সেকেন্ডারি টিউমার (Secondary Bone Tumour)
বড়দের
হাড়ে সবচেয়ে বেশী যে ধরনের টিউমার হতে দেখা যায় তা হলো সেকেন্ডারি টিউমার।
সেকেন্ডারি টিউমার প্রায় সবসময়ই ক্যান্সার জাতীয় একটি রোগ। একে সেকেন্ডারি
বলা হয় এই কারনে যে এটা অস্থির নিজস্ব টিউমার নয়, শরীরের অন্য কোথাও ক্যান্সার হলে তা থেকে ছড়িয়ে এটা অস্থিতে আসে। যেখান থেকে এই টিউমারটি এসেছে তাকে বলা হয় প্রাইমারি টিউমার।
স্তন, ফুসফুস, প্রস্টেট গ্রন্থি, কিডনি এবং থাইরয়েডে গ্রন্থিতে ক্যান্সার হলে তা সহজেই অস্থিতে ছড়িয়ে পড়ে, আর এই ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার এর বীজটি অস্থিতে যে টিউমার তৈরী করে তাকে সেকেন্ডারি বোন টিউমার (Secondary bone tumour) বা মেটাস্টাটিক টিউমার (Metastatic tumour) বলা হয়।
বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে হাত এবং পায়ের হাড়ের উপড়ের দিকে মেটাস্টাটিক টিউমার হতে দেখা যায়, এছাড়া কোমড়ের হাড় এবং মেরুদন্ডের হাড়েও এই টিউমার হতে পারে। এই ধরনের টিউমার হলে রোগী খুব ব্যথা অনুভব করে, তার হাত ও পায়ের কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়, নড়াচড়া করতে অসুবিধা হয় এবং খুব ছোট খাট আঘাতেই টিউমার হওয়া হাড়টি ভেঙ্গে যেতে পারে, সেই সাথে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রাও অনেক বেড়ে যেতে দেখা যায়।
হাড়ের এক্সরে করলে বোঝা যায় সেখানে এই টিউমার হয়েছে কিনা। সেকেন্ডারি টিউমার হলে শুধু এর চিকিৎসা করে কোনো লাভ নেই, প্রাইমারি টিউমারের চিকিৎসা করতে হয় সবচেয়ে আগে। এজন্য সবার আগে জানতে হয় কোন স্থানের ক্যান্সার থেকে অস্থিতে এই বীজ টি এসেছে। এজন্য স্তন, ফুসফুস, প্রস্টেট ইত্যাদি অঙ্গগুলোকে খুব ভালো করে পরীক্ষা করে দেখতে হয় সেখানে কোনো ক্যান্সার হয়েছে কিনা। এজন্য প্রয়োজন হলে বুক এবং পেটের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করাতে হয়। এভাবেও রোগের উৎস ধরা না গেলে বায়োপসি করে নিশ্চিত হতে হয় কোথা থেকে টিউমারটি এসেছে।
প্রাইমারি টিউমারের উৎস নিশ্চিত করতে পারলে প্রথমে তার চিকিৎসা শুরু করতে হয়, প্রাইমারি রোগ ভালো হলে অথবা নিয়ন্ত্রনে আসলে অস্থির টিউমারের চিকিৎসা শুরু করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি দিয়ে প্রাইমারি টিউমার ফেলে দেবার পরে অস্থির টিউমারটি কেটে ফেলে দেয়া হয় এবং সে স্থানে প্রস্থেসিস বসানো হয়। তবে এর প্রকৃত চিকিৎসা নির্ভর করে টিউমারটি কোন স্টেজে আছে তার উপর।
অস্টিওসারকোমা (Osteosarcoma)
অস্টেওসারকোমা
অস্থির টিউমার গুলোর মধ্যে খুব খারাপ ধরনের বা ক্যান্সার জাতীয় একটি
টিউমার। এই রোগ হলে মৃত্যুর আশংকা খুবই বেশী। সাধারনত ৯ থেকে ১৬ বয়সের
