে মানুষের কল্যাণে নয়, মানুষকে হুমকি দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পেশাদার রাজনীতিক, ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল ও সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদ থাকে। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর আমলেই ধর্ম নিয়ে মানুষকে হুমকি দেয়ার কেউ সাহস রাখেনি। সামরিক কর্মকর্তারা বাংলাদেশের যে ক্ষতি করেছেন তা আর কেউ করতে পারেননি। জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে দেশটিকে আবারও পাকিস্তানের অঙ্গীভূত করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে পুরস্কৃত করতে পারেনি কারণ তার আগেই তার মৃত্যু হয়; কিন্তু জেনারেল এরশাদকে পেরেছিল। এ দু’জন সামরিক কর্মকর্তা ইসলামকে যতভাবে পারা যায় ব্যবহার করেছেন নিজ স্বার্থে এবং দুর্নীতির প্রস্রবণ খুলে দিয়েছিলেন। একই পথ অনুসরণ করেছিলেন খালেদা জিয়া। জামায়াত বা বাংলাদেশ-বিরোধীদের জিয়া অবমুক্ত করেছিলেন তার সহযোগী শক্তি হিসেবে। আওয়ামী লীগবিরোধী প্লাটফর্ম তৈরি করতে গিয়ে জিয়া ও এরশাদ এই সর্বনাশটি করেছিলেন। তাদের পুরো রাজনীতির মৌল বিষয় ছিল ধর্ম উন্মাদনা জাগিয়ে তোলা এবং নিজেদের ইসলামের ধারক-বাহক হিসেবে তুলে ধরা। এরশাদ এ কারণেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছিলেন। এগুলো রাজনীতি নয়, রাজনৈতিক খচরামি যা রাজনৈতিক খচ্চরদের পক্ষেই করা সম্ভব।
জিয়া-এরশাদ-খালেদা তাদের নীতি বাস্তবায়ন করতে প্রায়োগিক দুটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন। এক. হিন্দুদের ভারত আমাদের জানি দুশমন। দুই. আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাসী তারা হিন্দুদের এজেন্ট। বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত ইসলাম- এই তিনটি সংগঠন এখন এর মূল প্রবক্তা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ় করার জন্য তারা মাদ্রাসা শিক্ষা তুঙ্গে নিয়ে যায় এবং সব ধরনের মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। ইসলামকে সামনে রেখে প্রবল লুটপাটের মাধ্যমে তারা আমলাতন্ত্রে এবং সিভিল সমাজে একটি বিশেষ শ্রেণী তৈরি করে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিতে তাদের নীতি সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করে মানস জগতে আধিপত্য বিস্তার করে। নিউইয়র্কে যারা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে হেনস্থা করেছে তারা এর উদাহরণ।
হেজাবিরা মানস জগতে এমন প্রভাব সৃষ্টি করে যে, আওয়ামী লীগ তা জুঝবার জন্য আবার ধর্মকে আশ্রয় করে। আমার সঙ্গে অনেকে একমত হবেন না কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি এই কৌশল ছিল ভুল।
লক্ষ্য করবেন দু’দশক আগেও আওয়ামী লীগের নেতারা বিসমিল্লাহ বলে বক্তৃতা শুরু করতেন না। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ এ ধরনের বক্তৃতা শুরু করার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে হতে লাগল ইসলামী দৌড়ে বুঝি তারা পিছিয়ে পড়ছেন। সুতরাং, তারা তাদের অনুসরণ করলেন যদিও আওয়ামী লীগাররা হেজাবিদের থেকে অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সেøাগান ও পোস্টারেও আল্লাহ-বিসমিল্লাহ-রসুলুল্লাহ (স.) চলে এলো। হেজাবিরা শিক্ষায় মাদ্রাসা খাতে এবং সামরিক আমলাতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে। যদিও খাত দুটি অনুৎপাদনশীল। তাদের ধারণা এরা এদের মাঠ-সৈনিক হিসেবে কাজ করবে। করেছেও। আওয়ামী লীগ সরকারও এই ধারা অনুসরণ করেছে। আওয়ামী লীগের ডান অংশ এখন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখবেন, অতি আওয়ামী লীগাররা যাদের সম্পদের ভিত্তি লুণ্ঠন, তারা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলছেন, বামধারার মানুষজনের অনুপ্রবেশে আওয়ামী লীগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের নিজস্বতা হারাচ্ছে। তারা কিন্তু কখনও বিএনপি-জামায়াতের নিন্দা করে না।
