হিমোফিলিয়া (Hemophilia)
অনেক সময় শরীরের কোথও কেটে গেলে বা দাত তোলার পর রক্তপাত বন্ধ হতে চায়না। ঘাবড়ে দেবার মতো এমন একটি রোগই হিমোফিলিয়া। অবশ্য রক্ত জমাট না বাধার সব রোগই হিমোফিলিয়া নয়। ছোটোখাটো কাটাছেড়ার পর যে উপাদানের কারণে রক্তপাত নিজে নিজেই বন্ধ হয় তার নাম ক্লটিং ফ্যাক্টর (Clotting factor), এমনই দুটি ফ্যাক্টর বা উপাদানের অভাবে হিমোফিলিয়া হয়। এক্স ক্রমোজোম (Chromosome X) এর ত্রুটির কারনে এই উপাদান দুটি শরীরে তৈরী হয়না।
জন্মগত ভাবে প্রাপ্ত এই রোগটি এক্স ক্রমোজোম দ্বারা বংশপরম্পরায় বাহিত হয়। বলতে গেলে পুরুষেরাই একমাত্র এই রোগে আক্রান্ত হয়। মহিলারা এই রোগের ক্রমোজোমের ত্রুটি বহন করলেও এতে আক্রান্ত হয়না। একদম সহজ করে বললে নানার কাছ থেকে এই রোগটি মায়ের হয়ে পুরুষ শিশুর কাছে আসে, নানা এবং মামারা এতে আক্রান্ত হলেও মা এবং খালারা এতে কখনোই আক্রান্ত হয় না।
বাচ্চার কোথাও কেটে গেলে, দাত ফেলার সময় বা মুসলমানি করার পর রক্তপাত বন্ধ না হলে প্রথম এই রোগটির উপস্থিতি ধরা পরে। এছাড়া এরোগে নিজে নিজেই হাটু, কনুই বা পায়ের গোড়ালি রক্ত জমে ফুলে যাওয়া, ব্যাথা হওয়া ইত্যাদি উপসর্গগুলো দেখা যায়। খাদ্যনালী, মূত্রনালী বা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হওয়াও এই রোগে অস্বাভাবিক নয়।
এই রোগে রক্ত পরীক্ষা করলে রক্তের Clotting time এবং APTT বেশী পাওয়া যায়। রক্ত জমাট বাধার উপাদান Factor VIII অথবা IX এর মাত্রা এই রোগে একদম কমে আসে।
হিমোফিলিয়া রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগটি কি পর্যায়ে আছে তার উপড়। রোগিকে সবসময় আঘাত এড়িয়ে চলা শিখতে হবে, দাতের যত্ন নিতে হবে, ব্যথার যে কোনো অসুধ সাবধানতার সাথে খেতে হবে। হিমোফিলিয়া রোগী নিজের সঙ্গে সবসময় একটি কার্ড বহন করার কথা যাতে তার রোগের কথা লিখা থাকবে। রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞ বা হেমাটোলজিস্ট (Hematologist)এর তত্ত্বাবধানে এই রোগের চিকিৎসা করাতে হয়। তাদের নির্দেশ মতোই চলতে হবে।
ডি. আই. সি. (Disseminated intravascular coagulation)
DIC খুব পরিচিত কোন রোগ নয় -কিন্ত
অনেক জটিল রোগেই চুড়ান্ত অসুস্থ্য কোন রোগীর বিভিন্ন অঙ্গগুলো একে একে
রোগাক্রান্ত হয়ে যখন ফেইলুর এর দিকে যেতে থাকে চিকিৎসকগণ অনেক সময়ই
নিকটাত্মীয়দের জানিয়ে দেন যে “রোগীর DIC হয়েছে, এখন অপেক্ষা করা ছাড়া তেমন কিছু করার নেই”।
ডি,আই,সি হলে আসলে কি হয়? এটা হলে রক্ত নালীর মধ্যেই রক্ত জমাট বাধতে শুরু করে,অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্লট তৈরী হয়। এই প্রচুর পরিমানে clot গুলো তৈরী হতে রক্তের অধিকাংশ প্লাটেলেট এবং ক্লটিং ফ্যাক্টর ব্যবহৃত হয়ে যায়,
যার ফলে তখন শরীরের ক্ষুদ্র কোন অংশ কেটে গেলে তা থেকে অবিরাম ধারায়
রক্তপাত হতে থাকে আর তা কোন অবস্থাতেই বন্ধ করা যায় না। এজন্যই এর অন্য