শিশুদের এ রোগটি হয়ে থাকে। হাটুতে অস্টিওসারকোমা হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী, বাহুর হাড়েও অস্টিওসারকোমা হবার হার উল্লেখযোগ্য হারে বেশী। হাড়ের যে অংশটা ক্রমবর্ধমান থাকে সেই অংশে এই টিউমারটির আবির্ভাব ঘটে।
ধীরে ধীরে তা অস্থির অন্য অংশে বা অন্য অস্থিতে বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
শুরুতে হাড়ের কোনো একটা অংশ ফুলে যাওয়া এবং সেই সাথে ব্যথা হওয়াই এই রোগের লক্ষন হিসেবে দেখা দেয়, সাধারনত বাচ্চারা কোনো আঘাত পাবার পর পর এমন লক্ষন দেখা দেয়ায় অভিভাবকেরা অনেক সময়ই এই লক্ষন টিকে গুরুত্ব দেন না এবং শিশুর রোগটি সবার অজান্তে বাড়তে বাড়তে জটিল হতে থাকে।
এক্সরে করলে অস্টিওসারকোমার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তবে রোগটির অবস্থান নিশ্চিত করতে এম,আর,আই এবং বোন স্ক্যান করারও প্রয়োজন দেখা দেয়। বায়োপ্সি করলে এই রোগটি সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। অর্থোপেডিক সার্জনগন এই ধরনের রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। শুরুর দিকে রোগটি নির্ণয় করা গেলে টিউমার জনিত অংশটি কেটে ফেলে দিয়ে (Amputation) এবং একধরনের কেমোথেরাপী দিয়ে রোগীর জীবন বাচানো সম্ভব হয়। রোগটি জটিল হয়ে ছড়িয়ে পড়লে রোগীর অবস্থা আশংকা জনক হয়ে যায় এবং রোগীর প্রাণহানী ঘটতে পারে।
অস্ট্রিওকন্ড্রোমা বা এক্সোস্টোসিস
অস্থি
বা হাড় এ যত নিরীহ শ্রেনীর টিউমার হয় তার মধ্যেই এই টিউমারটিই প্রধান।
সাধারনত বয়ঃসন্ধির পর থেকে ২৫-৩০ বছরের মধ্যেই এটির আবির্ভাব লক্ষ্য করা
যায়। অনেক সময় রোগী হাড়ে হাল্কা কোনো আঘাত পাবার পর থেকেই এর উপস্থিতি টের
পান। তবে অনেক সময় কোনো আঘাত পাওয়া ছাড়াও এই টিউমারের কারনে নতুন কোনো
ব্যথার আবির্ভাব জানিয়ে দিতে পারে রোগী তার হাড়ে একটি টিউমার বহন করছেন।
টিউমার হলে যথারীতি হাড়ের ঐ অংশ ফুলে যায়। সাধারনত হাড়ের যে কোনো এক
প্রান্তে এটি অবস্থান করে। হাত দিয়ে অনুভব করলে রোগী নিজেই এটা টের পান। এক
সাথে এক বা একাধিক এক্সোস্টোসিস একই হাড়ে হতে পারে। এ রোগের জন্য
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এক্সরে করে এই টিউমারের
উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। অপারেশন করালে এই টিউমারটি চিরতরে ভালো হয়ে যায়।
অনেক দিন ধরে কারো এই টিউমার থাকলে হাজারে এক জনের ক্ষেত্রে তা ক্যান্সার
জাতীয় টিউমারে রূপান্তরিত হতে পারে।
ইউয়িংস সারকোমা(Ewing’s Sarcoma)
অনেক সময়ই আমরা শুনি যে অমুকের বাচ্চা Bone cancer এ
মারা গেছে বা ছোটো বাচ্চার খুব ভয়াবহ ক্যান্সার হয়েছে। ইউয়িং সারকোমা
এমনই একটি ভয়াবহ টিউমার। এটা অস্থির ক্যান্সার জাতীয় টিউমার এবং শুধু
বাচ্চাদেরই এই টিউমারটি হয়ে থাকে। সাধারনত ১০ থেকে ২০ বছরের বাচ্চাদের এই
টিউমার হতে দেখা যায়। হাটুর নিচের অস্থিগুলোতে এবং কলার বোন এ এই টিউমার
বেশী হয়।
