এনজিওগ্রাম (Angiogram)
এনজিওগ্রাম
এমন একটি পরীক্ষা যার মাধ্যমে শরীরের ধমনী ও শিরা গুলোকে পরোক্ষ ভাবে দেখা
যায়। পরোক্ষ ভাবে বলা হচ্ছে এই কারনে যে ধমনী ও শিরা প্রত্যক্ষ ভাবে
দেখবার ও সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত অর্থে আমরা Angiogram বলতে যা বুঝি তা হলো এক্সরের মাধ্যমে শরীরের ধমনী গুলোকে দেখা। রোগ নির্ণয়ে সচরাচর এনজিওগ্রাম করে শিরা দেখা হয়না, হলে সেটাকে বলে ভেনোগ্রাম (Venogram)।
এমনিতে
সবার কাছে এনজিওগ্রাম মানেই হলো হার্টের রোগ নির্নয়ের একটি পরীক্ষা, ঠিকই
আছে হার্টে ইশকেমিক হার্ট ডিজিজ হলে এনজিওগ্রাম পরীক্ষাটি করানো লাগতে পারে
তবে তাকে বলে করোনারি এনজিওগ্রাম (CAG - coronary angiogram)। করোনারি এনজিওগ্রাম করে হৃদপিন্ডের ধমনী সরু হয়ে গেছে কিনা বা এতে কোনো block আছে কিনা তা দেখা হয়।
অনেকেরই ধারনা করোনারি এনজিওগ্রাম পরীক্ষাটি করার জন্য রোগীকে অজ্ঞান করতে হয়। আসলে তেমনটি নয়, এজন্য পায়ের মোটা ধমনী (Femoral artery) বা হাতের ধমনী (Radial artery) তে
ক্যাথেটার ঢোকানোর জন্য চামড়ার নীচে লোকাল এনেসথেসিয়া দিয়ে অবস করে নেয়া
হয়। এরপর ঐ ক্যাথেটার দিয়ে এক্সরেতে দেখা যায় এমন একধরনের রঞ্জক পদার্থ (Contrast/ dye) হৃদপিন্ডের ধমনীতে প্রবেশ করিয়ে এক্সরে ক্যামেরার মাধ্যমে দেখা হয়। যদি কোথাও কোনো ব্লক থাকে তবে ঐ জায়গা দিয়ে রঞ্জক যেতে পারেনা বা গতি পথ সরু হয়ে যায়।
করোনারি এনজিওগ্রাম করার পর তা সিডি (CD)তে
রেকর্ড করে রোগীকে দিয়ে দেয়া হয়। এর উপড় ভিত্তি করে কার্ডিওলজিস্ট
এনজিওপ্লাস্টি করেন অথবা কার্ডিয়াক সার্জন বাইপাস অপারেশন করেন। রিপোর্ট
স্বাভাবিক হলে রোগীকে এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়না।
হার্ট ছাড়াও অন্য অঙ্গে এনজিওগ্রাম করা হয়ে থাকে যেমন পায়ে করলে তাকে বলে পিএজি (PAG-peripheral angiogram), মস্তিস্কের ক্ষেত্রে সেরিব্রাল এনজিওগ্রাম (Cerebral angiogram), অন্ত্রে করলে মেসেন্ট্রিক এনজিওগ্রাম (Mesentric angiogram), কিডনি তে করলে রেনাল এনজিওগ্রাম (Renal angiogram), গলার ধমনীতে করলে ক্যারোটিড এনজিওগ্রাম (Carotid angiogram) ইত্যাদি।
সিটি এনজিওগ্রাম
এনজিওগ্রাম
করে আমরা সহজেই শরীরের রক্তনালীর অবস্থা বুঝতে পারি। এর একটা অসুবিধা হলো
এজন্য রোগীর বড় একটি ধমনীতে ফুটো করে তাতে একটা ক্যাথেটার হার্ট পর্যন্ত
ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এতে কিছু ঝুকিতো থাকেই এছাড়া এ পরীক্ষাটি অনেক রোগীর মনে
ভীতিরও সঞ্চার করে থাকে। এই ঝুকি ও ভীতি থেকে মুক্তির জন্য সিটি স্ক্যান
করেও রক্তনালীর অবস্থা জানার একটি পরীক্ষা আবিস্কৃত হয়েছে, এর নাম করোনারি
সিটি এনজিওগ্রাম।