নাম consumption coagulopathy। এর মাত্রা যখন বেড়ে যায় তখন যেকোন কাটা স্থান এমনকি ইঞ্জেকশন দেয়ার স্থান থেকেও অবিরত রক্তপাত কোন ভাবেই বন্ধ করা যায়না। এমন অবস্থায় অনেক সময়ই রোগীর আত্মীয়-স্বজন জানতে পারেন যে শরীরের সকল স্থান দিয়ে রক্তপাত হয়ে রোগী মারা গেছেন।
তবে DIC ধীরে ধীরেও শরীরে বাসা বাঁধতে পারে, যেমন জমাট বাধা রক্ত বা ক্লট গুলো যদি অল্প মাত্রার হয় তবে তা বিভিন্ন অঙ্গ যেমন কিডনী, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ইত্যাদিতে জমাট বাধতে থাকে এবং সে অংগ গুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। এভাবে রোগীর জরুরী অংগ গুলো ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হতে একসময় রোগীর প্রায় সকল অংগ গুলোই নষ্ট হয়ে যায় এবং রোগী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।
সব রোগ হলেই যে DIC হয় তা কিন্ত নয়, সাধারনত অগ্নাশয় (pancrease), প্রস্টেট (prostate), পাকস্থলী (stomach), লিউকেমিয়া (leukaemia) এসবের ক্যান্সার হলে DIC হবার প্রবনতা খুবই বেশী দেখা যায়। তাছাড়া বাচ্চা জন্মদানের সময় গর্ভবতী মায়ের এক্লাম্পসিয়া (eclampsia, preeclampsia), এব্রাসিও প্লাসেন্টা (abruptio placentae), এম্নিওটিক ফ্লুইড এম্বোলিজম (amniotic fluid embolilsm), বড় কোন ধরনের দুর্ঘটনা, আগুনে পুড়ে যাওয়া, বিষাক্ত সাপের কামড়, ম্যালারিয়া ইত্যাদি কারনেও DIC হতে পারে। অনেক সময় বড় কোন অপারেশন /সার্জারি, ইনফেকশন (SEPSIS),শক, হিট স্ট্রোক (Heat stroke) ইত্যাদি কারনেও রোগী DIC রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করতে পারে।
DIC রোগী যেহেতু সাধারণত হাসপাতালেই ভর্তি থাকে তাই এ রোগের উপসর্গ বা পরীক্ষা নিরীক্ষা
নিয়ে রোগীকে খুব বেশী ভাবতে হয়না। এজন্যই হয়তো চিকিৎসকের জন্য
ব্যাপারটা খুবই জটিল হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু এ রোগ হলে শরীরের ক্লটিং
ফ্যাক্টর ও প্লাটেলেট এর বিশাল অংশ ব্যবহৃত হয়ে যায় তাই রক্তে এ দুটির (coagulation factor & platelets counts) মাত্রা
খুব কম থাকে আর তাই তা কেমন আছে তা বার বার যেনে নিতে হয় এবং সে অনুযায়ী
প্রয়োজন হলে বাইরে থেকে তা রোগীর শরীরে রক্তনালীর মাধ্যমে (I.V- intravenous) দেয়া হয়। DIC রোগে রক্তে প্রথমবিন টাইম (PT-Prothombin time) এবং এক্টিভেটেড পার্শিয়াল থ্রম্বপ্লাস্টিন টাইম (APTT-Activated partial thromboplastin time) এর মাত্রা খুব বেশী থাকে এবং ডি-ডাইমার (D-dimer) সহ বিভিন্ন ফিব্রিন ডিগ্রেডেশন প্রডাক্ট (FDP- fibrin degradation product/fibrin splitting product) এর মাত্রা বেশ বেড়ে যায়। অন্য দিকে ফিব্রিনোজেন (Fibrinogen) উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে যায়।