রোগটি হলে রোগীর হাড়ে টনটনে ব্যথা হয় এবং ফুলে যায়। রোগী বেশ অসুস্থ হয়ে পরে, অনেক সময় তীব্র জর, গা ম্যাজ ম্যাজ করা, বমি বমি ভাব এই উপসর্গ গুলোও এই রোগে দেখা যায়। রোগীর হাড়ের ফোলাটি গরম হয়ে যায় এবং স্পর্শ করলেই ভীষন ব্যথা করে।
এক্সরে করলে ইউয়িং সারকোমার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যেতে পারে। এম,আর,আই এবং সিটি স্ক্যান করে এটা কতটুকু ছড়িয়ে পরেছে সে সম্মন্ধে জানা যায়। এক্সরে করলে অনেক সময় ইনফেকশন থেকে একে আলাদা করা কঠিন হয়ে যায় এজন্য বায়োপসি করে এই রোগের উপস্থিতি নিশ্চিত করা লাগতে পারে।
শুধু সার্জারি করলে এই টিউমার ভালো হবার কোনো সুযোগ নেই, রেডিওথেরাপি দিলে অনেক সময় এটা নিয়ন্ত্রনে চলে আসতে দেখা যায় তবে তা জীবন দীর্ঘায়ু করতে খুব কম প্রভাবই ফেলতে পারে। কেমোথেরাপীর ফলাফল সেই তুলনায় ভালো। কেমোথেরাপী নেয়া বাচ্চাদের শতকরা ৫০ ভাগকে ৫ বছর পর্যন্ত বেচে থাকতে দেখা গেছে। তাই সবচেয়ে ভালো ফলাফল পেতে হলে সার্জারি, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি এই তিন এর মিশ্রনে একটি চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসা যাই দেয়া হোক অভিভাবককে মনে সাহস রেখে বুঝতে হবে এই শিশুর পরিনতি খুব খারাপ কারন এখনো এই পৃথিবীতে ইউয়িং সারকোমা ভালো করে দেবার মতো কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিস্কৃত হয়নি।
জায়ান্ট সেল টিউমার (Giant Cell Tumour)
অস্থির
এই নিরীহ শ্রেনীর টিউমারটির বিশেষ পরিচয় হলো এটা খুব দ্রুত বর্ধনশীল।
জায়ান্ট নামকরনের কারন হিসেবে যদিও কেউ ভাবতে পারেন এটা বুঝি বিশাল আকৃতির
কোন টিউমার হবে বাস্তবে কিন্ত তা নয়, এই টিউমারে অনেক অনেক জায়ান্ট সেল বা কোষ থাকে বলেই এর নাম এমন। হাটুর অস্থিতে এই টিউমার হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী, তবে
কবজি এবং বাহু স্কন্ধে বা শোল্ডার জয়েন্টেও এই টিউমার হতে দেখা যায়।
এটি অল্প বয়সে হবার মতো একটি টিউমার এবং সাধারনত ২০ থেকে ৪০ বছরের
মাঝামাঝিই এই টিউমারটি বেশী হতে দেখা যায়। এক্সরে পরীক্ষা করার মাধ্যমে এর
উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। জায়ান্ট সেল টিউমার সাধারনত একটির বেশী হয়না তবে
মূল টিউমার থেকে নুতন টিউমারের জন্ম হবার সম্ভাবনা আছে। এই রোগ হলে একজন
অর্থোপেডিক সার্জন এর সাথে যোগাযোগ করা উচিত।
কন্ড্রোসারকোমা (Chondrosarcoma)
কন্ড্রোসারকোমা তরুনাস্থি বা কার্টিলেজের ক্যান্সার জাতীয় একটি টিউমার, ক্যান্সার
জাতীয় হলেও এটা তেমন ভয়াবহ ধরনের কোনো রোগ নয়। সাধারনত ৪০ থেকে ৫০ বছর
বয়সের মধ্যে এই রোগটি হতে দেখা যায়। রোগটি হলে সেই স্থানের হাড় কিছুটা ফুলে
যায় এবং সেখানে হাল্কা ব্যথা অনুভব হতে থাকে। ফোলা অংশটি ধীরে ধীরে বড় হতে
থাকে এবং অনেক মাস পরে রোগী বুঝতে পারে যে তার হাড়ে একটি রোগ হয়েছে।