গত কয়েক বছর হেজাবিরা ইসলামের নামে কী করেছে তা সবার জানা। খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শুরু করেছেন ধর্মের নামে মানুষ পোড়ানো। হেফাজতের কথা মনে আছে? হেফাজত ঢাকা দখল করার পরিকল্পনা করে বিএনপির সহায়তায়। মানুষ দেখছিল কী অসহায়ভাবে সরকার আত্মসমর্পণ করছে। আওয়ামী লীগের ডানপন্থী নেতারা চেয়েছিল সমঝোতা করে মীমাংসা করতে। এ পরিস্থিতিতে সৈয়দ আশরাফ যখন ঘোষণা করেন, রাজাকারের বাচ্চাদের ছাড়া হবে নাÑ তখন এক নিমিষে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সাধারণ মানুষ উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সাময়িকভাবে ডানপন্থীরা হটে যায়। শেখ হাসিনার নির্দেশে হেফাজতিদের সরানো হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের ক্ষতি না করে এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ঘটনা খুব কম। কিন্তু শুনেছি, পরে অনুযোগ করা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলমগীরের কারণে আওয়ামী লীগ ইসলামী ভোট হারাল। অথচ, সরকার সেই সময় যে কৌশল নিয়েছিল তাতে অটল থাকলে হেজাবিদের অবস্থা আরও খারাপ হতো। বিএনপি এতো দুষ্কর্ম করার সুযোগ পেত না। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, ডানপন্থী ধারা প্রবল হচ্ছে আওয়ামী লীগে যা দেশ ও জাতির জন্য শুভ নয়।
সঙ্গে সঙ্গে আমি এ কথাও বলব, দেশটি যে মৌল জঙ্গীবাদীরা একেবারে দখল করতে পারেনি তার কারণ শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নয়। সাধারণ মানুষের যতটা আস্থা আওয়ামী লীগের ওপর তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার ওপর। তার দৃঢ় সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। এখন পর্যন্ত বিচারালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেনি তেমন। যদিও বলা হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদ-, সেখানে যাবজ্জীবনের কোন স্থান নেই। মানুষজন সাগ্রহে অপেক্ষা করছে সাকাচৌ ও নিজামীর আপিলের রায় শোনার জন্য। বিদেশী পত্রিকায় এসেছে এবং আদালতপাড়ায় গুঞ্জন অপরাধীদের আত্মীয়স্বজন দেখা করেছেন আদালতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আমরা সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। সমস্যা হচ্ছে, নেতিবাচক কিছু ঘটলেই সবাই শেখ হাসিনার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। যদিও আদালতের রায়ের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। ইতিবাচক হলে সবাই বিচারকদের প্রশংসা করেন। অতিরিক্ত সাফল্যও মাঝে মাঝে বিপদ ডেকে আনে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ করার জন্য জামায়াত-বিএনপি যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। তারা তাদের মুরব্বি সৌদি-পাকি এবং আমেরিকার কাছে ধর্ণা দিয়েছে বারবার। হাসিনা নড়েননি। উইকিলিকসের তথ্য অনুযায়ী সৌদিরা এ বিষয়ে সাড়া দেয়নি। 
মানুষ পুড়িয়ে যখন খালেদা নতুন আন্দোলন শুরু করেন তখন পাশ্চাত্য তাকে সমর্থন করেছিল। শেখ হাসিনাকে টলানো যায়নি তার পথ থেকে। হেজাবিদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। উইকিলিকস থেকে জানা যাচ্ছে, খালেদা সৌদিদের কাছে বারবার ধর্ণা দিয়েছেন; কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি। এ কারণে বোধহয় ওমরাহ করার আমন্ত্রণ পেয়েও খালেদা সৌদি আরব যাননি।
সৌদি বা যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ গুটিয়ে যাওয়ার কারণ, বিশ্বব্যাপী মৌল জঙ্গীবাদীরা যা করছে তাতে সৌদি রাজারাই হুমকির মুখে পড়তে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রও বিষয়টি অনুধাবন করেছে। তারা এখন চায় না দক্ষিণ এশিয়ায় আইএসের উত্থান ঘটুক।