DIC যতো জটিল রোগই হোক তাই বলে কি এর কোন চিকিৎসা থাকবেনা ? অন্যান্য রোগের মতো এ রোগেরও চিকিৎসা আছে। তবে একটা কথা ভালো মতো জেনে রাখা ভালো এই ধরনের রোগীকে অবশ্যই আই,সি,ইউ (ICU) তে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করাতে হবে, কারন সার্বক্ষনিক নিবিড় পর্যবেক্ষন এ রোগীর জীবন বাচানোর জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য্য। চিকিৎসার প্রথম এবং একমাত্র লক্ষ্য হলো যে রোগের কারনে ডি,আই,সি হয়েছে তার কারন নির্নয় করে প্রথমে তার চিকিৎসা করা এবং জটিলতা কমানো। এর পরের পর্যায়ের চিকিৎসা’র পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া নিয়ে অল্পকিছু মতভেদ থাকলেও যে সকল রোগীর প্লাটেলেটের মাত্রা বেশ কম থাকে তাদের অবশ্যই প্লাটেলেট Transfuse করতে হয়। কখনো কখনো রক্তজমাট না বাধার উপাদান (Anticoagulant) দিতে হয়; আবার ক্ষেত্র বিশেষে রক্ত জমাট বাধার উপাদান ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা (FFP- Fresh Frozen Plasma) ও দেয়া লাগতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এর পুরোটাই নির্ভর করবেন যে চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা’র দায়িত্বে আছেন তার বিবেচনার উপর। তবে এক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসকগন বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ীই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।
শেষ পর্যন্ত একটা কথা না বললেই নয় -ডি,আই,সি অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যুর ঠিক আগের অবস্থান টির নাম। যদিও অনেক ক্ষেত্রে শতকরা মাত্র ১০ ভাগ
থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত রোগী এর হাত থেকে বেচে আসতে পারেন তবুও কারো এ রোগ
হলে রোগীর আত্মীয় বা নিকটজনদের খুব সাহসী পদক্ষেপ ও অপরিসীম ধৈর্যের
পরিচয় ও বিচক্ষণতা রোগীর দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে এমনকি এই ২০১২ খৃষ্টাব্দেও মানুষ সব রোগ জয় করতে পারেনি, তাই বলে কেউ থেমে নেই। একটি ভালো আই,সি,ইউ তে সর্বদাই একদল সুদক্ষ চিকিৎসক ডি,আই,সি র সাথে লড়াই করার মানসিকতা নিয়ে সদা প্রস্তত থাকে। আপনার সহযোগীতা না পেলে যে কেউ হয়তো দুর্বল মূহুর্তে হাল ছেড়ে দিতে পারে, জীবনের মূল্য সর্বাধিক মনে করে মনে অসীম সাহস রাখুন। রোগ যেমন আছে নিরাময় ও তেমনি এর পাশাপাশি অবস্থান করে,তাই শক্ত হাতে হাল ধরে থাকুন।
বার্জারস ডিজিজ (Buerger’s Disease)
বার্জারস ডিজিজ মূলত ধুমপায়ীদের একটি রোগ। দরিদ্র, অশিক্ষিত
যুবক (বয়স ত্রিশ এর নীচে) যারা খালি পায়ে মাঠে বা রাস্তায় কাজ করে
তাদেরই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। অনেক সময়
রাস্তাঘাটে একধরনের অল্প বয়সের ভিক্ষুক দেখা যায় যাদের পায়ের আঙ্গুল বা
পাতার অর্ধেক অথবা হাটুর নীচের অংশ কাটা থাকে। এদের একটা বিশাল অংশ
বার্জারস ডিজিজ এর শিকার হয়ে ঐ পথ বেছে নিয়েছে।