এক্সরে করে কন্ড্রোসারকোমার উপস্থিতি সম্বন্ধে ধারনা পাওয়া যেতে পারে। তবে এর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে এবং এটা কতটা ছড়িয়ে পড়েছে তা বোঝার জন্য সিটি স্ক্যান এবং এম,আর,আই করার প্রয়োজন আছে। এটা সত্যিই ক্যান্সার জাতীয় টিউমার কিনা তা বোঝার জন্য অবশ্যই বায়োপসি করে তা নিশ্চিত করতে হয়।
কন্ড্রোসারকোমা কখনো কখনো পুরোনো কোনো নীরিহ টিউমার থেকে রূপান্তরিত হয়ে হতে পারে আবার কখনো এটি একদম নুতন করেও হতে পারে। এর উৎপত্তি যেভাবেই হোকনা কেন চিকিৎসা কিন্ত একই। রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি এর উপড় খুব একটা কাজ করেনা। সার্জারিই এর একমাত্র চিকিৎসা, সার্জারি করে টিউমারটি ফেলে দিলে এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।
কন্ড্রোমা (Chondroma)
কন্ড্রোমা
তরুনাস্থির নিরীহ শ্রেনীর একটি টিউমার। বয়োসন্ধির শুরু থেকে ৫০ বছর
পর্যন্ত একজন মানুষের এই টিউমার হবার সম্ভাবনা থাকে। এক সাথে একটি বা
একাধিক কন্ড্রোমা হতে পারে, হাতেই সবচেয়ে বেশি কন্ড্রোমা হতে পারে, এছাড়া উরুর অস্থি এবং বাহুর অস্থিতেও এর উপস্থিতি দেখা যায়। এই টিউমার খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গের জানান দেয়,
সাধারনত অন্য
কোনো কারনে এক্সরে পরীক্ষা করালে এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। এই টিউমারটি
ক্ষতি কারক কোনো টিউমার নয় তবে অনেক দিন যাবত থাকলে হাজারে একজনের
ক্ষেত্রে এটির ক্যান্সার জাতীয় টিউমার এ রূপান্তরিত হবার সুযোগ রয়েছে।ঘাড় ব্যথা / স্পন্ডাইলোসিস
প্রাপ্তবয়স্কদের
মাঝে বোধকরি এমন লোক খুজে পাওয়া খুবই দুস্কর যাদের জীবনে কখনো ঘাড়ে
ব্যথা হয়নি। এ যেনো ঘাড় আছে যার ব্যথা আছে তার। তবে মামুলি এই ব্যথা যখন
ঘাড়ে সাড়াশির মতো চেপে বসে তখনই সবার দফা হয় রফা, আর কাজ কর্ম বন্ধ রেখে ছুটতে হয় চিকিৎসকের দোরগোড়ায়।
সারভিকাল স্পন্ডাইলোসিস (cervical spondylosis) হলে ঘাড়ে যেমন ব্যথা হয় তেমনি মাথার নিম্নাংশেও ব্যথা হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে এই ব্যথা দুই কাধ, বাহু, হাত এমন কি আঙ্গুলেও ছড়িয়ে পরতে পারে। কারো কারো আবার মাথা ব্যথা/ পিঠের পিছনে ব্যথা, হাত/বাহু দুর্বল বা অবশ হয়ে আসা বা চিনচিনে ব্যথা করা এসব উপসর্গ ও দেখা দিতে পারে।
নিশ্চয়ই মনে প্রশ্ন আসে কেন এমন ব্যথা হয়? আপনার ঘাড়খানা কষ্টকরে যেই হাড়গুলো শক্ত করে রাখে তারা হলো কশেরুকা (cervical vertebra)এবং
তাদের মাংশপেশী। আর এই কশেরুকাদের মাঝের স্বাভাবিক ফাক গুলো যখন কমে আসে
তখন ই শুরু হয় ঘাড়ে ব্যথা। কারণ এই ফাকগুলোদিয়ে বের হয় আপনার স্নায়ু (nerve), আর হাড়ের ফাক কমেগেলে এই নার্ভের উপড় চাপ পরে এবং এইসকল নার্ভ যেসকল জায়গায় অনুভুতি বহন করে তারা সকলে বেদনার্ত হয়ে উঠে।
