প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রন (Natural method of contraception)
মেয়েদের মাসিক ঋতুচক্র (Menstrual cycle) এমন যে এতে এমন কিছু দিন আছে যা নিরাপদ দিবস (Safe period) হিসেবে ধরা হয়। এই দিবস গুলোতে স্বামী-স্ত্রীর অবাধ মিলনের (Sexual act) ফলে স্ত্রীর সন্তান সম্ভবা হবার সম্ভাবনা থাকেনা।
যেহেতু এই পদ্ধতিটি প্রকৃতিগত ভাবেই নির্দিষ্ট করা তাই একে প্রাকৃতিক
পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বলা হয়। অনেক সময় একেক্যালেন্ডার পদ্ধতিও বলা
হয়।
এ পদ্ধতি কার্যকর করতে অবশ্যই জেনে নিতে হবে আপনার স্ত্রীর ঋতুচক্রের নিরাপদ দিন কোন গুলো। এজন্য সবার আগে জানা চাই তার মাসিক নিয়মিত হয় কিনা, হলে তা কতদিন পরপর হয়। এবার সবচেয়ে কম যতদিন পরপর মাসিক হয় তা থেকে ১৮ দিন বাদ দিন, মাসিক শুরুর ১ম দিন থেকে ঐ দিনটিই হলো প্রথম অনিরাদ দিন। আবার আপনার স্ত্রীর সবচেয়ে বেশী যতদিন পরপর মাসিক হয় তা থেকে ১০ দিন বাদ দিন, মাসিক শুরুর ১ম দিন থেকে ঐ দিনটিই হলো শেষ অনিরাদ দিন।
ধরুন আপনার স্ত্রীর মাসিক ২৮ থেকে ৩০ দিন পরপর হয়। তাহলে ২৮-১৮=১০, অর্থাৎ মাসিকের শুরুর পর থেকে প্রথম ৯ দিন আপনার জন্য নিরাপদ দিবস, এই দিন গুলোতে অন্য কোনো পদ্ধতি ছাড়াই সঙ্গম করা যাবে। ১০ম দিন থেকে অনিরাপদ দিবস, তাই ১০ম দিন থেকে সঙ্গমে সংযম আনতে হবে। আবার যেহেতু ৩০ দিন হলো দীর্ঘতম মাসিক চক্র তাই ৩০-১০=২০,অর্থাৎ ২০তম
দিন আপনার জন্য শেষ অনিরাপদ দিবস। ২১ তম দিবস থেকে আপনি আবার অবাধ সঙ্গম
করতে পারবেন। এর অর্থ এই উদাহরনে শুধু ১০ম থেকে ২০তম দিবস পর্যন্ত আপনি অবাধ সঙ্গম করলে আপনার স্ত্রীর গর্ভধারন করার সম্ভাবনা আছে। তবে এই দিবস গুলোতে কনডম (Condom) ব্যবহার করে আপনারা অতি সহজেই ঝুকিমুক্ত থাকতে পারেন।
জেনে রাখা ভালো অনিয়মিতভাবে মাসিক হবার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কার্যকর নয়। তবে কারো যদি হিসাব রাখতে সমস্যা হয় তবে সহজ করার জন্য বলা যায় মাসিক শুরুর পর ১ম ৭ দিন এবং মাসিক শুরুর আগের ৭ দিন অবাধ সঙ্গম করা নিরাপদ।
প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রন ৮০% নিরাপদ, বা এর সাফল্যের হার শতকরা ৮০ ভাগ। সাধারনত হিসেবে গন্ডগোল করে ফেলা, অনিরাপদ দিবসেও সূযোগ নেয়া বা ঝুকি নেয়া, অনিয়মিত মাসিক হওয়া এসব কারনে এই পদ্ধতি ব্যর্থ হতে পারে। তাই সঠিক হিসেব জেনে নেবার জন্য ১ম বার চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিছু পুরুষের শুক্রানুর আয়ু বেশী হওয়ার কারনে তারা এটায় সফল নাও হতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে অনিরাপদ দিবস ২ দিন বাড়িয়ে নেবার প্রয়োজন হতে পারে। অনেকে এটা Programmed sex বলে একে ঝামেলাপুর্ণ মনে করেন, কিন্ত একবার এতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এটা বেশ সহজ, আরামদায়ক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন।
টিউবেকটমি বা টিউবাল লাইগেশন
টিউবাল লাইগেশন মহিলাদের স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রনের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মহিলাদের ডিম্বানুর গমন পথকে কেটে পৃথক করে দেয়া হয়। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বানু ফেলোপিয়ান টিউব (Fallopian tube) এর মাধ্যমে জরায়ুতে আসে, টিউবেকটমি বা টিউবাল লাইগেশন (Tubal ligation) অপারেশন দ্বারা এই টিউব কে বেধে এবং কেটে দিয়ে এই পথ কে বাধাগ্রস্ত করা হয়।
যে সকল দম্পতির নুন্যতম দুইটি
সম্পুর্ন সুস্থ বাচ্চা আছে এবং যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সম্মতি থাকে তখন
টিউবাল লাইগেশন অপারেশন টি করা হয়। সাধারনত বাচ্চা ডেলিভারির পর পর অথবা সিজারিয়ান সেকশন করে বাচ্চা ভুমিষ্ট করার সময় এই অপারেশন করা হয়। তবে এটা যেকোনো সময়ই করা যায়।তলপেটের মাঝবরাবর ইঞ্চি খানেক লম্বা অংশের চামড়া কেটে এই অপারেশন করা হয়। কাটা অংশ দিয়ে ফেলোপিয়ান টিউবটি বের করে তা কেটে এর দুই মাথা বেধে দেয়া হয়। যে কোনো প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত চিকিৎসকই এটি করতে পারে। পরবর্তীতে কোনো দম্পতি যদি মনে করে তাদের আরেকটি সন্তান নেবার প্রয়োজন আছে তাহলে মাইক্রোসার্জারি করে কাটা টিউবের দুই মাথা আবার জোড়া লাগিয়ে দেয়া যায়। এই দ্বিতীয় অপারেশনটি অতটা ফলপ্রসু হয়না, শুধুমাত্র এক তৃতীয়াংশ দম্পতির এই অপারেশনের মাধ্যমে পুনরায় সন্তান ধারন করার সম্ভাবনা থাকে
কনডম
কনডম
হলো ব্যরিয়ার পদ্ধতির জন্মবিরতি করন উপাদান। এর জনপ্রিয়তার কারন যেকোনো
সময় এটা ব্যবহার করা যায় এবং এটা সহজলভ্য। কনডমের সবচেয়ে বড় সুবিধা এই
যে এটা যৌনবাহিত যেকোনো রোগ থেকে সঙ্গম সময়ে নিরাপত্তা দেয়। এইডস,
সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্লামাইডিয়া, কন্ডাইলোমা সহ যে কোন যৌন রোগ কনডম
ব্যবহারের মাধ্যমে এড়ানো সম্ভব।
অনেক পুরুষ আছেন যাদের মিলনের পূর্বেই বীর্যপাত ঘটে (Premature ejaculation)
তারা অনেক সময় কনডম ব্যবহারে কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন, এছাড়া কিছু
মহিলা আছেন যাদের স্বামীর শুক্রানুর প্রতি এলার্জি থাকে, মাস ছয়েক কনডম
ব্যবহার করে এই এলার্জি নিয়ন্ত্রন করা যায়, লিঙ্গ প্রবেশের প্রাথমিক
পর্যায়ে খসখসে ভাব বা ব্যথা হলেও কনডম ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়।
কনডম
ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই ভিতরের বাতাস বের করে নিতে হবে অন্যথায় তা ফেটে
গিয়ে শুক্রানু যোনিপথে প্রবেশ করতে পারে।মিলন শেষে উত্থিত অবস্থায় লিঙ্গ
বের করে নিয়ে আসতে হবে না হলে অনেক সময় শুক্রানু ছড়িয়ে পরতে পারে।
কনডম
ব্যবহার শতকরা ১০০ভাগ জন্মনিয়ন্ত্রনের নিরাপত্তা দেয়না।এর সাফল্যেরহার
৯০% এর কাছাকাছি।নিয়ম মাফিক ব্যবহার না করলেই ব্যর্থতা দেখা দেয় তাই
অবশ্যই ব্যবহারের পূর্বে কনডম এর শীর্ষের বাতাস বের করে নিতে হবে। অনেক
দম্পত্তির কনডমে এলার্জি থাকতে পারে তাদের কনডম ব্যবহার না করাই ভালো।
দীর্ঘদিন কনডম ব্যবহার করলে অনেক সময় দম্পতিরা একধরনের মানসিক অতৃপ্তি এবং
অশান্তিতে ভোগেন। কনডম ব্যবহারের সাথে সাথে প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহার করে স্বামী-স্ত্রী অনেক আরাম দায়ক যৌন জীবন উপভোগ করতে পারেন।
আপনার গর্ভের সন্তানটি কবে আসছে পৃথিবীতে
গর্ভবতী প্রায় সব মায়েরই মনে এই প্রশ্ন জাগে কবে তার সন্তানটি পৃথিবীর আলো দেখবে, কবে তার কোল জুড়ে ফুটফুটে এক শিশু জগৎ আলো করে আসবে। নিম্ন লিখিত তালিকাটি থেকে আপনার গর্ভের সন্তানের জন্ম নেবার সম্ভাব্য দিনটি জেনে নিতে পারেন। তার জন্যই এই লেখাটি। এই তালিকাটি নিয়ে বসে পড়ুন আর দেখে নিন কবে আসতে পারে সেই অতি আকাংখিত দিনটি।
এজন্য আপনাকে শুধু একটি জিনিসই মনে রাখতে হবে তা হলো আপনার শেষ যেবার মাসিক / ঋতুস্রাব / মিনস্ট্রুয়েশন হয়েছিলো তা কোন তারিখে শুরু হয়ে ছিলো (LMP- 1st day of Last Menstrual Period)। অর্থাৎ শেষ যেবার ঋতুস্রাব হয়েছে তার প্রথম রক্তপাত হবার দিনটি। এবার তা মনে রেখে তালিকার সামনে বসুন। নীল রঙ এর তারিখ গুলো থেকে বেছে নিন আপনার মাসিকের শুরুর তারিখটি ঠিক তার নীচের লাল তারিখটিই আপনার সন্তান ভুমিষ্ঠ হবার সম্ভাব্য দিন।
সাধারণত LMP বা শেষ মাসিকের প্রথম দিবসটি থেকে ৯ মাস ৭ দিন পরে গর্ভের সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হবার কথা থাকে। তার উপর ভিত্তি করেই এই তালিকাটি প্রস্তত করা হয়েছে। তবে Ultrasonogram পরীক্ষার মাধ্যমও এই দিবসটি সম্পর্কে ধারনা নেয়া সম্ভব। তবে এটা ধরে নেয়া ঠিক হবেনা যে একদম ঐ দিবসটিতেই সন্তান কে ভূমিষ্ট হতে হবে, এর দুই সপ্তাহ আগে অথবা পরেও সন্তানটির ভূমিষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে যা স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়।
গর্ভাবস্থায় মায়ের জন্য কিছু উপদেশ
একজন
মহিলা যখন প্রখম বারের জন্য গর্ভধারন করেন তার কাছে অনেক কিছুই অজানা
থাকে, এই সামান্য কিছু অজানা তথ্যের জন্য অনেক ধরনের কুসংস্কার মায়ের উপর
চাপিয়ে দেয় অনেকেই। এজন্য গর্ভধারনের পরপরই একজন স্ত্রীরোগ চিকিৎসকের
স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত। এতে যে শুধু মা সুস্থ্য থাকবে তা নয়, গর্ভের
শিশুটির নিরাপত্তাও এর সাথে জড়িত। সাধারনভাবে এ সময়টাকে মা’কে অল্প কিছু নির্দেশ মেনে চলতে হয়, নিচে তেমন কিছু নির্দেশ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করা হলো।
১. খাদ্যঃ
মাকে এ সময় পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও অধিক আমিষ বা প্রোটিনযুক্ত খাবার খেতে
হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে খাদ্য তালিকায় শাক-সব্জি এমন পরিমানে যেনো রাখা হয়
যাতে ভিটামিন এর অভাব না হয়। একজন ৫০ কেজি ওজনের মায়ের জন্য আদর্শ