ইশকেমিক হার্ট রোগ নির্ণয়ে এটি একটি সর্বাধুনিক নন ইনভেসিভ (Non invasive) পরীক্ষা। এটি করার জন্য হাতের শিরা (ধমনী নয়) দিয়ে আয়োডিন যুক্ত কন্ট্রাস্ট ডাই (Contrast dye)
প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়। এরপর সিটি স্ক্যান মেশিন এর মাধ্যমে হৃদপিন্ডের
রক্তনালী বা অন্যকোনো অঙ্গের রক্তনালী পর্যবেক্ষন করা হয়। ধমনীর গায়ে চর্বি
বা ক্যালসিয়াম জমে সরু হয়ে গেলে তা সহজেই বোঝা যায়। ধমনীর যে কোনো প্রকার
ব্লক এই পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পরে।
অপেক্ষাকৃত
সহজ, ঝুকিহীন ও সংক্ষিপ্ত এই পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হবার প্রয়োজন
হয়না তাই যে সকল রোগী এনজিওগ্রাম করার ঝুকির ভীতিতে চিকিৎসা নেয়া থেকে বিরত
থাকেন তাদের জন্য সিটি এনজিওগ্রাম এক নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছে।
এই পরীক্ষাটির একটি সীমাবদ্ধতা হলো এতে শুধু রোগ নির্নয় করা যায়, সাথে সাথে
স্টেন্ট বা রিং পরিয়ে দেয়া যায়না। তাই এই পরীক্ষার মাধ্যমে কারো হার্ট এর
ধমনীতে ব্লক ধরা পরলে তাতে স্টেন্ট পরাতে অবশ্যই ইনভেসিভ এনজিওগ্রাম করতে
হবে।
ম্যামোগ্রাফি (Mamography)
ম্যামোগ্রাফি হলো স্তনের বিশেষ ধরনের এক্সরে পরীক্ষা। সাধারন এক্সরে পরীক্ষার চেয়ে এতে তেজস্ক্রিয়তা (Radiation) এর
মাত্রা অনেক কম। এ পরীক্ষায় স্তনটিকে আল্ট্রাসেনসিটিভ এক্সরে মেশিনের
গায়ে লাগিয়ে কম ভোল্টেজ এবং বেশী এম্পিয়ারেজ মাত্রার এক্সরে স্তনের ভিতর
দিয়ে পাঠানো হয়। এতে রেডিয়েশন এর মাত্রা থাকে ০.১ সিগাই এর মতো যা
অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।
ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষার মাধ্যমে হাতে যাচাই করে যে সকল স্তন টিউমার
পাওয়া যায়না সেসকল টিউমার এক্সরে তে ধরা পরে। টিউমারটি ক্যান্সার না
নিরীহ শ্রেনীর তাও ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষায় অনেক সময় ধরা পরে তবে তা
নিশ্চিত করতে অবশ্যই বায়োপসি করা প্রয়োজন। মহিলাদের বয়স ত্রিশ এর উর্ধ্বে গেলে
ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষাটি সঠিক ফলাফল দেয়। এর কম বয়সি মহিলাদের স্তনের
টিউমার নির্নয়ের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষা বেশী কার্যকর। তবে সব
মিলিয়ে শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রেই ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষাটি সঠিক ফলাফল দেয়।
টিউমারটি ক্যান্সার না নিরীহ শ্রেনীর কোনো টিউমার তা ১০০% নিশ্চিত করার
পরীক্ষা অবশ্য বায়োপসি করে হিস্টপ্যাথলজি করা।ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম - ই.সি.জি.