বার্জারস ডিজিজ এ আক্রান্ত হয় মাঝারি মাপের ধমনীগুলো যা সাধারনত পা এবং হাতকে রক্ত সরবরাহ করে থাকে। অতিরিক্ত ধুমপান করার ফলে ধমনীর ভিতরের দিকে একধরনের প্রদাহ হয় এবং তা সরু হয়ে যেতে থাকে, এই প্রদাহ একসময় নিকটবর্তী স্নায়ু বা নার্ভেও (Nerve) ছড়িয়ে। এভাবেই ধীরে ধীরে তা বার্জারস ডিজিজ এ রুপান্তরিত হয়।
এই রোগের শুরুতে রোগী শুধু বেশ কিছুদূর হাটার পরে বা দৌড়ালে পায়ের মাংশপেশীতে (Calf muscle) ব্যথা অনুভব করে (Claudication pain), কিছুক্ষন বিশ্রাম নিলে আবার সেই ব্যথা ভালো হয়ে যায়। এ অবস্থায় ও রোগী যখন ধুমপান চালিয়ে যেতে থাকে রোগ ও তখন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। আগের তুলনায় কম দুরত্ব অতিক্রম করলেও তখন রোগীর পায়ে ব্যথা দেখা দেয়। এক সময় বসে থাকা বা বিশ্রাম নেয়া অবস্থায়ও রোগী ব্যথা (Rest pain) অনুভব করে। এই অবস্থায় রোগটি বেশ জটিল অবস্থায় চলে গেছে বলে ধরে নেয়া হয়। এ সময় রোগীর পা ধীরে ধীরে সরু ও ঠান্ডা হয়ে যেতে শুরু করে। রোগীকে রাত্রে তীব্র ব্যথা ও যন্ত্রনার কারনে নিদ্রাহীন ভাবে বিছানার পাশে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। একসময় পায়ে ঘা বা ulcer দেখা দেয় এবং পরিশেষে পচন (Gangrene) ধরে। এই গ্যাঙ্গরিন পায়ের আঙ্গুল থেকে ক্রমশ উপড়ের দিকে উঠতে থাকে এবং এক সময় মুল্যবান পা টি কেটে ফেলে দেবার (Amputation) মাধ্যমে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এরপরও যদি রোগী ধুমপান চালিয়ে যায় তবে আবার আগের সমস্যা গুলো শুরু হয় এবং একসময় উরুর (Thigh) মাঝ বরাবর পা কেটে ফেলে দিতে হয়।
বোঝাই যাচ্ছে যে বার্জারস ডিজিজ এর শেষ পরিণতি পঙ্গুত্ব বরণ করা। তারপরও কিন্ত রোগটির বেড়ে চলা থেমে থাকেনা। এজন্য রোগটি নিয়ন্ত্রনে বিশেষ কিছু নিয়ম ও উপদেশ মেনে চলতে হয়। যেমন ধুমপান ও তামাক ব্যবহার ত্যাগ করা, খালি পায়ে না থাকা, বিশেষ ধরনের জুতা ব্যবহার করা, জীবনযাত্রার ধারা পরিবর্তন করা, নিয়মিত কিছু অসুধ সেবন করা ইত্যাদি। রোগের শুরুতেই যত্নবান হলে রোগটির বেড়ে চলাকে সহজেই নিয়ন্ত্রন করা যায়। যে সকল রোগীকে পেশার কারনে অনেক দুরুত্ব অতিক্রম করতে হয় তারা সাইকেল ব্যবহার করে এই সমস্যা এড়াতে পারেন।
একসময় বার্জারস ডিজিজ এর জন্য পেট কেটে লাম্বার সিমপ্যাথেকটমি (Lumbar sympathectomy) অপারেশন করা হতো, কিন্ত তা স্থায়ী সমাধান দেয়না বলে এখন আর এর প্রচলন নেই। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে পায়ের ধমনীতে বাইপাস (Bypass) অপারেশন করে ভালো ফলাফল পাওয়া যেতে দেখা গেছে। ভাসকুলার সার্জন গন বার্জারস ডিজিজ এর স্থায়ী চিকিৎসা বাইপাস অপারেশন করে থাকেন।
রক্ত নালীর (Vascular) রোগীদের জন্য পরামর্শ
১. ধুমপান, জর্দা, তামাক পাতা, গুল, নস্যি জাতীয় দ্রব্য চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে।