খাবারে নুন্যতম ২৫০০ কিলোক্যালরি শক্তির যোগান থাকতে হবে।
২. বিশ্রাম ও ঘুমঃ
একজন গর্ভবতী মাকে একটি সুস্থ্য সন্তান জন্ম দেবার জন্য কিছুটা বাড়তি
বিশ্রাম ও ঘুমানোর প্রয়োজন রয়েছে। দিনে ২ ঘন্টা ঘুম সহ দৈনিক নুন্যতম ১০
ঘন্টা ঘুমানো মায়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।
৩. কোষ্ঠঃ
লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন মা এর যেনো কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দেখা না দেয়, এতে গর্ভের
সন্তান্টির উপর চাপ পড়তে পারে, এজন্য নিয়মিত মলাশয় খালি করতে হবে। বেশী
বেশী শাক-সবজি খেলে এ সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
৪. স্তনঃ
এসময় স্তন সামান্য বড় হতে পারে, স্তনের বোটায় ও কিছু পরিবর্তন আসে,
স্তন সামান্য টনটন করাটাও স্বাভাবিক। এসব কারন মাথায় রেখে স্তনের বিশেষ
যত্ন নিতে হবে।
৫. যৌন মিলনঃ
গর্ভের প্রথম তিন মাসে যৌন মিলন না করাই উত্তম। গর্ভের শেষ ৬ সপ্তাহ ও যৌন
মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে এ নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আপনার
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বিশেষ ভাবে মিলন করা যেতে পারে।
৬. ভ্রমনঃ সম্ভব হলে গর্ভের প্রথম তিন মাস যে কোনো ধরনের লম্বা ভ্রমন এড়িয়ে চলা উচিত।
৭.টিকা :গর্ভের
শুরুতেই টিটেনাস এর টিকা নিয়ে নিতে হবে। এই টিকা নেয়ার কারনে সন্তানের
কোনো ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই বরং না নিলে প্রসবের সময় ঝুকির সম্ভাবনা
থেকে যায়।
৮.ধূমপান :
গর্ভাবস্থায় কোনো অবস্থাতেই মায়ের ধুমপান করা চলবেনা, এমন অভ্যাস থেকে
থাকলে সন্তানের ভালোর জন্য ঐ মুহুর্তে তা ত্যাগ করতেই হবে। গর্ভবতী মায়ের
সামনে অন্যকেউ ধুমপান করলে তাও শিশুটির ক্ষতির কারন হয়ে দাড়াতে পারে।
যেসব মায়ের মদ্যপানের অভ্যাস আছে তাদের এসময়ে এ অভ্যাসটি থেকেও দূরে
থাকতে হবে। গর্ভাবস্থায় নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন শিশুর স্থায়ী ক্ষতির
কারন হতে পারে।
৯গোসল ও পোশাকঃ দৈনিক গোসল করার অভ্যাস করতে হবে। ঢিলে ঢালা আরাম দায়ক পোশাক পরিধান করার জন্য সব চিকিৎসকই মা’দের উপদেশ দিয়ে থাকেন।
১০.বিবিধ :পায়ে
পানি আসা, উচ্চ রক্তচাপ, প্রসাব কমে যাওয়া, পেটের উপর দিকে ব্যথা , মাথা
ঘুরানো বা মাথা ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই সাথে সাথে আপনার
চিকিৎসক কে জানাবেন।গর্ভপাত করানোর স্বাস্থ্যগত কারন
গর্ভাশয়ের
ভ্রুনটি ডিম্বানু নিষেকের পর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসের (২০ সপ্তাহ) মধ্যে
যে কোন সময়ে প্রসবের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে যাবার নামই গর্ভপাত বা Abortion।
বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ গর্ভপাতই হয় ইচ্ছাকৃত ভাবে ভ্রুন নষ্ট করার
কারনে। পাঁচ মাস (২০ সপ্তাহ) বয়সের পর শিশুর সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনই শেষ
হয়ে যায়, তাই এসময়ে ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত ঘটানোকে শিশু হত্যা বলাই শ্রেয়তর।
তবে এর ব্যতিক্রমও আছে, অনেক সময় মায়ের সন্তানটি ধারন করার ইচ্ছা থাকলেও নিজে নিজে গর্ভপাত (Miscarriage) হয়ে যেতে পারে আবার মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষা বা শিশুটিকে চরম দুর্ভাগ্যের (চরম প্রতিবন্ধি) হাত থেকে বাঁচাতেও বৈধভাবে গর্ভপাত (Therapeutic abortion) করানো যেতে পারে। এখানে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যগত বা চিকিৎসা সংক্রান্ত কারনে গর্ভপাত করার বৈধ দিক গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১। গর্ভাবস্থা চালিয়ে গেলে যদি মায়ের মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে অথবা তার অপুরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
২।
ভবিষ্যতে জন্মনেয়া সন্তানটি যদি খুব খারাপ ধরনের শারীরিক বা মানসিক
প্রতিবন্ধি হয়ে জন্মানোর নিশ্চিত সম্ভাবনার কথা জানা যায়। যেমন:
· মায়ের আলট্রাসনোগ্রাম বা এম্নিওসেন্টেসিস (Amniocentesis) করে জানা গেলো শিশুটি চরম বিকলাঙ্গ।
· গর্ভের প্রথম তিন মাসে মা জার্মান মিসল, গুটি বসন্ত, টক্সপ্লাজমোসিস জাতীয় রোগে ভুগে থাকেন।
· বাবা অথবা মা এর কেউ যদি মানসিক প্রতিবন্ধি হন।
· মা যদি গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে রেডিওথেরাপীর মতো চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।
· মায়ের কোন রোগের চিকিৎসার কারনে যদি উনি শিশুটির ক্ষতির কারন হয় এমন কোন অসুধ খেয়ে থাকেন, ইত্যাদি।
৪। গর্ভের সন্তানটি যদি ধর্ষণের ফসল হিসেবে জন্ম নেয়।
৫। যদি জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতির ব্যর্থতার কারনে গর্ভধারন হয় এবং তা চালিয়ে গেলে মায়ের মানসিক বা শারীরিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা থাকে।
থেরাপিউটিক এবরশন করাতে হলে স্ত্রীর সাথে সাথে স্বামীরও লিখিত সম্মতি নেবার প্রয়োজন হয়। এটা অবশ্যই হাসপাতালে করানো উচিত। মায়ের
কোনো রোগ এর কারনে যদি এটা করাতে হয় তাহলে অবশ্যই সেই বিষয়ে কমপক্ষে দুই
জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের লিখিত অনুমতির প্রয়োজন আছে। যদি এমন অবস্থা দেখা
দেয় যে তৎক্ষনাত গর্ভপাত না করালে মায়ের মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে তাহলে
অবশ্য সার্জন অন্য কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীতই এমনটি করতে পারেন।
চিকিৎসা-শাস্ত্রের মূলমন্ত্রে আছে যে ভ্রুণের প্রথম দিন থেকেই তাকে একটি
মূল্যবান প্রাণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।তাই থেরাপিউটিক এবরশনের বাচ্চাটি
যদি সুস্থ্য থাকে এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই সেই
চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত।
এমনিওটিক ফ্লুইড
মাতৃগর্ভে
শিশুটি যে তরলটির ভেতর ভাসমান অবস্থায় থাকে তার নামই এমনিওটিক ফ্লুইড।
এটা স্বচ্ছ একটি তরল যার সবটুকু জুড়েই আছে পানি, এছাড়া এতে রয়েছে
প্রোটিন, গ্লুকোজ, ইউরিয়া, ইউরিক এসিক, বিভিন্ন হরমোন, আলফা ফেটো প্রোটিন
ইত্যাদি।
এমনিওটিক ফ্লুইড মায়ের গর্ভের ফুল (Placenta) থেকেই
নিসৃত হয়। সাধারনত গর্ভে ৪০০ থেকে ১৫০০ মিলি এমনিওটিক ফ্লুইড থেকে থাকে।
গর্ভের প্রথম ১০ সপ্তাহে ৩০ মিলি, ২০ সপ্তাহে ৩০০ মিলি এবং ৩০ সপ্তাহে ৬০০
মিলি এমনিওটিক ফ্লুইড থাকা স্বাভাবিক। গর্ভের ৩৮ সপ্তাহ পর্যন্ত এটা বাড়তে
থাকে এবং এর পরে কমতে থাকে। এমনিওটিক ফ্লুইড এর পরিমান কম বা বেশি হলে
শিশুটির সমস্যা হতে পারে।
এর
ফলে শিশুটি হঠাৎ কোনো ধাক্কার আঘাত থেকে রেহাই পায়। এছাড়াও এই তরলটির
কারনে শিশুর নড়াচড়া করা সহজ হয়, নির্দিষ্ট ও আরামদায়ক তাপমাত্রায়
শিশুটি থাকতে পারে। শিশুটি গর্ভে থাকাকালীন এই তরলটি পান করে থাকে আবার
এতেই সে মুত্রত্যাগ করে এবং মলত্যাগ করে। এর ফলে তরলটি পরীক্ষা করলে তার
বিপাকের অনেক কিছুর প্রমান বা স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
এমনিওসেন্টেসিস (Amniocentesis) প্রক্রিয়ার
মাধ্যমে এই তরল মাতৃগর্ভ থেকে সংগ্রহ করা যায় এবং বিভিন্ন পরীক্ষা করে
গর্ভের শিশুটি কেমন আছে তা জানা যায়। এর মাধ্যমে ক্রোমোজোম স্টাডি করে বা
কেমিক্যাল পরীক্ষা বা টিস্যু কালচার করে গর্ভের শিশুটির প্রতিবন্ধি
হবার সম্ভাবনা আছে কিনা তা জানা যায়।
কপার টি
অনেক দম্পত্তির কাছেই রোজ রোজ বড়ি খাওয়া বা কনডম ব্যবহার করা একটা বিরক্তিকর কাজ বলে মনে হয়; আই,ইউ,সি,ডি (কপার টি) তাদের জন্যই ঝামেলাহীন কার্যকরী কম খরচের এক জন্মনিয়ন্ত্রন পদ্ধতি। একবার আই,ইউ,সি,ডি ব্যবহার করলে ১ বছর থেকে ৭/৮ বছর পর্যন্ত অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার না করেও জন্মনিয়ন্ত্রন কার্যকর রাখা যায়।
আই,ইউ,সি,ডি ইংরেজি অক্ষর T এর মতো দেখতে একটি Device যা মহিলাদের জরায়ুতে যোনিপথ দিয়ে প্রবেশ করানো হয়। বর্তমানে তিন ধরনের আই,ইউ,সি,ডি সহজলভ্য, লিপিস লুপ-কপার টি ও হরমোন নিসৃত করা আই,ইউ,সি,ডি। এর মধ্যে হরমোন নিসৃতকারিটি মাত্র ১ বছর কার্যকর থাকে, অন্য গুলো ৭-৮ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।
আই,ইউ,সি,ডি ব্যবহারের পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়, স্বামী-স্ত্রী দুজন সম্মত থাকলেই কেবল এটা ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। জন্মনিয়ন্ত্রন বিষয়ের মহিলা চিকিৎসক কর্মকর্তাগন আই,ইউ,সি,ডি পরিয়ে থাকেন। মাসিক শেষ হবার পরপরই এটা পরিয়ে দেবার উৎকৃষ্ট সময়, এছাড়া সন্তান হবার পরপর ও এটা পরানো যায়। কোনো মহিলার জরায়ুতে বা ডিম্বাশয়ে ইনফেকশন থাকলে কোনো অবস্থাতেই আই,ইউ,সি,ডি পরানো যায়না।