এ ছাড়া জঙ্গীদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা যেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছেন তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। পাশ্চাত্য শেখ হাসিনাকে পছন্দ না করলেও নিজ স্বার্থে এই সরকারকে মেনে নিয়েছে। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলতে পারি, শেখ হাসিনা আপাতত যে কৌশল নিয়েছেন তার সুফল পাচ্ছেন। কিন্তু, আওয়ামী লীগের প্রতি কেন সবাই সন্তুষ্ট নয়। কারণ, আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত ও বিএনপির অপরাধীদের দলে নিচ্ছেন এবং সাংগঠনিকভাবে এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। এদের ধারণা, এই সব অপরাধী বা হেজাবিরা তাদের ভোট দেবে। জনাব মুহিতের ভাষায় এদের এডুকেটেড বা পলিটিক্যাল ‘ইডিয়ট’ বলতে হয়। এটা কি সম্ভব যারা পাকিস্তান ভেঙ্গেছে তাদের পাকিস্তানপন্থীরা ভোট দেবে? অন্যদিকে খালেদা-নিজামী ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগারদের কখনও দলে নেয়নি, পিটিয়ে তাদের চৌদ্দ পুরুষের নাম ভুলিয়ে দিয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, হেজাবিরা বুঝি পরাজিত হয়েছে। মোটেই নয়, তারা ফণা নামিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় আছে মাত্র। ইন্টারনেটে তাদের অপপ্রচার চলছে মানসিক ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তারের জন্য। সরকার কিছুই করতে পারছে না। আমাদের হত্যার জন্য নির্বিচারে প্রচার চলছে। যে সরকার প্রতিদিন বমাল জঙ্গীদের গ্রেফতার করছে, সে সরকার আমাদের হত্যায় যারা প্ররোচনা দিচ্ছে, মুরতাদ ঘোষণা করছে, তাদের চিহ্নিত করতে পারছে নাÑ এটি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?
মানসিক আধিপত্য বিস্তার করতে হলে শিক্ষা-সংস্কৃতির ওপর জোর দিতে হয়। শিক্ষা নিয়ে নানা হৈ-চৈ চলছে। পাসের হার সরকারকে উজ্জীবিত করছে। এক দশক পরে বোঝা যাবে শিক্ষার কী ক্ষতি হয়েছে, যখন দক্ষ মানব সম্পদ আমাদের হায়ার করতে হবে। ইতিহাস তুলে দেয়া হয়েছে পাকিস্তানের মতো। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনাদৃত। স্বয়ং শিক্ষা সচিব বলছেন, ইতিহাস না পড়ালেও চলে। এগুলো কি শেখ হাসিনার পক্ষে যাচ্ছে, না বিপক্ষে?
মাদ্রাসায় দেশবিরোধী শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এমনকি সরকারী মাদ্রাসায়। প্রধানমন্ত্রীর না হয় সময় হয়নি, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী বা সচিবের কি সময় হয়নি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজালের ২০০ পৃষ্ঠার ছাপানো রিপোর্টটি পড়ার? এ রিপোর্টের নাম ‘আলিয়া মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম’। মাদ্রাসার শিক্ষা নিয়ে এতো ভালো রিপোর্ট এর আগে প্রকাশিত হয়নি। এটি নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আমি একটি উদাহরণ দিই।
মাদ্রাসা অনুমোদিত একটি বইয়ে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে লেখা হয়েছেÑ
‘বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতিতে সর্বাধিক বড় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে ইসলামী রাজনীতিকে এ উপমহাদেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে প্রয়াস পেয়েছেন।
‘জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক কার্যাবলী ছাড়াও সমাজসেবায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত মানবতার পাশে সব সময়ই জামায়াতে ইসলামী এগিয়ে আসে। এদেশে ইসলামী অর্থনীতি চালুর প্রচেষ্টায় জামায়াতে ইসলামীর বলিষ্ঠ ভূমিকা মুখ্য। জামায়াতে ইসলামী শিক্ষা ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদান রেখেছে। পুস্তক প্রকাশনা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রভৃতি প্রণয়নে জামায়াতে ইসলামী পরিচালিত ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি বিশেষ অবদান রেখেছে।’ [পৃ.৬৫] অথচ, আদালত বারবার বলছে, জামায়াত একটি ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন, জামায়াতকে কোন ছাড় দেয়া হবে না।
মাদ্রাসায় কিভাবে বিএনপির পক্ষে প্রচার চালানো হয়, তার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছিÑ
“আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭৫ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে না দেওয়ায় ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বরাবরই তিক্ত ও বিদ্বেষপূর্ণ ছিল। বিএনপি সরকার মরহুম জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল নীতি সংশোধন করে বিসমিল্লাহ সংযোজিত হয় এবং অন্যতম মূলনীতি ধর্ম-নিরপেক্ষতার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতার কথা লিখিত হয়। বিএনপি সরকারের আমলে স্বায়ত্তশাসিত বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড চালু হয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়। ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক দলের রাজনীতি স্বীকৃত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা করছে চারদলীয় ঐক্যজোট। এ চারদলীয় ঐক্যজোটের অন্যতম দুটি দল হলো জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট। তাই বলা যায়, এ দেশে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠাকরণের ক্ষেত্রে ইসলামী দলগুলো অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সময়ের বিবর্তনে এ দেশে হয়ত একদিন তওহীদের পতাকা উত্তোলিত হবে এমন ধারণা এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণের।” [ পৃ. ৬৫]
বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো একেই বলা হয়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ মধ্য আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কৃতিত্ব অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এখন সরকারের ঝোঁক জিডিপি বৃদ্ধির দিকে। অন্য সব কিছু যেন গৌণ। জিডিপি বৃদ্ধির সুফল অন্তিমে সরকার বা দল পাবে না, যদি না শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। কেননা শেখ হাসিনা জিডিপি বৃদ্ধি করলেন, কিন্তু দেশ চলে গেল মৌল জঙ্গীবাদী বা খালেদাদের হাতে, তাহলে কি লাভ হলো?” শিক্ষা সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় মানস জগতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য কোন কর্মসূচীই তৈরি করতে পারেনি। রুটিন কাজেই তারা ব্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে প্রায় সময় বিতর্কিত ব্যক্তিদের সচিব করা হয়। এগুলো কেন হবে? জিডিপির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা সংস্কৃতি মুক্তিযুদ্ধেও বিনিয়োগ করতে হবে। তাহলেই শেখ হাসিনা যেমন দেশটি চেয়েছেন, তাই হবে।
॥ ছয় ॥
আমি আগেই বলেছি, ধর্ম দিয়ে ধর্ম দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লিখতে চাইনি। কারণ, তা তাদের কৌশলে আত্মসমর্পণ। কিন্তু, আমি লিখতে বাধ্য হলাম প্রতিবাদ জানানোর জন্য।
আবদুল গাফফার চৌধুরীকে আমাদের অনেকে পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু এটি তো স্বীকার করতে হবে, গত ৬০ বছরে বাংলাদেশের খুব কম লেখকই জাতীয় ক্ষেত্রে তাঁর মতো অবদান রেখেছেন। অনেক রাজনীতিবিদ থেকে তাঁর অবদান এ ক্ষেত্রে কম নয়। এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক লড়াই, বাংলাদেশ অর্জনের লড়াইয়ে তিনি প্রথম কাতারের সৈনিক ছিলেন। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের প্রতীক। ধর্মের অজুহাত তুলে পাকিস্তান আমলের সঙ্গে কিছু দুবর্ৃৃত্ত তাকে হেনস্থা করবে এবং আমরা কেউ তার প্রতিবাদ করব না, তা হতে পারে না। আমরা প্রতিবাদ না করায় ধর্মের দুবর্ৃৃত্তায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মের দুর্বৃত্তায়ন রোধে সমঝোতা কোন কৌশল নয়। হেজাবিদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা যে কৌশল নিয়েছিলেন, তাই ছিল সঠিক। কিন্তু, এটি স্পষ্ট হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না বা যাদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তারা তা করছেন না।