কশেরুকার মাংশপেশীতে টান পড়া, হাড় ক্ষয়ে যাওয়া বা বৃদ্ধি পাওয়া, অস্থিসন্ধিতে (joint) রোগ হওয়া, লিগামেন্ট এ টান পরা ইত্যাদি নানাবিধ কারনে এমনটি হতে পারে, যদিও এর মধ্যে প্রথম কারনটিই প্রধান বলে গণ্য হয়।
পুরুষের তুলনায় মহিলারা এই রোগে অনেক বেশী আক্রান্ত হয়। যে সকল পেশায় দীর্ঘক্ষন মাথা নীচু করে কাজকরতে হয় (স্বর্ণকার, ড্রাইভার, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, সেলাইকারি ইত্যাদি) বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তারাই এই রোগের ভুক্তভোগী।
এ
রোগ হলে অবশ্যই চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত। তিনি পরীক্ষা করে সহজেই
এই রোগটি নিশ্চিত করতে পারেন। তবে রোগের বিস্তৃতি এবং কারণ নির্ণয়ে ঘাড়ের
এক্সরে এবং অনেক সময় এম,আর,আই (MRI) পরীক্ষা করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। ঘাড়ের বিশ্রাম নেয়া এ রোগের প্রধান চিকিৎসা, সেই সাথে ব্যথার অসুধ (NSAID) সেবন, গরম সেক নেয়া, কখনো কখনো গলায় শক্ত কলার (cervical collar) ব্যাবহার এবং সেই সাথে ফিজিওথেরাপি (physiotherapy)নিলে
এ রোগ থেকে নিস্তার মেলে। তবে অনেক সময় ব্যথার তীব্রতা বেশি হলে এবং
অসুধে তা নিয়ন্ত্রন করা না গেলে সার্জারি বা অপারেশন ই এর একমাত্র চিকিৎসা
হয়ে দাঁড়ায়।এ জন্য শুরুতেই এ রোগের চিকিৎসা করিয়ে নেয়া উত্তম। যেহেতু
নির্দিষ্ট পেশাজীবিদের মাঝে এ রোগের প্রকোপ অনেক বেশী তাই এ রোগের ঝুকিতে (repetitive strain injury) থাকা
পেশাজী্বিদের অবশ্যই কাজের ফাকে ফাকে ঘাড়ের বিশ্রাম নেয়া উচিৎ এবং ধীরে
ধীরে ঘাড় চারপাশে ঘুড়িয়ে দৈনিক নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত।
বাতের ব্যথা
বাতজ্বর আর বাত কিন্ত এক রোগ নয়। বাতজ্বর (Rheumatic fever)হলে অস্থিসন্ধি (Joint)তে ব্যাথা থাকে এটা যেমন ঠিক, বাতের (Gout) ব্যথার সাথে ও আবার কারো কারো জ্বর থাকতে পারে, তবুও রোগ দুটি একেবারেই ভিন্ন রোগ।
বাতের ব্যথায় ভূগেনি এমন নানা-নানী বা দাদা দাদী খুজে পাওয়া খুবই দুস্কর। রক্তে ইউরিক এসিডের (Uric acid) মাত্রা বেড়ে গেলে বাত বা গাঊট (Gout) হয়। কিছু কিছু অসুধ সেবনে রক্তে uric acid এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে যেমন থায়াজাইড, এসপিরিন, পাইরাজিনামাইড ইত্যাদি। তেমনি রেনাল ফেইলুর, হাইপার প্যারাথাইরয়েডিজম এমন কিছু রোগেও ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে বাত হতে পারে।
শতকরা
৭০ ভাগ বাতের ব্যথাই শুরু হয় পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে। এথেকে গোড়ালি, হাটু,
হাত ও পায়ের ছোট জয়েন্ট, কবজি, কনুই ক্রমান্বয়ে এরোগে আক্রান্ত হতে
পারে। আক্রান্ত অস্থিসন্ধিটি ফুলে কিছুটা লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং ব্যথা