আই,ইউ,সি,ডি ব্যবহারের পর অনেক সময় মাসিক এর সময় বেশী রক্তপাত হতে পারে এবং তলপেটে ব্যথা করতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে আবার আই,ইউ,সি,ডি নিজে নিজেই বের হয়ে পরে যেতে পারে। এছাড়া একটোপিক প্রেগনেন্সি জাতীয় সমস্যাও আই,ইউ,সি,ডি ব্যবহারে বেশী দেখা যায়।
ব্যবহার করা অবস্থায় সন্তান নেবার ইচ্ছা হলে আই,ইউ,সি,ডি বের করে নেয়া যায় এবং নির্দিষ্ট বিরতির পর সন্তান নেয়া যায়। জন্মনিয়ন্ত্রনে আই,ইউ,সি,ডি এর সাফল্যের হার খুবই বেশী (৯৭%), যতটুকু ব্যর্থতা তা আই,ইউ,সি,ডি নিজে নিজে বের হয়ে যাবার কারনে হয়, তাই এ ব্যপারে সাবধান থাকতে হবে। কম দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন দম্পত্তির জন্য এটা খুবই কার্যকর পদ্ধতি। যাদের বড়ি খাওয়ায় সমস্যা হয় এবং অন্য পদ্ধতি আরামদায়ক মনে হয়না তারা সহজেই এটা ব্যবহারের কথা ভেবে দেখতে পারেন।
ভ্যাসেকটমি
ভ্যাসেকটমি স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রনের একটি পদ্ধতি। পুরুষের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। অন্ডকোষে যে দুইটি শুক্রাশয় (Testes) থাকে তা থেকে ভাস (Vas difference) নামক দুটি পৃথক নালী দিয়ে শুক্রানু বা বীর্য পুরুষাঙ্গের শীর্ষে পৌছায়। ভ্যাসেকটমি অপারশনের মাধ্যমে অন্ডকোষের নীচের দিকে খুবই ছোট্ট একটি অংশের চামড়া কেটে ঐ ভাস দুটিকে বেধে কেটে দেয়া হয়।
এর ফলে বীর্যপাতের সময় বীর্য রস (Semen) আসলেও তাতে কোনো শুক্রানূ (Sperm) থাকেনা ফলে যৌন মিলন ঘটলেও স্ত্রীর গর্ভধারন করার সম্ভাবনা থাকেনা। এটা খুবই ছোট্ট একটা অপারেশন, এর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হবার ও প্রয়োজন হয়না।অপারশনের পরপরই এটা কার্যকর হয়না, প্রথম ৩০-৪০ বার মিলনে কন্ডম বা অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়, এরপর আর অন্য কোনো পদ্ধতির সাহায্য নেবার প্রয়োজন পড়ে না। এটা জন্মনিয়ন্ত্রনের ১০০% নিশ্চিত একটি পদ্ধতি। ভ্যাসেকটমি করার পর সন্তান নেবার ইচ্ছা হলে আবার অপারেশন করে কেটে দেয়া ভাস দুটি জোড়া লাগিয়ে দেয়া যায় এবং সন্তান ধারন করা সম্ভব হয়। যদিও এই দ্বিতীয় অপারেশনটির সফলতার হার কম।
ভ্যাসেকটমি করার আগে অবশ্যই দম্পতির নুন্যতম দুটি সুস্থ সন্তান থাকতে হবে, এতে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই সম্মতি থাকতে হবে। কিছু
কিছু পুরুষ ভ্যাসেকটমি করার পর মানসিক ভাবে দুর্বল হয় পরতে পারে এবং তার
যৌনইচ্ছা কমে যেতে পারে তবে তা চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিরাময় করা
সম্ভব। কারো কারো ক্ষেত্রে অন্ডকোষে স্পার্ম গ্রানুলোমা (Sperm granuloma) নামক একটি সমস্যা হতে দেখা যায় যদিও তা তেমন জটিল কোনো সমস্যা নয়। ভ্যাসেকটমি স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রনের খুবই কার্যকর এবং কমদামী একটি পদ্ধতি, জনমনে এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনে একে একটি বিশাল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার অবারিত সুযোগ রয়েছে।
পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার (Cancer of the Penis)
পুরুষাঙ্গের
ক্যান্সার খুব একটা পরিচিত রোগ নয় এবং আমাদের চারপাশে এমন রোগীর সংখ্যাও
খুব কম। তবে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত শতকরা চল্লিশ ভাগ রোগীর বয়সই যেহেতু
চল্লিশ বছরের নীচে তাই এর সম্পর্কে জেনে নেয়াটা সকল পুরুষের জন্যই জরুরী
বলে মনে করা হয়।
অনেক সময়ই রোগী বুঝতে পারেনা যে তার পুরুষাঙ্গের শীর্ষে (গ্লান্স পেনিস-Glans penis) যে
ঘা টি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা একটি ক্যান্সার। এর একটা কারন এই যে এই
ক্যান্সারের অধিকাংশ রোগীরই মুসলমানি বা খতনা করানো থাকেনা, তাছাড়া
ঘা টিতেও কোনো ব্যথা বেদনা থাকেনা। গ্লান্স পেনিসেই শুধু ক্যান্সার হয়ে
থাকে আর এমন একটি ঘা অনেক সময়ই গ্লান্স পেনিসে শুধু সাদা একটি দাগ হিসেবে
শুরু হয়, অবশ্য
কারো কারো ক্ষেত্রে এটা একটা উচু গোটার মতোও শুরু হতে পারে। রোগীর কোনো
ব্যথা না থাকলেও এজন্য সে কিছুটা অস্বস্তিকর অনুভুতির শিকার হতে পারে, কারো কারো এই ক্ষত থেকে সামান্য ডিসচার্জ বা রস ও বের হতে পারে। তাই বেশীর ভাগ রোগীরাই এই ক্ষত’র প্রতি উদাসীন থাকে এবং এই সুযোগে ক্যান্সার টি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
কোনো কোনো সময় ক্যান্সারের এই ঘাটিতে ব্যাক্টেরিয়া আক্রমন করে থাকে, বিশেষ
করে ঐ সময়টাতেই রোগীরা একে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। দেরী হয়ে গেলে এই রোগ
বেশ ছড়িয়ে যায় এবং গ্লান্স পেনিস ফুলকপির মতো ফুলে উঠতে পারে, তা থেকে রক্তপাত ও হতে পারে, এ
সময় কুচকিতেও সুপারির মতো শক্ত গোটা উঠতেও দেখা যায়। এই ক্যান্সার
বৃদ্ধি পেতে পেতে যখন উরুর বা পেটের ভেতরের রক্তনালীকে সংক্রমিত করে ফেলে
তখন অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাতের ফলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
আগেই
বলেছি এই ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে প্রায় কারোরই খাতনা করা থাকেনা তাই
ক্যান্সারের ঘাটি দেখতে হলে শুরুতেই লিঙ্গের সমুখের বাড়তি চামড়া বা prepuceal skin কেটে
নিতে হয়। এর পর ঘা থেকে বায়োপসি নিয়ে নিশ্চিত হতে হয় যে ক্যান্সার
হয়েছে। একবার নিশ্চিত হওয়া গেলে সাথে সাথে এর চিকিৎসা শুরু করতে হয়।
চিকিৎসার শুরুতেই রোগীকে খাতনা করিয়ে নিতে হয় এবং তার পর রেডিওথেরাপী
দিতে হয়। শতকরা ৬০-৭০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই এই ক্যান্সার এতে সাড়া দেয়।
রেডিওথেরাপী কাজ না করলে এবং শুধু গ্লান্স পেনিসে যদি এই ক্যান্সার টি বড়
আকারে থেকে থাকে তাহলে পুরুষাঙ্গের মাথাটি কেটে ফেলতে হয়, তবে ক্যান্সার আরো ছড়িয়ে পরলে গোড়া থেকেই পুরুষাঙ্গটি কেটে ফেলে (Amputation of penis) দিতে হতে পারে।
এই
প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা ভালো যে শৈশবের শুরুতে যাদের মুসলমানী বা
খাতনা করা হয় তাদের এই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা একবারে নেই বললেই চলে, তবে আরেকটু বড় হয়েও যারা খাতনা করায় তাদের মধ্যও এই ক্যান্সার হবার প্রবনতা বেশ কম।
হাইড্রোসিল (Hydrocele)
হাইড্রোসিল
রোগটিকে প্রচলিত বাংলায় অনেক সময় একশিরা রোগ বলা হয়। একশিরা শব্দটি শুনে
নিশ্চয়ই এতক্ষনে সবাই বুঝে গেছেন এখানে কোন রোগটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
অন্ডকোষের ভেতরে অবস্থিত শুক্রাশয়টি (Testis) ফুলে যদি অনেক বড় হয়ে যায় বা এক সের ওজনের হয় তাহলেই তো তাকে একশিরা বলে নাকি? চলুন তাহলে জেনে নেই হাইড্রোসিল কেমন রোগ।
অন্ডথলির ভেতরে শুক্রাশয়টি প্রায় ৩-৪ টি পাতলা পর্দা বা আবরনী দ্বারা ঘেরা থাকে, এমন দুটি আবরনীর ভেতরে যখন স্বচ্ছ কিছু তরল জমা হয় তখনই তাকে হাইড্রোসিল বলা হয়। হাইড্রো মানে যে পানি এতো আমরা সবাই জানি, হাইড্রোসিলের ভেতরের তরলটি কিন্ত পানির মতো অত স্বচ্ছ নয়, কিছুটা
এম্বার রঙ এর। নানা বিধ কারনে ঐ সকল পর্দার ভেতরে তরল জমতে পারে এর ফলাফল
কিন্ত একটাই বিশাল আকৃতির একটি অন্ডকোষ নিয়ে রোগী বেশ অস্বস্তিতে পরেন, অন্ডকোষের আকার দিনে দিনে বাড়তেই থাকে, রোগীর পক্ষে এক সময় ট্রাউজার বা ফুলপ্যান্ট পরা সম্ভব হয়না, স্বাভাবিক কাজ কর্ম ব্যহত হয় এবং এক সময় যৌন মিলনও অসম্ভব হয়ে উঠে।
অনেক সময়ই হাইড্রোসিল এর সাথে হার্নিয়াও থেকে থাকে, হাইড্রোসিল সাধারনত একদিকে হয় তবে এটা দুই দিকেও হতে পারে। শুক্রাশয়ের প্রদাহের কারনে অনেক সময় হাইড্রোসিল হতে দেখা যায়, কখনো কখনো শুক্রাশয়ে টিউমার হলেও হাইড্রোসিল হতে পারে, কখনো আবার এক প্রকার ক্রিমির (Wucheria bancrofti) আক্রমনেও
এমনটি হতে দেখা যায়। এজন্য চিকিৎসকগন চিকিতৎসার প্রারম্ভেই রোগের কারন
নির্নয়ের জন্য কিছু পরীক্ষা করিয়ে নেন। অন্ডকোষের আল্ট্রাসনোগ্রাম এমনই
একটি পরীক্ষা।
বেশীর
ভাগ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র অপারেশনের মাধ্যমেই হাইড্রোসিল ভালো হয়ে যায়।
অনেকে আবার ইঞ্জেকশন এর মাধ্যমে স্ক্লেরোজেন্ট দিয়ে এর চিকিৎসা করার
পক্ষপাতি যদিও এটা খুবই বেদনা দায়ক। হাইড্রোসিল এর অপারেশন তেমন জটিল কোনো
সার্জারি নয়, তবুও একজন অভিজ্ঞ সার্জন দ্বারাই এই অপারেশন করানো উচিত, হাইড্রোসিল
এর সাথে হার্নিয়া থাকলে একই সাথে দুটো অপারেশন সম্পন্ন করা হয়। একদম সফল
অপারেশনের পরও পুনরায় হাইড্রোসিল হবার কিছু সুযোগ কিন্ত থেকেই যায়, তাই এই সকল চিন্তা মাথায় রেখেই চিকিৎসা করানো উচিত।
প্রিয়াপিজম (Priapism)
এটা
লিঙ্গোত্থান সম্পর্কিত একটি অস্বাভাবিক ঘটনা। কিছু কিছু পুরুষের ক্ষেত্রে
কখনো কখনো এমন হয়ে থাকে যে একবার লিংগোত্থানের পর তা আর স্বাভাবিক অবস্থায়