সরকার কী করবে না করবে আমরা যেন তার ওপর নির্ভর না করি। ধর্মের দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে হেজাবিরা এ কথা বলতে চাচ্ছে যে, ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাদের বক্তব্যই সঠিক এবং সেটিতে গুরুত্ব না দিলে প্রাণনাশ থেকে শুরু করে নানা ধরনের হুমকি দেয়া হয়। আমাদের পরিষ্কারভাবে বলা উচিত, ইসলাম বা বাংলাদেশ হেজাবিদের লিজ দেয়া হয়নি। আমরা বাংলাদেশের পক্ষে ছিলাম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা যা বলব সেটিই মানতে হবে। “পাকিস্তানপন্থী হেজাবিরা ৩০ লক্ষ শহীদের হত্যা ও ৬ লক্ষ নারীর অবমাননা সমর্থন করেছে ইসলামের নামে। সেই ইসলাম তারা আবার প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে এখানে তাতো হতে পারে না। তাদের প্রতিটি হুমকি রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। প্রতিরোধ না করার অর্থ তাদের প্রশ্রয় দেয়া। আওয়ামী লীগে চরম ডানপন্থা কী করতে পারে তার উদাহরণ খন্দকার মোশতাক। এরা দলে শক্তিশালী হয়ে উঠলে শেখ হাসিনাকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবেনÑ যারা সত্যিকারভাবে আওয়ামী লীগকে ভালবাসেন তারা এটি করতে দেবেন কিনা তাও সেইসব আওয়ামী লীগারদের অনুধাবন করতে হবে।”
আমাদের কাছে ইসলাম হচ্ছে ধর্মের মূলনীতি মানা এবং মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করা। এর বাইরে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা দখল, হত্যার মাধ্যমে ইসলাম ‘প্রতিষ্ঠা’Ñ এসব দুর্বৃত্তায়ন। হেজাবিরা যে ইসলাম প্রবর্তন করতে চান, সেটি কোন্ ইসলাম? এ বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার হতে হবে। ইসলামে ৭১টি ফিরকা পরস্পর পরস্পরের বিরোধী। তা হলে কোন্্ ফিরকার ইসলাম এ দেশে প্রবর্তন করতে চান? মূল ধর্মের বাইরে গেলেই এ প্রশ্ন আসবে এবং রক্তারক্তি বাড়বে।
ইসলাম একেক দেশে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একেক রূপ পেয়েছে। জাকার্তায় প্রবেশের মুখে দেখেছিলাম অর্জুনের রথের ভাস্কর্য। মারদেকা স্কোয়ারে স্মৃতিস্তম্ভ দেখিয়ে ইন্দোনেশীয় তরুণী বলছিলেন, এটি লিঙ্গের প্রতীক। বালি শহরে ঢোকার মুখে অর্জুনের সেই রথের ভাস্কর্য। পথে পথে ভাস্কর্যের কারখানা। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক গড়ুর। পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। সেখানে তো সাধারণ মানুষ এগুলি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায়নি। আমাদের দেশে মাজার জেয়ারত করা, পীর মানা ধর্মীয় সংস্কৃতির অঙ্গ। মক্কায় হজে গেলে যে পুস্তিকা ধরিয়ে দেয়া হয় সেখানে এসবকে বিদাআত ঘোষণা করা হয়েছে। শব-ই-বরাত, মিলাদও। বাঙালি মুসলমানরা সেগুলো মানবেন? কারণ, ইসলাম যখন মক্কা থেকে অগ্রসর হয়েছে, তখন প্রতিটি দেশের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তার সংমিশ্রণ হয়েছে। এটি মেনে নেয়া ভাল। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এ কথাই বলেছিলেন। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের সংমিশ্রণ আল কায়েদা, তালেবান বা আইএস মানতে রাজি নয়। আরবেও সংমিশ্রণ ঘটেছিল। রসুল (সা.) সেটি মেনেছিলেন। এর বিরুদ্ধাচরণ করা কেন হবে? আরব ছাড়া অন্যান্য দেশের মুসলমানরা কী নামাজ পড়েন না, আল্লাহ রসুল মানেন না, হজ করেন না? তা হলে কেন অন্যদের এই অভিধা দেয়া হবে বিশেষ মতলব না থাকলে? এর ফলে কী হয়েছে, বাংলাদেশের মুসলমানদের তা ভেবে দেখতে বলব! তারা কি আরেকটি পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা সিরিয়া-ইরাক বানাতে চান বাংলাদেশকে? ‘ইসলাম শেষ হয়ে গেল’Ñ এই হাহাকার না করে বিষয়টি ভেবে দেখতে বলব। আল্লাহ-রসুল (সা.) ইসলাম রক্ষার দায়িত্ব যারা ধর্মের দুর্বৃত্তায়নে যুক্ত, তাদের হাতে দেননি।
ধর্মের বিরুদ্ধে আমাদের কিছুই বলার নেই। কারণ, ধর্ম সাধারণের কল্যাণ কামনা করে। ধর্মের নামে ধর্মের দুর্বৃত্তায়ন আমরা চাই না। আজ যদি আমরা সঠিক ধর্ম পালন করতাম মুসলমান বা অন্য ধর্মাবলম্বী হিসেবে, তা হলে কি এতো দুর্নীতি হতো বাংলাদেশে [যা ধর্মবিরোধী], এতো রাজনৈতিক হানাহানি হতো ইসলাম নিয়ে [যা অধর্ম]?
^উপরে যেতে ক্লিক করুন