করে। অনেক সময় খুধামন্দা এবং জ্বরও এর সহচর হিসেবে দেখা দেয়।
বাত
রোগে রক্তে ইউরিক এসিড এর মাত্রার সাথে সাথে ই,এস,আর এবং শ্বেতকনিকার
সংখাও বৃদ্ধি পায়। এক্সরে করলে হাড়ে পরিবর্তন ধরা পড়ে। অস্থিসন্ধি থেকে
সাইনোভিয়াল ফ্লুইড বা অস্থিরস পরীক্ষা করেও এই রোগ নিশ্চিত হওয়া যায়।
বাতের
ব্যথার চিকিৎসায় বিভিন্ন ব্যথার অসুধ খেতে হয় এটা সবারই জানা সেই সাথে
ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রনের জন্য এলুপরিনল জাতীয় অসুধও চিকিৎসকের পরামর্শ
অনুযায়ী খেতে হতে পারে। ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যায় এমন যে কোনো খাবার
পরিমিত এবং নিয়মমাফিক খেতে হবে।
টেনিস এলবো (Tennis Elbow)
লন টেনিস খেলোয়াড়েরা এই ধরনের সমস্যায় বেশী পড়ে দেখেই এই রোগের এমন নাম, কিন্ত
যারা আদৌ কোনোদিন টেনিস কোর্টে যায়নি তাদেরও এমন সমস্যা হতে পারে।
সমস্যাটি হলো কনুই এ তীব্র ব্যথা অনুভব করা। আঘাত পাওয়া ছাড়া টেনিস এলবোই
হলো কনুই ব্যথার সর্বপ্রধান কারন। এটা হবার সঠিক কারণ কি সেটা জানা না
গেলেও সাধারণত হঠাৎ করে কনুই এর উপড় চাপ পড়ে এমন ভারী কাজ করার কারনে এমনটি শুরু হতে দেখা যায়।
সাধারণত বেশীর ভাগ ভুক্তভোগীরই বয়স থাকে ৩০ থেকে ৫০ এর মধ্যে আর রোগীদের একচেটিয়া অভিযোগ থাকে যে হঠাৎ করেই তাদের কনুই
এর বাইরের দিকে প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছে। একটু ভালো করে জিজ্ঞেস করলে সব রোগীই
অবশ্য মনে করতে পারে যে খুব অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সে কনুইয়ের উপড় উলটা
পালটা চাপ পড়ে এমন কিছু সে করেছে, সেটা হঠাৎ ভারী কিছু তোলাই হোক, ব্যায়াম করাই হোক বা ক্রিকেটে ধুমধাম ব্যাটিং করাই হোকনা কেনো।চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষা করে তিনি নিজেই এই রোগ নিশ্চিত করতে পারেন তবে কনুই এর বিশেষ ধরনের আল্ট্রাসাউন্ড এবং এম,আর,আই করেও অনেক সময় এই রোগ নিশ্চিত করা হয়। কারন যাই হোক এই ধরনের সমস্যা খুব সহজেই ভালো হয়ে যায়। এজন্য প্রথমেই যে কাজটি করে এই ব্যথা শুরু হয়েছে সেই কাজটি থেকে বিরত থাকতে হয়। এর পর সামান্য ব্যথা নাশক ব্যবহার করলেই চিরমুক্তি মেলে। তবে জটিল পর্যায়ের ব্যথার জন্য কনুই এর অস্থিসন্ধিতে স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন নেবার প্রয়োজন হতে পারে। খুব বেশী বার ইঞ্জেকশন না নেয়াই ভালো তবে এর সাথে ফিজিওথেরাপী নিলে দ্রুত আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। রোগের জটিল পর্যায়ে এবং বিশেষ করে পেশাজীবি খেলোয়াড়দের এই রোগ হলে অনেক সময় অপারশনের প্রয়োজন হতে পারে। অভিজ্ঞ অর্থপেডিক্স সার্জনগন এই অপারেশন করে থাকেন। এই অপারশনের সাফল্য প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ এর মতো।