ফিরে আসেনা। চরম অস্বস্তিকর এবং বেদনাদায়ক এই পরিস্থিতির নামই প্রিয়াপিজম।
সাধারনত যেসকল রোগীর রক্ত কনিকায় সমস্যা (সিকল সেল এনিমিয়া বা লিউকেমিয়া)
থাকে অথবা পুরুষাঙ্গে বা পেলভিক এলাকায় ক্যান্সার থাকে কিংবা স্পাইনাল কর্ড
এ অসুখ থাকে তাদের ক্ষেত্রে এমনটি হতে দেখা যায়।
তবে অনেক সময় চিকিৎসা গত কারনে প্যাপাভ্যারিন জাতীয় ইঞ্জেকশন নেবার কারনে
আবার কোন কোন ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ধরে যৌন মিলন ঘটানোর কারনেও
এমন হতে পারে।
এই
রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীকে সবসময় একজন বিশেষজ্ঞ ইউরোলজিস্টের স্মরনাপন্ন
হওয়া উচিত। সাধারনত রোগীরা উত্থিত লিঙ্গে প্রচন্ড ব্যথা হলেই কেবল
চিকিৎসকের কাছে যেতে চান কিন্ত প্রাথমিক পর্যায়েই এ ব্যাপারে সতর্কতা
অবলম্বন করা শ্রেয়।
চিকিৎসা
শুরুর প্রথমেই খুজে দেখা হয় এমনটি ঘটার পিছনে মূল কারন কোনটি এবং সেটির
উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। অনেক সময় পুরুষ দন্ডের ভেতরকার জমে
থাকা রক্ত সিরিঞ্জ দিয়ে বের করে আনলে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, কখনো
কখনো মেটারামিনল বা এড্রেনালিন জাতীয় ইঞ্জেকশন দেবার মাধ্যমেও এটি ভালো
হতে দেখা যায়। এসব চিকিৎসার পরও যদি উত্থিত লিঙ্গ স্বাভাবিক অবস্থায় না আসে
তা হলে সার্জারি করে তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। তবে সার্জারির
পর পুর্বের স্বাভাবিক মাত্রায় লিঙ্গ উত্থান করা অনেক সময় সম্ভব নাও হতে
পারে।
হাইপোস্পেডিয়াস (Hypospedias)
এটা
পুরুষাঙ্গের জন্মগত একটি ত্রুটি - আরো ভালো করে বললে বলতে হয় এটা
পুরুষাঙ্গের মুত্রনালীর জম্মগত একটি ত্রুটি। এই ধরনের ত্রুটি থাকলে
মুত্রনালী পুরুষাঙ্গের শীর্ষদেশ (Glans penis)
এ উন্মুক্ত না হয়ে নীচের দিকে উন্মুক্ত হয়, তাই মুত্রত্যাগ বা প্রসাব
করার সময় তা লিঙ্গের শীর্ষদেশ দিয়ে বের না হয়ে লিঙ্গদন্ডের তলদেশ দিয়ে
বের হয়। শিশুর জন্মের পরপরই বাবা-মা এই রোগটি চিহ্নিত করতে পারেন।
প্রতি
৩৫০ জন শিশুর মধ্যে একজন এই হাইপোস্পেডিয়াস নিয়ে জন্মগ্রহন করে, তাই এই
রোগটি একদম অপরিচিত কোনো রোগ নয়। তবে অজ্ঞতার কারণে অনেক অভিভাবক এই রোগ
নিয়ে কারো সাথে আলাপ করতে চান না। অনেক সময় শিশুর লিঙ্গের তলদেশের ফুটোটি
ছোটো হবার কারনে তার প্রসাব করতে কষ্ট হয় এবং এই পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু
না করলে তার কিডনী নষ্ট হয়ে যাবার ও সম্ভাবনা থাকে।
মুত্র
বের হবার ফুটোটি লিঙ্গের তলদেশের বিভিন্ন স্থানে থাকতে পারে তবে তা যদি
অন্ডথলির কাছাকাছি থেকে থাকে তাহলে শিশুর লিঙ্গটি বাকা হয়ে যেতে থাকে যাকে
কর্ডি (Chordee)
বলা হয়। কর্ডি হলে পরিনত বয়সে তা যৌন মিলনে বাধা সৃষ্টি করে এবং মানুষটি
হীনমন্যতায় ভূগতে থাকে। তাছাড়াও হাইপোস্পেডিয়াস থাকলে যৌনমিলনের
বীর্যপাত যোনির বাহিরে হয় বলে সন্তান ধারণ করাও অসম্ভব হয়ে উঠে।
শৈশবেই
এই রোগের চিকিৎসা করানো উচিত এবং অপারেশনই এই রোগের একমাত্র চিকিৎসা।
কেবলমাত্র একজন বিশেষজ্ঞ শিশু ইউরোলজিস্ট দ্বারাই এর অপারেশন করানো উচিত।
এই অপারেশনে মুসলমানি বা খতনা করে লিঙ্গের সম্মুখের যে বাড়তি চামড়া-টুকু (Prepuceal skin)
ফেলে দেয়া হয় তাকে কাজে লাগিয়ে লিঙ্গ এবং মুত্রনালীকে ত্রুটিমুক্ত করা
হয়। তাই কোনো কারণে আগেই শিশুকে খতনা করিয়ে ফেললে এই ত্রুটি আর অপারেশন
করেও সারানো যায়না। হাইপোস্পেডিয়াস যুক্ত শিশুর অভিভাবককে এজন্য একথা
মাথায় রাখতে হবে এবং শিশু সার্জন না দেখিয়ে খতনা করানো ঠিক হবেনা।
ফাইমোসিস (Phimosis)
পুরুষাঙ্গের সম্মুখে ঝুলতে থাকা বাড়তি চামড়াটুকু (Prepuceal skin) অনেক সময় লিঙ্গের শীর্ষদেশের (Glans penis) সাথে আটকে গিয়ে যে সমস্যা করে তার নামই ফাইমোসিস। বিশেষ করে ছোট্ট ছেলেদের বাবা-মা অনেক সময়ই এই নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ভোগেন।
প্রচলিত ভাষায় একে বলা হয় লিঙ্গ না ফোটা। মনে রাখতে হবে শিশুর ৬ বছর বয়স
পর্যন্ত পুরুষাঙ্গ প্রাপ্ত বয়স্কদের মতো নাও ফূটে উঠতে পারে তাই এ নিয়ে
বাড়তি দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই
তবে প্রসাব করার সময় যদি ঐ বাড়তি চামড়া সহ লিঙ্গের শীর্ষ ফুলে উঠে বা চামড়া
ফেটে যাবার উপক্রম হয় কিংবা শিশুর মূত্রত্যাগ এ কষ্ট হয় তবে ধরে নিতে হবে
সেটা স্বাভাবিক নয়। বড়দের ও ফাইমোসিস হয়ে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা
ব্যালানাইটিস (Balanitis) রোগের
কারনে হয়ে থাকে। বড়দের এমনটি হলে লিঙ্গ নিয়মিত পরিস্কার করা সম্ভব হয়না
এবং তা থেকে অনেক সময় পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। ছোটো অথবা
বড় যারই ফাইমোসিস হোকনা কেনো এর একমাত্র চিকিৎসা হলো পুরুষাঙ্গের বাড়তি
চামড়া টুকু ফেলে দেয়া বা খাতনা করে নেয়া।
কর্ডি (Chordee)
অনেক
পুরুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষাঙ্গটি উত্থানের পর তা নীচের দিকে
অস্বাভাবিক বাঁকা হয়ে থাকে, এই রোগটির নামই কর্ডি। কর্ডি হলে রোগী মানসিক
অস্বস্তিতে ভোগেন এবং এক ধরনের হীনমন্যতার শিকার হন। উত্থিত লিঙ্গ
নিম্নমুখী হয়ে তীর্যক হয়ে থাকার কারনে অনেক সময়ই এই ধরনের রোগীর সফল
স্ত্রী মিলন সম্ভব হয়না এবং সম্ভব হলেও তা পুরুষাঙ্গে বেদনার সৃষ্টি করে।
সাধারনত হাইপোস্পেডিয়াস রোগ থাকলে এবং কখনো কখনো ক্রনিক ইউরেথ্রাইটিস রোগটির কারনেও কর্ডি হতে পারে।
মানসিক
হীনমন্যতার কারণে অনেক রোগীই চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হতে চান না। কিন্ত
কর্ডি রোগের সফল চিকিৎসা আছে। অপারেশনের মাধ্যমে কর্ডি ভালো করা সম্ভব।
কারো এই ধরনের সমস্যা থাকলে তার ইউরোলজিস্ট বা ইউরোলজিকার সার্জন এর
স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত।পেরোনিস ডিজিজ (Peyronie’s Disease)
অনেক পুরুষেরই উত্থিত লিঙ্গ কিছুটা বাঁকা হয়ে থাকে, এই উত্থিত লিঙ্গ বাঁকা হয়ে
থাকার প্রধান একটি কারন হলো পেরোনিস ডিজিজ বা পেরোনিস রোগ। এ রোগ হলে
পুরুষের লিঙ্গের গায়ে যে কোনো এক পাশে শক্ত দানার মতো কিছু জিনিস হয় যাতে ক্যালসিয়াম জমে অনেক সময় সেই দানা গুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে যেতে পারে। এক্স-রে করলে পুরুষাঙ্গের ঐ দানা গুলো এক্সরে ফিল্ম এ ধরা পরে। লিঙ্গের যে দিকে এই দানা গুলো হয় উত্থিত লিঙ্গটি ঐ দিকেই বাঁকা হয়ে থাকে।
পেরোনিস রোগের সঠিক কারন সম্পর্কে কেউই অতটা নিশ্চিত নন তবে ধারনা করা হয় জীবনের কোনো সময় পুরুষাঙ্গে আঘাত পাবার কারনে এই রোগ হয়ে থাকে।
পেরোনিস রোগের চিকিৎসা বেশ জটিল। এক বার এই রোগ হলে তা ক্রমাগত বাড়তে থাকে তবে কারো কারো ক্ষেত্রে রোগ হবার ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে নিজে নিজেই তা ভালো হয়ে যায়। যাদের এমন ভালো হয়ে যায়না তারা সত্যিই বেশ ঝামেলায় পড়েন কারন নানাবিধ অসুধের সুনাম জানা থাকলেও কোনোটির কার্যকারীতাই এই পর্যন্ত তেমন ভাবে প্রতিষ্ঠার খোজ পায়নি। এজন্য পেরোনিজ রোগ নিয়ে কেউ যৌন মিলনে বাধাগ্রস্থ হন বা মানসিক অশান্তিতে ভোগেন তার উচিত অপারেশন করিয়ে নেয়া। ইউরোলজিস্ট সার্জন দ্বারা এই সার্জারি (Nesbitt’s operation) করালে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এপিডিডাইমো অর্কাইটিস (Epididymo-orchitis)
অন্ডথলির অভ্যন্তরস্থ শুক্রাশয় ও শুক্রানু নির্গমনের নালীর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কে এপিডিডাইমো অর্কাইটিস (Epididymo-orchitis) বলা হয়। সাধারনত মুত্রের ইনফেকশন থাকলে (যা প্রস্টেট, ইউরেথ্রা, সেমিনাল
ভেসিকাল সহ বিভিন্ন অঙ্গানুর ইনফেকশনের কারনে হতে পারে।) তা থেকে এই রোগটি
হয়ে থাকে। এছাড়া রোগী ইউরিনারি ক্যাথেটার পরে থাকলেও এমনটি হয়।
টিবি (Tuberculosis) রোগ কিংবা মাম্পস (Mumps) রোগের
জটিলতার কারনেও এই রোগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই
ক্লামাইডিয়া নামক জীবানু এই রোগের প্রধান কারন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তবে স্ট্রেপ্টোকক্কাস, স্টেফাইলোকক্কাস, ইশকেরেসিয়া বা প্রোটিয়াস নামক ব্যাকটেরিয়া গুলোর কারনেও এই রোগ হতে দেখা যায়।
এপিডিডাইমো অর্কাইটিস হলে রোগীর জ্বর হয়, সেই সাথে কুঁচকি, অন্ডকোষ
এবং অন্ডথলিতে ব্যথা এবং ভারী ভারী লাগার মতো অনুভুতিও হতে পারে। এই রোগে
অন্ডথলির ত্বক লালচে হয়ে পুরু বা ভারী হয়ে যায় এবং তাতে চকচকে ভাব চলে আসে।
এভাবে চলতে থাকলে এক সময় তাতে পুঁজ হতে দেখা যায়। এক সময় অন্ডকোষে তীব্র
ব্যথা এবং সেই সাথে তীব্র জ্বর হয় এবং এই রোগে বিপর্যস্ত হয়ে রোগী
হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়।
এই রোগ হলে প্রচুর পানি খেতে হয় এবং অন্ডথলিকে নির্ভার রাখতে (support) তাতে এক ধরনের স্লিং (sling) পরিয়ে