ই.সি.জি. বা ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম হলো এমন একটি পরীক্ষা যার দ্বারা হৃদপিন্ডের বিদ্যুৎ পরিবহন বা পরিচলন পদ্ধতিকে গ্রাফের (Graph)
এর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। হৃদপিন্ড বা হার্ট এমন একটি অঙ্গ যা নিজে
নিজেই চলতে পারে, বাইরে থেকে এর পরিচালনার জন্য কোনো স্নায়ু (Nerve)এর
উদ্দীপনার প্রয়োজন নাই। হার্ট কে সবসময় স্পন্দিত রাখার জন্য এর ভেতরে
একটি নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আছে, যাকে বলা হয় পেস মেকার (Pacemaker)।
এই পেস মেকার থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ (Electricity)
সমস্ত হার্টে একপ্রকার পরিবাহক তন্তর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিবহন
প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার ত্রুটি - বিচ্যুতি থাকলে তা হার্ট এর কার্যক্রমে
ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ইসিজি করার মাধ্যমে সেই সকল ত্রুটি এবং
প্রতিক্রিয়া গুলো একটি কাগজে গ্রাফ একে উপস্থাপন করা হয়।
একটি সরু বাকা গলিকে ১২ দিক থেকে ১২টি ক্যামেরা দিয়ে দেখালে যেমন তার সব কিছু ভালো ভাবে দেখা ও বোঝা যায় তেমনি হার্ট এর Electrical activity কে পরিষ্কার ভাবে বোঝার জন্য একে ১২ দিক থেকে ১২ টি লিড (Lead) এর মাধ্যমে দেখা হয়।
ইসিজি
করার মাধ্যমে হার্টের স্পন্দন এর হার, তা নিয়মিত কিনা, বিদ্যুৎ পরিবহনে
কোনো বাধা আছে কিনা, হার্ট এ ব্লক আছে কিনা, ইশকেমিয়া বা ইনফার্কশন আছে
কিনা, হার্ট এর মাংশপেশী মোটা হয়ে গেছে কিনা, তা ঠিক মতো কাজ করছে কিনা,
অনেকদিন যাবত উচ্চ রক্তচাপ আছে কিনা ইত্যাদি নানা তথ্য খুব সহজেই বোঝা
যায়। একজন রোগীর হার্ট এর Electrical activity খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে তাই তাকে বার বার ইসিজি করে দেখার প্রয়োজন হতে পারে। ইসিজি করার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
ভিডাল রক্ত পরীক্ষা (Widal Test)
ভিডাল
পরীক্ষা রক্তরস বা রক্তের একটি পরীক্ষা। রোগীর তীব্র জ্বর যখন ৪/৫ দিনের
বেশী স্থায়ী হয় তখন রোগের কারন নির্নয়ে এই পরীক্ষাটি করা হয়। এই
পরীক্ষাটির ফলাফল থেকে জানা যায় রোগীর টাইফয়েড জ্বর হয়েছে কিনা। টাইফয়েড জ্বর
হবার ৫-৭ দিন পরে এই টেষ্ট টি সঠিক ফলাফল দিতে খুবই কার্যকর। খুব আগে
করিয়ে ফেললে বা খুব দেরীতে করালে অনেক সময় এর ফলাফল থেকে তেমন ভাবে রোগ
সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়না।
টাইফয়েডের
জীবানু শরীরে ঢুকলে শরীর এর বিরুদ্ধে যে এন্টিবডি তৈরী করে ভিডাল টেষ্ট
করে তার মাত্রা দেখা হয়। তবে ভিডাল টেষ্ট টাইফয়েড নিশ্চিত করার কোনো
পরীক্ষা নয় এবং কি এন্টিবায়টিক ব্যবহার করলে রোগ ভালো হবে তা সম্পর্কেও
এটি কোনো ধারনা দিতে পারেনা। এই ধারণা পেতে হলে রক্তের কালচার (Blood culture) পরীক্ষাটি করে দেখতে হয়।
ইকোকার্ডিওগ্রাম
ইকো
শব্দের বাংলা অর্থ প্রতিধ্বনি। এই প্রতিধ্বনি কে কাজে লাগিয়ে বাদুর সহ
নানা প্রানী রাতের অন্ধকারে চলাচল করে, জাহাজ থেকে সমুদ্রের গভীরতা মাপা হয়
ইত্যাদি তথ্য আমাদের সবারই জানা। যখন এই ইকো কে কাজে লাগিয়ে শরীরের পেটের
ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখা হয় তাকে বলা হয় আলট্রাসনোগ্রাম (Ultrasonogram), আর যখন হৃদপিন্ডের বিভিন্ন অংশ দেখা হয় তাকে বলা হয় ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram)।
প্রশ্ন উঠতে পারে শব্দ আবার কিভাবে দেখা যায় তাইনা? আসলে আমাদের শ্রবন মাত্রার উর্ধের (Hypersonic) শব্দ কে একটি Probe এর
মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়ে তার প্রতিধ্বনি আবার সেই প্রোব দিয়ে গ্রহন করা হয়, এর
পর কম্পিউটারে তাকে কৃত্রিম ভাবে ইমেজ বা ছবি আকারে গঠন করে দেখা হয়। যে
অঙ্গ যত গভীরে তাকে ভেদ করতে শব্দ কে তত ভেতরে যেতে হয়, তেমনি যে অঙ্গটি যত
কঠিন সে তত দ্রুত পুর্ণমাত্রায় শব্দের প্রতিধ্বনি পাঠায়। শব্দের এই ধর্মের
উপড় ভিত্তি করেই আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং ইকোকার্ডিওগ্রাম করা হয়।
ইকোকার্ডিওগ্রামের
মাধ্যকে বোঝা যায় হার্ট ঠিক মতো রক্ত পাম্প করতে পারছে কিনা, হার্ট এর
কোনো প্রকোষ্ঠ বড়/ছোটো হয়ে গেলো কিনা, এর মাংশপেশী মোটা বা পাতলা হয়ে গেলো
কিনা, হার্ট এর Valve গুলো
ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, কোথাও অস্বাভাবিক কোনো ফুটা আছে কিনা বা জন্মগত
অন্য কোনো ত্রুটি আছে কিনা, কোনো টিউমার আছে কিনা, হার্ট এ পানি জমলো কিনা,
হার্টে রক্তের গতি কেমন ইত্যাদি। আসলে ইকোকার্ডিওগ্রাম পরীক্ষাটি
আবিস্কারের পর হার্টের বিভিন্ন রোগ সনাক্ত করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। ইসিজির
মতো ইকোকার্ডিওগ্রাম করার ও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।
রক্তের কালচার (Blood Culture)
শরীরে যে জীবাণুই আক্রমন করুক না কেনো, যেখানেই
আক্রমন করুকনা কেনো প্রায় সবসময়ই তা রক্তে চলে আসে। এজন্য শরীরের কোথাও
জীবাণুর আক্রমন ঘটলে রক্ত পরীক্ষা করালে ঐ জীবাণুর উপস্থিতি টের পাওয়া
যায় (শুধুমাত্র অল্পকিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম পাওয়া যেতে পারে) আর সেই
পরীক্ষাটির নামই ব্লাড কালচার।
ব্লাড কালচার করতে হলে রোগীর বেশ খানিকটা রক্ত নিয়ে তা জীবানণুর জন্য একটি পুষ্টিকর মিডিয়ায় (Culture media) দেয়া
হয়। অনেক সময় একই সাথে বেশ কয়েকটি মিডিয়াও ব্যবহার করা হয়। মিডিয়ায়
জীবানুটি বংশ বৃদ্ধি করে বেড়ে উঠলে এরপর তাকে বিভিন্ন বর্ণে রঙ্গিন করে
অণুবীক্ষন যন্ত্রের নীচে দেখে সনাক্ত করা হয়। এরপর কোন কোন এন্টিবায়োটিক
এই জীবানুর উপর কাজ করবে তা নির্নয়ের জন্য জীবানুগুলোকে বিভিন্ন
এন্টিবায়োটিক দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয়। একে সেনসিটিভিটি (Sensitivity test) বলা হয়।
ব্লাড
কালচার পরীক্ষার ফলাফল পেতে একেক জীবানুর জন্য একেক সময় লাগে। বেশীর ভাগ
ক্ষেত্রেই তিন দিনের মধ্যে এর ফলাফল পাওয়া যায়। তবে টিবির জীবানু কালচার
করে পেতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। ব্লাড কালচার করে দায়ী ব্যাকটেরিয়াটি
সম্পর্কে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। তবে এর
অল্পকিছু ব্যতিক্রম আছে। ব্যকটেরিয়া না হয়ে অন্য কোনো জীবানু হলে ব্লাড
কালচার পরীক্ষাটি তা নির্ণয়ে ব্যর্থ পরীক্ষা হিসেবে পরিগণিত হয়।