অনেক সময় কনুইয়ের বাইরের দিকে ব্যথা না হয়ে যখন কনুইয়ের ভেতরের পাশে ব্যথা হয় তাকে গলফার্স এলবো (Golfer’s elbow) বলা হয়। এর চিকিৎসাও টেনিস এলবোর মতোই।
ফ্রোজেন শোল্ডার (Frozen shoulder)
স্কন্ধ বা শোল্ডার জয়েন্ট এ ব্যথা বয়স্ক মানুষের খুব পরিচিত একটি সমস্যা। ফ্রোজেন শোল্ডার এর কারনেও এমনটি হতে পারে। সাধারণত ৫০ উর্ধ্ব মহিলারা
এ রোগে বেশী আক্রান্ত হয় তবে পুরুষ রোগীর সংখাও একদম কম নয়। যাদের
ডায়াবেটিস এবং থাইরয়েডের সমস্যা থাকে তাদের মাঝে এই রোগের প্রকোপ বেশী।
ফ্রোজেন শোল্ডার হলে স্কন্ধ বা শোল্ডার জয়েন্ট এ ব্যথা হওয়াটাই মুল উপসর্গ, এছাড়াও রোগীর হাত বা বাহু নড়াচড়া করতে সমস্যা হয়; বিশেষ করে শরীর থেকে বাহুকে বেশী দূরে সরানো যায়না, হাত নাড়ানোর পরিধি ছোট হয়ে আসে। এই সমস্যা গুলো হঠাৎ করেই একদিন শুরু হতে পারে আবার কাধে বা স্কন্ধে সামান্য ব্যথা পাবার পরও শুরু হতে পারে। শুরুটা যে কারনেই হোক না কেন আর সমস্যা আর যাই থাকুক রোগীকে সাধারণত তীব্র ব্যথা নিয়েই চিকিৎসকের কাছে আসতে দেখা যায়।
ফ্রোজেন শোল্ডার সমস্যাটি ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এরপর নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই অনেক সময়ই এর কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয়না। তবে ব্যথার জন্য শক্তিশালী ব্যথা নাশক ব্যবহারের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। অনেক সময় চিকিৎসকেরা স্টেরয়েড জাতীয় অসুধ ব্যবহারেরও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। হাল্কা ফিজিওথেরাপীও এই রোগে কিছু প্রশমন দেয় তবে বেশী ফিজিওথেরাপী নিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কোনো কারনে যদি হাত একদম জমে যায় এবং বছর তিনেক পরেও সমস্যার কোনো উন্নতি না হয় তাহলে অপারশনের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থোপেডিক সার্জন বা হাড় ও সন্ধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ এই চিকিৎসা করে থাকেন।
মেরুদন্ড (vertebral column)
সহজ
বাংলায় বলতে গেলে মেরুদন্ড মানুষের দেহের পেছনের দিকে খুব শক্ত হাড়ের
(কশেরুকা - vertebra)তৈরী একখানা দন্ডের ন্যায় বস্তু যার ভীষন রকম আকাবাকা
হবার ক্ষমতা রয়েছে, ঠিকই শুনছেন - মেরুদন্ড সোজা করে রাখা কিন্ত খুব সহজ
কাজ নয়। পুরো মেরুদন্ডটি প্রায় গোটা ত্রিশেক কশেরুকা দারা তৈরী, যারা
প্রায় প্রত্যেকেই একে অপরের উপর সহজেই সবদিকে নড়াচড়া করতে পারে, মানে
সামনে-পিছনে-ডানে-বায়ে, তাহলে মেরুদন্ড কি কখনোই সোজা রাখা যায়না? অবশ্যই
যায়, একে ঘিরে একগাদা সবল মাংসপেশী আছে যাদের ব্যবহার করে মেরুদন্ডকে
সোজা রাখা যায়; তবে স্বাভাবিক ভাবে সব সুস্থ্য মানুষের মেরুদন্ডই কিন্ত
সামান্য বাকা থাকে।