দেয়া হয়। শিরায় এন্টিবায়োটিক সেবন করা হলো এই রোগ এর একমাত্র চিকিৎসা।
সাধারনত রোগের শুরুতেই উচ্চ মাত্রার এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়, তবে
কালচার এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট জীবানু পাওয়া গেলে শুধু সেই অনুযায়ী
অসুধ দেয়া হয়। এক্ষেত্রে লক্ষনীয় যে এন্টিবায়োটিক একটু বেশী সময় ধরে (২
সপ্তাহ) ব্যবহার করা হয়, তাই
রোগীকে এ নিয়ে অধৈর্য্য হলে হবেনা। মনে রাখতে হবে এই রোগ ভালো হয়ে যায় তবে
গাফিলতি বা অবহেলা করলে এ থেকে অনেক সময় রোগীর শুক্রাশয় নষ্ট হয়ে যাবার
সম্ভাবনাও থাকে।
ভেরিকোসিল (Varicocele)
আমাদের প্রায় সবার মনেই এমন একটা ধারনা কাজ করে যে অন্ডথলিতে একটা কিছু ফুলে উঠাটাই বোধহয় হার্নিয়া, আর হার্নিয়া যদি নাই হয় তবে তো সেটা হাইড্রোসিল হবেই। আসলে এ দুটোর বাইরে অন্য রোগেও অন্ডথলি ফুলে উঠতে পারে, তেমনই একটা রোগ হলো ভেরিকোসিল (Varicocele)।
অন্ডকোষ থেকে যে সকল শিরার মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ অপেক্ষাকৃত বড় শিরায় ধাবিত
হয় সেই শিরাগুলো বড় হয়ে মোটা হয়ে গিয়েই অন্ডথলিকে ফুলিয়ে তোলে এবং এর নামই
ভেরিকোসিল। এ রোগ হলে রোগীর তেমন কোনো শারীরিক সমস্যা থাকেনা, তবে সবসময় ঐ পাশের অন্ডথলিকে ভারী ভারী লাগে। আন্ডার অয়ার (Underwear) পরা
না থাকলে এই অস্বস্তি আরো বাড়তে থাকে। ভেরিকোসিল হওয়া দিকে অন্ডথলিটি একটু
বেশী ঝুলে থাকে এবং অস্বাভাবিক দেখায় দেখে অনেকে এই কারনেও চিকিৎসকের
স্মরনাপন্ন হন। প্রতিরক্ষা বাহিনী বা পুলিশ বাহিনীতে চাকরি পেতেও অনেকে এর
চিকিৎসা করাতে আসেন।
ভেরিকোসিল
শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রেই বাম দিকে হয়। যদিও অনেকে দাবী করেন যে এ রোগে
পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায় কিন্ত এখন পর্যন্ত এর স্বপক্ষে কোনো
প্রকার প্রমান পাওয়া যায়নি। তবুও ভেরিকোসিল হলে চিকিৎসা করিয়ে নেয়াই উত্তম।
এর একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন করে দায়ী শিরাগুলোকে তাদের গোড়ায় বেধে
দেয়া। ইদানিং ল্যাপারোস্কোপি করেও এই অপারেশন করা হয় যার ফলে অপারেশনের পরে
রোগীর শরীরে কাটা-ছেড়ার তেমন কোনো দাগ থাকেনা বললেই চলে। যে কোনো অভিজ্ঞ
ল্যাপারোস্কপিক সার্জনই এই অপারেশন করতে পারেন।
অন্ডথলির ক্যান্সার
অন্ডথলির ক্যান্সার
পাক-ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এই ক্যান্সারটি
অন্ডথলির ত্বকে একটি আলসার বা ক্ষত সৃষ্টি করে যার চারপাশের ত্বক একেবারেই
সুস্থ্য থাকে। যার ফলে অনেকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব হয়না যে তিনি ক্যান্সারে
আক্রান্ত হয়েছেন। অনেক সময় রোগীরা ক্ষত সারাতে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের
পরামর্শ অনু্যায়ী এন্টিবায়োটিক গ্রহন করে থাকেন।
বার বার এন্টিবায়োটিক সেবনেও যখন ক্ষত ভালো হয়না তখন তারা বুঝতে পারেন যে
তার রোগটি জটিল এবং কেবল তখনই হয়তো কেউ প্রথম বারের মতো অভিজ্ঞ চিকিৎসকের
স্মরনাপন্ন হন। এর মধ্যে রোগটি জটিল হতে থাকে এবং এক সময় রোগীর কুঁচকির দুই
পাশে সুপুরির মতো শক্ত গোটা উঠতে দেখা যায়। অনেক সময় এটা বেড়ে গিয়ে
শুক্রাশয় কেও ধরে ফেলতে পারে।
এ রোগটি দরিদ্র জনগোষ্ঠির একটি রোগ, যে
সকল শ্রমিক কয়লার চিমনি পরিস্কার করে থাকে তাদের মধ্যে এই রোগ বেশী দেখা
যায় তা ছাড়া বিভিন্ন কারসিনোজেনিক কেমিক্যালের কোম্পানিতে যে সকল শ্রমিক
কাজ করে তাদের মধ্যেও এই ক্যান্সার হবার হার খুব বেশী।
এমন
ক্যান্সার হলে সার্জারিই তার একমাত্র চিকিৎসা। বিশেষজ্ঞ সার্জন
ক্যান্সারটি তার চারপাশের কিছু সুস্থ্য ত্বক সহ কেটে ফেলে দেন রোগটি
কুঁচকিতে ছড়িয়ে গেলে কুঁচকির সুপুরির মতো গোটো গুলোও অপারেশন করে ফেলে দিয়ে
থাকেন।
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস (Undescended Testis)
পরিণত বয়সের অনেক পুরুষকেই ডাক্তারের কাছে আসতে দেখা যায় তার অন্ডথলিতে (Scrotum) শুধুমাত্র একটি শুক্রাশয় বা Testis থাকার
কারনে। অন্য শুক্রাশয়টির অনুপস্থিতি কিন্ত তার জন্মলগ্ন থেকেই। এর একটি
প্রধান কারন আনডিসেন্ডেড টেস্টিস বা অন্ডথলিতে শুক্রাশয় না নামা। তাহলে ঐ
শুক্রাশয় টি কোথায় থাকে?
আসলে মাতৃগর্ভে ছেলে শিশু জন্মের সময় তার শুক্রাশয় গুলো থাকে পেটের ভেতরে, শিশুর
জন্মের আগেই অবশ্য তা অন্ডথলিতে পৌছে যায়। তবে শতকরা প্রায় ৪ (চার) জন
শিশু জন্ম গ্রহনের সময় অন্ডকোষে কেবল একটি শুক্রাশয় নিয়েই জন্মায়। এই চার
জনের মধ্যে ২ জন শিশুই ১ মাসের মধ্যে অন্ডথলিতে তার অপর শুক্রাশয়টি ফেরত
পায়। ১ মাসের পরে আর শুক্রাশয়কে অন্ডথলিতে নামতে খুব একটা দেখা যায়না। তাই
সাধারন পুরুষ জনগোষ্ঠির মাঝে শতকরা প্রায় ২ জন এই আনডিসেন্ডেড টেস্টিস রোগে
ভূগে থাকে। নেমে না আসা ঐ শুক্রাশয় টি পেট থেকে অন্ডথলিতে নেমে আসার পথের
কোথাও না কোথাও আটকে থাকে।
অনেক
বাবা-মা ই শিশুর এই অসুবিধার কথাটি জানেন না আর শিশু নিজে যখন বুঝতে শিখে
ততদিনে অনেক সময় পার হয়ে যায়। এজন্য জন্মের পরপরই শিশু বিশেষজ্ঞ দ্বারা
পরীক্ষা করিয়ে দেখে নেয়া উচিত ভূমিষ্ঠ শিশুটির সকল অঙ্গ ঠিকমতো আছে কিনা।
নেমে
না আসা শুক্রাশয়টি প্রায় ৬ বছর বয়স পর্যন্ত তার যাত্রাপথের কোনো এক স্থানে
সুস্থ্যভাবেই অবস্থান করে। তবে এর পরে বিশেষ করে বয়সন্ধির সময় তা সঠিক
হারে বৃদ্ধি পেতে পারেনা। ১৫-১৬ বছর বয়সের দিকে শুক্রাশয়টি একদম ছোটো এবং
তুলতলে নরম হয়ে আসে। এটি কোনো কাজে আসেনা দেখে পুরুষ শিশুটির পুরুষালি
চরিত্র প্রভাবিত করার হরমোন কম নিঃসৃত হয় এবং শিশুটির সঠিক পুরুষালি বৃদ্ধি
ব্যহত হতে পারে। যাত্রাপথে আটকে যাওয়া ঐ শুক্রাশয়টি থেকে পরিণত বয়সে
ক্যান্সার হবার ঝুকি ও খুব বেশী থাকে।
স্বভাবতই
প্রশ্ন জাগতে পারে এ ধরনের সমস্যা হলে কি করতে হবে। অপারেশন
(অর্কিডোপেক্সি) ই আসলে এই রোগের একমাত্র সফল চিকিৎসা। অপারেশনের আগে পেটের
আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখে নিতে হয় নামতে ব্যর্থ হওয়া শুক্রাশয় টি কোথায়
আছে। জন্মের ২ বছরের মধ্যেই এই অপারেশন করিয়ে নেয়া ভালো, আবার
কেউ কেউ ১ বছর কেই উৎকৃষ্ট সময় হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তবে বাচ্চা
স্কুলে যাবার আগেই এই অপারেশন করিয়ে নিলে শিশুর নতুন কোনো ঝুকি থাকেনা।
শিশুটি বড় হয়ে গেলে এই আনডিসেন্ডেড টেস্টিস অনেক ধরনের সমস্যা করে থাকে, তাই সঠিক বয়সে রোগ নির্নয়ের পরপরই যথাসময়ে বিশেষজ্ঞ শিশু সার্জন দিয়ে অপারেশন করিয়ে শিশুকে ঝুকিমুক্ত রাখা উচিত।
এপিস্পেডিয়াস (Epispadias)
এপিস্পেডিয়াস
পুরুষের মুত্রনালীর জন্মগত একটি ত্রুটি। জন্মনেয়া প্রতি ৩০০০ পুরুষ শিশুর
মধ্যে একজন এই ধরনের ত্রুটি নিয়ে জন্মায়। এই রোগ হলে পুরুষের
মুত্রনালীটি পুরুষাঙ্গের শীর্ষদেশ (Glans penis) দিয়ে
নির্গত না হয়ে লিঙ্গদন্ডের উপড়ের অংশ দিয়ে নির্গত হয় এবং পুরুষাঙ্গটি
উপড়ের দিকে বাকানো থাকে। এপিস্পেডিয়াস হলে শিশুর পুরুষাঙ্গের সম্মুখের
ঝুলে থাকা বাড়তি চামড়া টুকু (Prepauceal skin) থাকেনা এজন্য অনেকে একে স্বপ্নে মুসলমানি/খতনা হয়ে যাওয়া (পয়গম্বরি সুন্নত) বলে থাকেন।
সম্পুর্ণ এপিস্পেডিয়াস একটি জটিল রোগ, এ
রোগের সাথে মুত্রথলি এবং পেটের তলদেশের জন্মগত ত্রুটি থাকতেও দেখা যায়।
এই ধরনের রোগ অপারেশন করলে ভালো হয়ে যেতে পারে। তাই শিশু এই ধরনের সমস্যা
নিয়ে জন্মালে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ শিশু সার্জন এর পরামর্শ নেয়া উচিত।প্যারা ফাইমোসিস (Para Phimosis)
অনেক পুরুষের ক্ষেত্রেই অনেক সময় পুরুষাঙ্গের সম্মুখের চামড়ার (Prepuceal skin) ভেতর থেকে লিঙ্গের শীর্ষদেশ (Glans penis) বের করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় এবং তা শক্ত ভাবে আটকে থাকে, এভাবে
বের করতে গিয়ে অনেকেরই হঠাৎ করে লিঙ্গর শীর্ষদেশ বাড়তি চামড়ার ফাকে আটকে
যাওয়ার নামই প্যারাফাইমোসিস। এমনটি হলে যেহেতু লিঙ্গশীর্ষে আটকে পরা রক্ত ও
রক্ত রস ফেরত যেতে পারেনা তাই লিঙ্গের মাথাটি ফুলে গিয়ে বিশ্রী রকম বড় হয়ে
যায় এবং রোগী তীব্র ব্যথা অনুভব করতে থাকে।
অনেক সময়ই বরফ দিয়ে মালিশ করে হাল্কা চাপ দিলে এটা আগের অবস্থানে চলে যায়
তবে অনেক সময়ই এই পদ্ধতি ব্যর্থ হতে দেখা যায়। এমন ভয়াবহ ও যন্ত্রনাদায়ক
অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সাথে সাথে রোগীর বাড়তি চামড়া অবশ করে একটু কেটে
দিলে রোগের উপশম হয়। চিরতরে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে মুসলমানি বা
খতনা করিয়ে নেয়াই উত্তম।
ব্যালানোপসথাইটিস (Balanoposthitis)
পুরুষাঙ্গের শীর্ষদেশ (Glans penis) এ যদি ঘা বা প্রদাহ হয় তাহলে তাকে ব্যালানাইটিস বলে। আবার পুরুষাঙ্গের সম্মুখের বাড়তি চামড়া (Prepuceal skin) এ যদি ঘা বা প্রদাহ হয় তাকে বলা হয় পসথাইটিস। যেহেতু এই দুটি জিনিস সব সময়ই মুখোমুখি অবস্থানে থাকে তাই একটির সংক্রমনে অপরটিও সংক্রমিত হয়। আর এই এই দুটি কে একসাথে ব্যালানোপসথাইটিস বলে।
যেসকল প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ গ্লান্স পেনিস (Glans penis) নিয়মিত পরিস্কার করেন না তাদের মধ্যে এই রোগ হবার প্রবনতা বেশী। এছাড়া পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার, ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী এবং ফাইমোসিস আক্রান্ত রোগীরও এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী। ত্বকের বিভিন্ন রোগের কারনেও এমনটি হতে পারে। ব্যালানোপথাইটিস হলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী শুধু চুলকানি জাতীয় সমস্যা এবং লিঙ্গের সম্মুখ অংশ দিয়ে সামান্য রস বের হবার মত সমস্যা অনুভব করেন। রোগের জটিল পর্যায়ে লিঙ্গের শীর্ষদেশ (Glans penis) এ বিশ্রী ধরনের লাল ঘা হয় এবং তা দিয়ে পুঁজ বের হতে থাকে।
এই রোগের চিকিৎসার প্রথম শর্ত হলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা । নিয়মিত ভাবে পুরুষাঙ্গ পরিস্কার রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক অসুধ সেবনে এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।
একটোপিক টেস্টিস (Ectopic Testes)
পরিণত বয়সের অনেক পুরুষই ডাক্তারের কাছে আসেন তার অন্ডথলিতে মাত্র একটি শুক্রাশয় বা Testis থাকার কারনে। এর মধ্যে একদল রোগীর ঠিকই দুটো সুস্থ্য শুক্রাশয় থাকে তবে তার একটি অন্ডথলিতে এবং অপরটি পুরুষাঙ্গের গোড়ার দিকে, অন্ডথলির নীচে অথবা উরুর কাছাকাছি থাকে। অন্ডথলির বাইরে থাকা এই শুক্রাশয়টিকেই একটোপিক টেসটিস বলা হয়।
আনডিসেন্ডেড টেস্টিস এর মতো একটপিক টিস্টিস তেমন খারাপ কোনো রোগ নয়, কারন অন্য স্থানে থাকা শুক্রাশয় টি পুরোপুরি সুস্থ্য এবং কর্মক্ষম থাকে। তবে সমস্যা তো একটা থাকেই, তা হলো একটোপিক অবস্থানে থাকা শুক্রাশয়টির খুব সহজেই আঘাত প্রাপ্ত হবার সুযোগ থাকে। এছাড়া অনেক সময় স্ত্রী সঙ্গীর নিকট অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পরার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ও অনেক পুরুষ এর জন্য চিকিৎসা নিতে আসেন।
একটোপিক টেস্টিস খুব সহজেই অপারেশনের মাধ্যমে অন্ডথলিতে ফিরিয়ে আনা যায়। এ রোগে যারা ভুগছেন দ্বিধা দন্দে না ভুগে বিশেষজ্ঞ ইউরোলজিস্ট সার্জন এর সাথে সাক্ষাত করে এই পরিস্থিতি থেকে সহজেই মুক্তি পেতে পারেন।
স্পারমোটোসিল (Spermatocele)
শুক্রাশয় বা টেস্টিসের উপড়ের অংশে অনেক সময় গোটার মতো একটা টিউমার হতে দেখা যায়। এটা আসলে এক ধরনের সিস্ট (Cyst), শুক্রানু সংগ্রাহক নালীতে এই ধরনের রিটেনশন সিস্ট হয়ে থাকে, একেই স্পারমোটোসিল বলা হয় (Spermatocele)। বেশীরভাগ সময়ই এটা ছোটো থাকে তবে কখনো কখনো এটা বড় হতে থাকে এবং অনেক রোগীই মনে করে যে তাদের অন্ডথলিতে তিনটি অন্ডকোষ রয়েছে।
হাত দিয়ে টিপে দেখলে দেখা যায় নতুন এই সিস্ট টি অন্ডকোষের তুলনায় কিছুটা নরম ও ঢিলাঢালা প্রকৃতির।
এই
রোগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি অনেক সময় সিরিঞ্জ দিয়ে রস টেনে বের করে
দেখতে পারেন সে ক্ষেত্রে দেখা যায় স্পারমাটোসিল এর অভ্যন্তরস্থ তরল টি
বার্লির পানির মতো বর্নের হয়ে থাকে। পরীক্ষা করলে এর ভেতরে শুক্রানু পাওয়া
যায়। এই রোগ হলে মানুষ বেশ কিছুটা দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হয়ে পরে। তাদের
নির্ভার করতে জানানো প্রয়োজন যে এটা তেমন কোনো খারাপ রোগ নয় এবং ছোট আকারের
স্পারমাটোসিল হলে তার জন্য কোনো চিকিৎসা না নিলেও চলে। তবে চিকিৎসকের সাথে
পরামর্শ করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে রোগটি স্পারমাটোসিল ই কি না। এর আকার
বড় হয়ে গেলে বিশেষজ্ঞ সার্জন কর্তৃক একে অপারেশন নেয়াই ভালো, এটি কিন্ত খুব ছোটো খাটো মাত্রার একটি অপারেশন।
জমজ সন্তান / টুইন প্রেগনেন্সি
অনেক
মা ই প্রসবের সময় এক সাথে দুই বা কখনো তার অধিক সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকেন।
এ নিয়ে অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। গর্ভে একের অধিক সন্তান ধারণ করা
অস্বাভাবিক কিছু নয় আর এজন্য স্বামী বা স্ত্রী কে দায়ী তা নিয়েও গবেষণার
প্রয়োজন নেই। ধরে নিতে হবে এটা প্রকৃতি প্রদত্ত এবং এর পেছনে অন্য কিছুর
হাত নেই; তবে চিকিৎসা শাস্ত্র অনুযায়ী
কৃত্রিম ভাবে সন্তান ধারণ করতে গেলে অনেক সময় একই সাথে অনেক গুলো সন্তান
গর্ভে আসতে পারে। এই আলোচনায় আমরা প্রাসঙ্গিক কারণেই তাদের নিয়ে আলাপ করতে
যাচ্ছিনা।
টুইন বা জমজ সন্তান আবার দুই ধরণের হতে পারে -
১) বাইনোভুলার বা ডাইজাইগোটিক (Binovular/ Dizygotic)
২) ইউনিওভুলার বা মনোজাইগোটিক (Uniovular/ Monozygotic)
বাইনোভুলার বা ডাইজাইগোটিক (Binovular/ Dizygotic) - মায়ের
গর্ভে আসন গেড়ে নেয়া এমন শিশু দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ডিম্বানু থেকে
জন্ম নেয় আর এদের নিষিক্ত করা শুক্রানু দুটিও পুরো ভিন্ন ভিন্ন। যার অর্থ
একই সাথে সম্পুর্ণ ভিন্ন দুটি শিশু ঘটনাক্রমে একই সময় জরায়ুতে বড় হচ্ছে।
ফলে শিশু দুটির আলাদা আলাদা দুটি ফুল বা প্লাসেন্টা থাকে এবং এদের লিঙ্গ (sex) ও
ভিন্ন হতে পারে। এমন দুটি শিশুর একসাথে লেগে থাকার সম্ভাবনা ও থাকেনা।
জন্ম নেয়া টুইন বাচ্চাদের দুই তৃতীয়াংশই এমন ভাবে জন্ম নেয়া। যার ফলে দেখা
যায় জমজ হলেও এদের লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, গড়ন, গায়ের রঙ বা অন্যান্য অনেক বৈশিষ্ট এক নয়। তবে দুজন একই রকম হওয়াটাও কিন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অস্বাভাবিক নয়।
ইউনিওভুলার বা মনোজাইগোটিক(Uniovular/ Monozygotic) - একটি
মাত্র ডিম্বানু নিষিক্ত হয়ে যদি দুটি শিশুর জন্ম হয় তাহলে তাকে মনো
জাইগোটিক টুইন বলা হয়। নিষিক্ত ডিম্বানুটি পরবর্তীতে বিভাজিত হয়ে দুটি
পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এর ফলে দুটি শিশুর জন্য কেবল একটি মাত্র ফুল বা
প্লাসেন্টা থাকে। শিশু দুটির লিঙ্গ এবং সকল শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট ও এক হয়ে থাকে। যেহেতু শিশু দুটি পুরোপুরি একই জীন (Gene) বহন করে এবং সকল বৈশিষ্ট একই রকম হয় তাই এদের কে অনেক সময় আইডেন্টিকাল টুইন (Identical twin) বলা
হয়। জমজ শিশুদের মধ্যে এই প্রকার শিশুরা শুধুমাত্র এক তৃতীয়াংশ। অনেক সময় এ
ধরনের জমজ শিশু একজন অপরজনের কাছ থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়না এবং জন্মের পরও
এদের কিছু কিছু অঙ্গ সংযুক্ত থাকে (Siamese twin)। শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে এ সকল শিশুকে আলাদা করে একটি অর্থবহ জীবন দান করা বর্তমান বিশ্বে এখন আর অসম্ভব কিছু না।
জমজ সন্তান হওয়া স্বাভাবিক একটি ঘটনা হলেও জমজ সন্তান ধারন করলে গর্ভবতী মাকে একটু বাড়তি সাবধানতা গ্রহন করতে হয়। এসকল মায়ের এনিমিয়া, এক্লাম্পসিয়া, এন্টিপারটাম হেমোরেজ, ম্যাল প্রেজেন্টেশন, প্রিটার্ম
লেবার সহ নানাবিধ সমস্যা হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে। এজন্য
এসকলক্ষেত্রে শুরু থেকেই একজন স্ত্রী ও প্রসুতি রোগ বিশেষজ্ঞের
তত্ত্বাবধানে থাকলে মা এবং শিশু দুজনেরই জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
উচ্চ ঝুকি সম্পন্ন গর্ভবতী মা
অনেক মা’ই
আছেন গর্ভধারনের ফলে যারা অনেক ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন, এদের
ঝুকিগ্রস্থ মা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে গর্ভবতী মায়ের ঝুকি কিন্ত শুধু
মায়েরই ঝুকি নয় একই সাথে সন্তান ও এক ধরনের ঝুকির সম্মুখীন হয়। এর ফলে
দেখা যায় পরিশেষে এসকল মায়ের পক্ষে একটি সুস্থ্য সন্তান প্রসব করা সম্ভব
হয়ে উঠেনা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে শতকরা প্রায় ২০ থেকে
৩০ শতাংশ মা’ই ঝুকি গ্রস্ত।
এজন্য
সন্তান ধারনের পূর্বেই জেনে নেয়া ভালো কোন কোন মা উচ্চ ঝুকি সম্পন্ন, এটা
জেনে শুরু থেকেই অতিরিক্ত সাবধানতা গ্রহন করলে অনেক বিপদই হয়তো এড়িয়ে
যাওয়া সম্ভব হবে। চলুন তাহলে যেনে নেওয়া যাক কোন কোন মহিলাদের গর্ভধারনের
কারনে উচ্চ ঝুকির সম্ভাবনা রয়েছে।
· প্রথম সন্তান ধারনের সময় যে সকল মায়ের বয়স ৩০ বছর বা তার বেশী।
· যেসকল মায়ের উচ্চতা ১৪০ সেন্টিমিটার এর কম।
· গর্ভাবস্থায় যে সকল মায়ের প্রসবের পথে রক্তপাত হয়।
· যে সকল মায়ের পূর্বে এবরশন বা গর্ভপাত হবার ইতিহাস রয়েছে।
· গর্ভাবস্থায় এক্লাম্পসিয়া বা প্রিএক্লাম্পসিয়া রোগাক্রান্ত হওয়া।
· মায়ের রক্তের হিমোগ্লাবিন এর পরিমান শতকরা ৫০ ভাগ এর কম থাকা।
· গর্ভের শিশুটি মাথা নিচের দিকে না থেকে আড়াআড়ি (Transverse lie) বা পা নিচের দিকে থাকা (Breech)।