মেরুদন্ড গঠনে যে সকল কশেরুকাগুলো অংশ নেয় তাদের ৭ টি থাকে গলদেশে, এদের বলে cervical vertebra (C1 – C7), ১২ টি থাকে বক্ষদেশ বরাবর যাদের বলা হয় thoracic vertebra (T1 – T12), কোমড় বা মাজা বরাবর থাকে ৫ টি এদের বলা হয় Lumber vertebra (L1- L5), পুচ্ছদেশে থাকে ৫টি যাদের বলা হয় Sacral vertebra (S1-S5)। এরও নীচে যার অবস্থান তাকে বলা হয় কক্সিস Coccyx, আমরা বোঝার সুবিধার্থে তাকে একটি হিসেবেই গন্য করবো।
প্রত্যেকটি কশেরুকার মধ্যেই একটি করে বড় ফুটো (spinal canal) রয়েছে যা দিয়ে মস্তিষ্কের বর্ধিত অংশ মেরুরজ্জু বা spinal cord এবং গুরুত্বপূর্ন রক্তনালী যায়। এছাড়া দুটি সংলগ্ন কশেরুকার মাঝে দুই পাশে দুটো ফুটো (intervertebral foramen)রয়েছে এর ভেতর দিয়ে শরীরের খুব গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু বা nerve বের হয়ে শরীরের বিভিন্ন মাংশপেশীকে মস্তিস্কের সাথে সংযুক্ত করে, যেমন গলদেশে রয়েছে ৮ জোড়া (cervical nerve), বক্ষদেশে ১২ জোড়া (Thoracic nerve), কোমড় বরাবর ৫ জোড়া (Lumber nerve) এবং পুচ্ছদেশ এ চার জোড়া (Sacral nerve)। আর এভাবেই দেহের সকল মাংশপেশী মস্তিষ্কের সরাসরি নিয়ন্ত্রনে থাকে।
কশেরুকাগুলো পরস্পরের সাথে বিভিন্ন লিগামেন্ট (Ligament) এবং মাংশপেশী দ্বারা যুক্ত থাকে। আবার সংলগ্ন দুটি কশেরুকার মাঝে থাকে একটি করে গদির (Cushion) মতো চাকতি, একে বলা হয় intervertebral disc।
এর মূল কাজ পরস্পর দুটি কশেরুকার সংঘর্ষ এড়ানো এবং এদের মাঝের নড়াচড়াকে
সুস্থির রাখা। যখন এই সব উপাদানের যে কোন একটি অর্থাৎ লিগামেন্ট,
ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক, মাংশপেশী বা কশেরুকা কারো কোন রকম সমস্যা দেখা
দেয় তখনই এদের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া স্নায়ুতে চাপ পরে এবং পার্শবর্তী
মাংশপেশীতে ব্যথা অনুভুত হয়। যেমন গলদেশে হলে ঘাড়ে ব্যথা, বক্ষদেশে হলে
পিঠেব্যথা, কোমড়ে হলে কোমড় ব্যথা ইত্যাদি ইত্যাদি। শুধু কি তাই? এই
সমস্যা গুলো বেড়ে গেলে স্নায়ুগুলো যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায় তাহলে তা
থেকে আরো জটিল জটিল উপসর্গ হতে পারে। যেমন হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, প্রসাব
বা পায়খানার বেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এমন আরো কিছু।
সুস্থ্য
থাকার জন্য আমাদের সকলেরই মেরুদন্ড এবং স্পাইনাল কর্ড ও নার্ভ সম্পর্কে
অল্পবিস্তর জ্ঞান রাখা উচিত। এতে করে আমরা সকলেই আমাদের অনেক গুলো রোগের
কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সহজে ধারনা পেতে পারবো। তবে সহজ কথায় নিয়মিত
ভারী কাজ না করা, হাটা হাটি, দৌড়ানো এই জাতীয় হাল্কা ব্যায়াম করা
ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের মেরুদন্ডের যত্ন নেয়া যায় এবং এভাবে মেরুদন্ডের
অনেক ধরনের রোগ এড়িয়ে চলা যায়।