· বার বার গর্ভের বাচ্চা মরে যাওয়া বা মৃত বাচ্চা প্রসব করার কোনো অতীত ইতিহাস থাকা।
· প্রত্যাশিত তারিখের দুই সপ্তাহের মধ্যে ও প্রসব না হওয়া।
· সিজারিয়ান সেকশন বা ইন্সট্রুমেন্টাল ডেলিভারি করার ইতিহাস থাকা।
· গর্ভবতী
মায়ের জটিল হৃদরোগ, কিডনি রোগ, লিভার বা যকৃতের রোগ, ডায়াবেটিস, যক্ষা
বা টিবি, উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন ইত্যাদি রোগবালাই থাকা।
· গর্ভপাত হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকা।
· খুব বেশী বয়সে একাধিক সন্তান হওয়া।
· হাইড্রমনিয়স রোগ হওয়া।
· গর্ভে একাধিক বাচ্চা বা জমজ বাচ্চা থাকা ইত্যাদি।
গর্ভাবস্থায় খিচুনি রোগ / এক্লাম্পসিয়া
গর্ভাবস্থায় অনেক মা’এর ই খিচুনি হতে দেখা যায়, বিশেষ করে প্রসবের আগে এমন খিচুনি উঠার কারণে অনেক মা এবং শিশুকেও অঘোরে প্রান হারাতে হয়। এক্লাম্পসিয়া গর্ভবতী মায়ের এমনই একটি খিচুনি জাতীয় রোগ।
প্রিএক্লাম্পসিয়ার মতো এক্লাম্পসিয়া হলেও রোগীর উচ্চ রক্তচাপ, হাতে
পায়ে পানি আসা বা ওজন বেড়ে যাওয়া এই সকল উপসর্গ গুলো থেকে থাকে তবে
খিচুনিই হলো এক্লাম্পসিয়া হবার বিশেষ উপসর্গ। শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই
প্রসব বেদনা শুরু হবার ঠিক আগে আগে খিচুনি শুরু হয়। শতকরা ৩০ ভাগ এর
ক্ষেত্রে এই খিচুনি উঠে বাচ্চা প্রসবের সময়। তবে ২০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে
প্রসবের পর প্রথম ৪৮ ঘন্টার মধ্যেও এই খিচুনি উঠতে পারে।
খিচুনি উঠার শুরুতে রোগী অনেক সময় চোখে উজ্জল আলোর ঝলকানি দেখতে পারে, কারো কারো আগে মাংশপেশীতে টান ধরা এবং চোখ উল্টে যাওয়া এসব সমস্যাও দেখা যায়। এরপর শরীরের সমস্ত মাংশপেশী শক্ত হয়ে যাওয়া, শরীর বাকা হয়ে যাওয়া, জিহবা কামড়ে ধরা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। একবার খিচুনি হয়ে গেলে রোগী আবার কিছুক্ষনের জন্য শান্ত হয়ে যায়।
এমন
কিছু হলে রোগীকে অতি সত্ত্বর নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিতে হবে।
এমন রোগীর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকা আবশ্যক তবে তেমন কেউ না
থাকলে অবশ্যই একজন এম,বি,বি,এস ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।
এমন
রোগীকে একটি সম্পূর্ণ অন্ধকার (কালো রঙ করা) কক্ষে নিভৃতে রাখতে হয়। তার
প্রসাবের নালিতে একটি ইউরিনারি ক্যাথেটার দেয়া হয় এবং শিরার মাধ্যমে
(স্যালাইন) তার পুস্টির ব্যবস্থা করা হয়। এই রোগীর চিকিৎসায় খিচুনি নাশক, ঘুমের অসুধ এবং এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। উচ্চরক্তচাপ কমানোর জন্য অনেক সময় শিরায় ইঞ্জেকশন দেয়া লাগতে পারে।
প্রসবের আগে এমন সমস্যা নিয়ে এলে প্রসব করিয়ে দেয়া চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি
অংশ এজন্য প্রয়োজনে সিজারিয়ান সেকশন অপারেশন করেও বাচ্চা বের করা প্রয়োজন
হতে পারে। মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে উপস্থিত চিকিৎসকের সিদ্ধান্তই সর্বাপেক্ষা
গুরুত্বপূর্ণ। এক্লাম্পসিয়া
গর্ভবতী মায়ের ভয়াবহ একটি রোগ। উপযুক্ত চিকিৎসা না করালে এই রোগে শিশু এবং
মা উভয়েরই মৃত্যু হবার সম্ভাবনা আছে তাই এমন কোন সমস্যা দেখা দিলে সাথে
সাথে গর্ভবতী মা’কে নিকটবর্তী চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া অনিবার্য। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহনে অবহেলা অনেক সময় অনেক অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্লাসেন্টা প্রিভিয়া
গর্ভাবস্থায়
যোনিপথ বা প্রসব পথে রক্তপাত হওয়াকে সবসময়ই একটি ভয়াবহ চিহ্ন হিসেবে দেখা
হয়। গর্ভধারনের ২৪ সপ্তাহ থেকে প্রসবের আগ পর্যন্ত এই রক্তপাত কে
এন্টিপারটাম হেমোরেজ বলা হয়। এই অবস্থায় রক্তপাত হবার নানাবিধ কারণ রয়েছে
এর মধ্যে প্লাসেন্টা প্রেভিয়া এবং এব্রাপ্সিও প্লাসেন্টি নামক রোগ দুটোই
সর্বাধিক দায়ী।
গর্ভের
ফুল বা প্লাসেন্টাটি যদি জরায়ুর একদম নীচের দিকে বা জরায়ুমুখে লেগে থাকে
তাহলে অনেক সময় প্রসবের রাস্তায় রক্তযেতে পারে। এর নামই প্লাসেন্টা
প্রিভিয়া।
এমনটি হলে হঠাৎ করেই রক্তপাত শুরু হয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয় যে রক্তপাতের
সময় কোনো ব্যথা অনুভুত হয়না এবং রক্তের রং থাকে উজ্জ্বল লাল। প্লাসেন্টা
প্রেভিয়া হলে বাচ্চার মাথা সাধারণত সঠিক অবস্থানে থাকেনা, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মাথা উপড়ের দিকে বা আড়াআড়ি থাকতে দেখা যায়।
রোগী অনেক সময়ই রক্তশূন্যতায় ভোগে এবং অনেক সময় শক (Shock) এও
চলে যেতে পারে। এজন্য এধরণের রোগীকে দেরী না করে সাথে সাথে নিকটবর্তী
হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া উচিৎ। হাসপাতালে ভর্তির পর রোগীকে রক্তদেবার
প্রয়োজন দেখা দিতে পারে এজন্য রোগীর রক্তের গ্রুপ জানা খুবই জরুরী।
রক্তশূন্যতা কাটিয়ে উঠার পর যত দ্রুত সম্ভব একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের
স্মরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
আল্ট্রাসনোগ্রাম
করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে রোগী প্লাসেন্টা প্রিভিয়া রোগে ভূগছেন। অভিজ্ঞ
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞগন পরীক্ষা করেও অনেক সময় রোগটির ব্যাপারে নিশ্চিত হতে
পারেন।গর্ভের বাচ্চার বয়স যদি ৩৭ সপ্তাহের বেশী হয় অথবা মা বা শিশুর ঝুকির
পরিমান যদি খুব বেশী থাকে কিংবা রক্তপাত যদি নিয়ন্ত্রন করা না যায়
সেক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশন করে বাচ্চা বের করে নিয়ে আসা হয়। বাচ্চা বের
করার পর সব ধরনের রক্তপাতই বন্ধ হয়ে যায়। গর্ভের বাচ্চার বয়স ৩৭ সপ্তাহের
কম হলে রোগীকে রক্তদান করা হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় তাকে
বাচ্চা পরিণত না হওয়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষনে রাখা হয়। বাচ্চা পরিণত হলে তারপর
সিজারিয়ান সেকশন করে বাচ্চা বের করে আনা হয়। অসুখটি কমমাত্রার হলে অনেক
সময় নরম্যাল ডেলিভারির মাধ্যমেও বাচ্চা প্রসব করানো সম্ভব তবে আপনার
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামরশই এ ব্যাপারে সঠিক বলে গণ্য করে নেয়া উচিৎ।
গর্ভাবস্থায় উচ্চরক্তচাপ / প্রি-এক্লাম্পসিয়া
প্রি-এক্লাম্পসিয়া
গর্ভবতী মায়ের উচ্চ রক্তচাপ জনিত একটি রোগ। যে সকল মহিলা গর্ভ ধারণের ২০
সপ্তাহ পরে নতুন করে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন (রক্ত চাপ ১৪০/৯০ এর সমান
অথবা এর বেশী) এ আক্রান্ত হয় এবং একই সাথে যাদের হাত-পায়ে পানি আসে এবং
ফুলে যায় এবং প্রসাবে বা মুত্রে প্রোটিন জাতীয় পদার্থ যায় তাদের
প্রি-এক্লাম্পসিয়া নামক রোগটি হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
সাধারণত যে সকল
মহিলা খুব অল্প বয়সে অথবা খুব বেশী বয়সে প্রথম সন্তান ধারণ করে তাদের
মধ্যে এই রোগ হবার প্রবণতা অনেক বেশী। এ ছাড়া যাদের আগে থেকেই হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস বা কিডনী রোগ থাকে অথবা যারা জমজ সন্তান ধারন করেছে বা পলিহাইড্রমনিয়স (polyhydramnios) বা হাইডাটিফর্ম মোল (Hydatiform mole) হয়েছে
তাদের মাঝেও এই রোগ বেশী দেখা যায়। যাদের পরিবারে এমন রোগ হবার ইতিহাস
আছে তাদের মাঝে এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের মাঝেও এমন রোগ হবার সম্ভাবনা অনেক
বেশী থাকে। এসকল মহিলার রক্তে গর্ভাবস্থায় প্রেসর সাবস্টেন্স (pressor substance) নামক বিবিধ রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারনে তিনি শরীরে উচ্চ রক্তচাপ রোগটি ধারণ করেন।
প্রিএক্লাম্পসিয়া হলে ব্লাড প্রেসার বা রক্তচাপ তো বেড়ে যায়ই সেই সাথে পায়ে পানি আসতে শুরু করে, অস্বাভাবিক হারে শরীরের ওজন বাড়তে থাকে। সেই সাথে মাথা ব্যথা করা, ঘুম না আসা, উপরের পেটে ব্যথা করা, বমি করা বা বমি বমি ভাব লাগা, প্রসাবের পরিমাণ কমে আসা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি নানাবিধ উপসর্গ দেখা দেয়।
কারো
প্রিএক্লাম্পসিয়া হলে সাথে সাথে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিতে হবে।
একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানেই এমন একটি রোগী সর্বোচ্চ নিরাপদ।
ভর্তির প্রসাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম, অপথালমোস্কেপি সহ নানাবিধ পরীক্ষা করা হয়।
ভর্তির
পর রোগীকে পূর্ণ মাত্রায় বিশ্রামে রাখা হয় এবং একদিকে কাত করে শোয়ানো
হয়। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রোগীকে মিথাইল ডোপা/ নিফিডিপিন এই জাতীয়
অসুধ দেয়া হয়, সেই সাথে ঘুমের অসুধ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওসুধ ও দেয়া হয়। এই ধরনের রোগীর খাবার এর সাথে লবন খাওয়া এক দমই নিষেধ, তবে যথেষ্ট প্রোটিন যুক্ত পুষ্টিকর খাদ্য রোগীকে নিয়মিত দিয়ে যেতে হয়।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞই রোগীর উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন, সাধারণত বাচ্চা পরিণত হয়ে গেলে প্রসব বা ডেলিভারি করালে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি মেলে; তবে বাচ্চা পরিণত না হলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করে রোগীকে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়, পরবর্তী সময়ে বাচ্চা পূর্ণ পরিণত হলে তখন নরমাল ডেলিভারি বা সিজারিয়ান সেকশন অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চার জন্মদানের ব্যবস্থা করা হয়।
মনে রাখতে হবে প্রিএক্লাম্পসিয়া গর্ভবতী মায়ের জন্য ভয়াবহ একটি রোগ, এটা
নিয়ে কোনো প্রকার অবহেলা বা গাফিলতি করা চলবেনা। এ রোগ সঠিক ভাবে চিকিৎসা
না করালে শিশুর মৃত্যু থেকে শুরু করে মায়ের চিরতরে অন্ধ হয়ে যাওয়া সহ
জটিল জটিল সব সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই গর্ভবতী মায়ের উচ্চরক্তচাপ হলে বা হাতে পায়ে পানি আসলে সাথে সাথে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
পলিহাইড্রমনিয়স
মাতৃগর্ভে জরায়ুর মাঝে শিশুটি এমনিওটিক ফ্লুইড
নামক একটি তরল পদার্থের মধ্যে ভাসমান অবস্থায় থাকে। এই ফ্লুইড বা তরলের
পরিমাণ যদি কোনা কারনে ২০০০ মিলি লিটার বা ২ লিটার এর চেয়ে বেশী হয়ে যায়
তাহলে গর্ভবতী মায়ের পেট অস্বাভাবিক মোটা বা স্থুল দেখা যায়। এরই নাম
পলিহাইড্রমনিয়স (Polyhydramnios) বা হাইড্রমনিয়স (Hydramnios)। স্বাভাবিক ভাবে জরায়ুতে ৫০০ থেকে ১৫০০ সিসি এমনিওটিক ফ্লুইড থাকতে পারে।
অনেক কারনে পলিহাইড্রমনিয়স হতে পারে যেমন মায়ের যদি ডায়াবেটিস হয়, কিডনি
সমস্যা থাকে বা এক্লাম্পসিয়া থাকে বা গর্ভে একাধিক সন্তান থাকে ইত্যাদি।
আবার শিশুর কিছু জন্মগত ত্রুটি (মস্তিষ্ক বা মেরুদন্ডের) থাকলেও মায়ের এমন
রোগ হতে পারে।
হাইড্রমনিয়স হলে রোগীর পেট ফুলে টান টান হয়ে থাকে, শ্বাস কস্ট হয়, উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হয়, বুকধরফর করে, অতিরিক্ত গ্যাস হয়, বাচ্চার নড়াচড়া টের পাওয়া যায়না, এছাড়া একারনে অনেক সময় হাতে পায়ে পানি আসে এমনকি পায়ের শিরাও ফুলে মোটা হয়ে যেতে পারে।
সাধারণত
আল্ট্রাসনোগ্রাম করে এই রোগ নিশ্চিত করা হয় তবে এক্সরে করেও এই রোগ
নিশ্চিত করা যেতে পারে। অনেক সময় এমনিওসেন্টেসিস নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে
পরীক্ষা করে দেখা হয় গর্ভের শিশুটির মস্তিস্কে কোনো জন্মগত ত্রুটি আছে
কিনা এবং সেই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভপাতের ও প্রয়োজন
হতে পারে।
এই রোগে রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে রাখতে হয় সেই সাথে গ্যাস এর চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হয়।রোগীর পাতে লবন একদম নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়, ডায়াবেটিস
বা কিডনি রোগ থাকলে তার ও চিকিৎসা দেয়া হয়।এভাবে রোগ নিয়ন্ত্রন করা
গেলে পরিণত সময়ে স্বাভাবিক ভাবে বাচ্চা প্রসব করানো হয় তবে মা বা
সন্তানের অতিরিক্ত ঝুকি থাকলে এবং বাচ্চার বয়স ৩৭ সপ্তাহের বেশী হলে
বাচ্চা প্রসব করিয়ে দেয়া হয়। আর বাচ্চার বয়স এর কম হলে এমনিওসেন্টেসিস
করা হয় এবং বাচ্চা পরিনত না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায়
রোগীকে পর্যবেক্ষনে রাখা হয়। মনে রাখতে হবে এই ধরনের রোগীকে অবশ্যই সবসময়
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে এবং তিনিই রোগের অবস্থা বুঝে
চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন। হাইপারেমেসিস গ্রাভিডেরাম
অনেক
গর্ভবতী মহিলাকে দেখা যায় গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি করতে। এটা মাঝে মাঝে
এতো অত্যাধিক হয় যে তা মায়ের স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটায় এমন কি স্বাভাবিক
জীবন যাপন ও এসময় দুর্বিসহ হয়ে উঠে। সাধারণত প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রেই এমন
সমস্যা বেশী হয়ে থাকে। এই অবস্থা প্রথম তিন মাসের পর নিয়ন্ত্রনে চলে আসে।
কোনো কোনো মায়ের ক্ষেত্রে এটা বংশগত ভাবেও এসে থাকে। গর্ভে একের অধিক
সন্তান, হাইডাটিফর্ম মোল এবং অবৈধ সন্তান ধারণকারী মায়ের ক্ষেত্রে এর প্রবণতা অনেক অনেক বেশী।
হাইপারেমেসিস গ্রাভিডেরাম স্বল্পমাত্রার বা তীব্র মাত্রার হতে পারে। স্বল্প মাত্রার রোগীদের বমি যে কোনো সময়ই হতে পারে, খাবার
সাথে বমির কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বমির সাথে খাবার বের হয়ে আসা একটা
স্বাভাবিক ঘটনা। এ ধরণের রোগীর স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয় তবে এই অবস্থায়
ও তারা খাবার দাবার চালিয়ে যেতে পারে। বাহ্যিক ভাবে গর্ভবতী মাকে অসুস্থ্য
বা রুগ্ন মনে হয়না।
তীব্র
মাত্রার রোগীদের সারাক্ষনই বমি অথবা বমি ভাব হয়। বমি না হলেও অনেক সময় এরা
টক ঢেকুর বা বুকজ্বালা করা ইত্যাদি সমস্যার কথা বলে থাকে। এদের বমির
তীব্রতা অনেক বেশী এবং বমির সাথে মাঝে মাঝে রক্তও চলে আসতে পারে। সাধারণত
বমির রঙ হয় কফির রঙের, সেই সাথে পেটের উপড়ের অংশে ব্যথা, প্রসাব কমে যাওয়া বা না হওয়া, বিছানা থেকে নড়তে না পারা, সেই সাথে চোখে ঝাপসা দেখা, কোনো জিনিস দুটো দেখা, ক্লান্তি, চরম অবসাদ, বিভ্রান্তি সহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় রোগীরা খুবই উদ্বিগ্ন থাকে, পানি শুন্যতায় ভোগে, তাদের নাড়ির গতি বেড়ে যায়, রক্তচাপ কমে যায়, জন্ডিস দেখা দেয় এমনকি মাঝে মাঝে অনেক কে এনকেফালোপ্যাথিতেও ভুগতে দেখা যায়।
হাইপারেমেসিস গ্রাভিডেরাম এর নির্দিষ্ট কোনো কারন এখনো জানা যায়নি, তবে
এটা চিরস্থায়ী কোনো রোগ নয়। এমন হলে রোগীকে সাথে সাথে হাসপাতালে স্ত্রীরোগ
বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে ভর্তি করিয়ে দিতে হবে। ভর্তির পর সাধারণত রোগীকে
নাকে নল দিয়ে অথবা স্যালাইনের মাধ্যমে খাবার দেয়া হয়। সেই সাথে বমির নিরাপদ
অসুধ এবং ঘুমের অসুধ ও দেয়া হয়ে থাকে। রোগী বমির কারনে যেসকল তরল ও লবন
হারিয়ে থাকে তা প্রতিস্থাপন করাও চিকিৎসার অন্যতম অংশ। এর পর
ধীরে ধীরে রোগীকে স্বাভাবিক খাবারে ফিরিয়ে আনা হয় এবং বেশীর ভাগ রোগীই এতে
ভালো হয়ে যায়। কখনো কখনো রোগের তীব্রতা এতো বেশী থাকে যে কোনো চিকিৎসাতেই
বমি এবং অন্যান্য অসুস্থ্যতা কমে না। সেই ক্ষেত্রে অনেক সময় গর্ভপাত করিয়ে
রোগীর জীবন বাচাতে হয়, তবে এমন ঘটনা খুব বেশী ঘটেনা তাই এ নিয়ে গর্ভবতী মায়েদের অতিরিক্ত চিন্তিত হবার কিছু নেই।
এব্রাপ্সিওপ্লাসেন্টি
প্লাসেন্টা বা গর্ভের ফুলটি যদি জরায়ুর গা থেকে ছুটে আসে বা separate হয়ে যায় তাহলে জরায়ু মুখ বা যোনিপথ দিয়ে যে রক্তপাত হয় তাকে এব্রাপ্সিওপ্লাসেন্টি বলা হয়। গর্ভে একাধিক সন্তান থাকলে, মায়ের বয়স বেশী হলে, এক্লাম্পসিয়া থাকলে, তলপেটে আঘাত পেলে বা পলিহাইড্রমনিয়স জাতীয় সমস্যা থাকলে এমন সমস্যা হবার প্রবণতা বেশী থাকে।
এই
রোগে অনেক সময় খুব অল্পপরিমানে রক্তপাত হতে দেখা যায় তবে রক্তের রঙ সবসময়ই
থাকে গাঢ় লাল। বাহ্যিক রক্তপাত হতে না দেখা গেলেও এ রোগে রক্তপাত যে খুব
কম হয় তা কিন্ত নয় বরং রক্তপাত হয়ে তা জরায়ুর ভেতরে থেকে যেতে পারে, এর
ফলে বাচ্চার ক্ষতি হবার পরিমান আরো বেড়ে যায়। এব্রাপ্সিও প্লাসেন্টি হলে
রোগী ব্যথা অনুভব করে এবং অনেক সময় তীব্র পেট ব্যথার কথা জানায়।
জরায়ুর
মধ্যে রক্তপাত হওয়ায় রোগীর জরায়ু (বাহ্যিক ভাবে তলপেট) শক্ত হয়ে উঠে এবং
বাচ্চার নড়াচড়া কমে যেতে পারে। বাচ্চার বয়সের তুলনায় জরায়ুকে অনেক বড় মনে
হওয়াটাও এ রোগের ই একটি লক্ষন হতে পারে।
এ রোগ হলে রোগীকে সাথে সাথে নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়া উচিৎ এবং একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকা উচিৎ। ভর্তির পর রোগীকে দ্রুত রক্ত দেবার প্রয়োজন হয়ে থাকে এজন্য রোগীর রক্তের গ্রুপ জানা খুবই জরুরী।
আল্ট্রাসনোগ্রাম
করে এই রোগের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায় তবে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ গণ পরীক্ষা
করেও এই রোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেন। ভর্তির সময় রোগী যদি লেবার পেইন
(Labour pain) নিয়ে
ভর্তি হয় তা হলে সাধারণত নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব করানো হয়।
তবে অন্য কোনো ঝুকি থাকলে বা লেবার এ না থাকলে সাধারণত সিজারিয়ান সেকশনের
মাধ্যমে বাচ্চা বের করে নিয়ে আসা হয়। গর্ভের বাচ্চা পরিণত না হলে রোগীকে
হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় পর্যবেক্ষনে রাখা হয় এবং পরিণত হলে অবস্থা
বুঝে বাচ্চার জন্মের ব্যাবস্থা করা হয়।