২. কখনোই খালি পায়ে হাটা যাবেনা, জুতা
বা স্যান্ডাল ব্যবহার করতে হবে। ঘরের বাইরে পা ঢেকে থাকে এমন জুতা ব্যবহার
করাই শ্রেয়। সব সময় আরাম দায়ক নরম জুতা ব্যবহার করাই উত্তম।
৩. পা সব সময় শুকনো রাখতে হবে তাই গোসল বা অজুর পর যত্ন সহকার পা মুছে নিতে হবে।
৪. সাবধানে হাত ও পায়ের নোখ কাটতে হবে যেনো এ সময় কোথাও কোনো কাঁটা ছেড়া না হয়।
৫. নিজে নিজে হাত বা পায়ের কড়া (Corn) কাটা যাবেনা।
৬. হাটার সময় সাবধানে হাটতে হবে যাতে পায়ে কোনো আঘাত না লাগে।
৭. উচ্চ রক্ত চাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের রাখুন এবং রক্তের চর্বি স্বাভাবিক মাত্রায় রাখুন।
৮. মাইগ্রেন (Migraine) জাতীয় মাথা ব্যথা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত অসুধ খাবেন না এবং চিকিতৎসার পূর্বে তাকে অবহিত করবেন যে আপনার রক্তনালী রোগাক্রান্ত হয়েছে।
৯. কোলেষ্টরল জাতীয় খাবার যেমন ডিমের কুসুম, গরু-খাসীর মাংস, বড় চিংড়ি, মাছের মাথা, কলিজা, মগজ, ভুড়ি, নারিকেল, ঘি, মাখন ইত্যাদি পরিহার করুন।
১০. যে সকল রোগীর ভেরিকোস ভেইন (Varicose vein) রোগটি আছে তার একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বা পা ঝুলিয়ে অনেক্ষন বসে থাকার অভ্যাস পরিত্যাগ করুন। হাটার সময় ক্রেপ ব্যান্ডেজ (Crep bandage) বা ইলাস্টিকের মোজা (Elastic stockings) ব্যবহার করুন। ঘুমানোর সময় পায়ের নীচে বালিশ ব্যবহার করুন।
১১. হাটতে গেলে যদি পায়ের মাংশপেশীতে ব্যথা হয় তবে ধরে নিতে হবে আপনার রক্ত নালীতে রোগ থাকতে পারে।
১২. গলায়, পেটে, হাতে অথবা পায়ে যে টিউমার (নাড়ির গতির সাথে) লাফায় অথবা যা রক্ত নালীর খুব কাছাকাছি অবস্থিত তার চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ ভাসকুলার সার্জন এর সাথে যোগাযোগ করুন।
আর্টারিও ভেনাস ফিস্টুলা (Arterio Venous Fistula)
যখন শরীরের গহবর বিশিষ্ট দুটি অঙ্গের মধ্যে অস্বাভাবিক একটি পথ তৈরী হয় তাকে ফিস্টুলা বলে। ফিস্টুলা শরীরের অনেক অঙ্গেই হতে পারে, রক্তনালীর ধমনী (Artery) আর শিরার (Vein) মধ্যে
যখন এই ফিস্টুলা তৈরী হয় তখন তাকে এভি ফিস্টুলা বা আরটারিও ভেনাস ফিস্টুলা
বলে। এভি ফিস্টুলা জন্মগত একটি রোগ তবে আঘাত পেলেও কখনো কখনো এমনটি হবার
সম্ভাবনা থাকে। আবার জটিল কিডনি রোগে ডায়ালাইসিস করার জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবেই
এই ফিস্টুলা বানিয়ে নেয়া হয়।
ধমনী গুলো উচ্চ অক্সিজেন যুক্ত রক্ত বহন করে শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌছে দেয় আর শিরা গুলো উচ্চ কার্বন ডাই অক্সাইড যুক্ত রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে সংগ্রহ করে হৃদপিন্ডে নিয়ে যায়। যার ফলে এদের মধ্যে যখন ফিস্টুলা তৈরী হয় তখন এই ভারসাম্যটা নষ্ট হতে পারে এবং তাতে হার্ট এর কাজ অনেক বেড়ে যায়। তাই এভি ফিস্টুলা হলে তার চিকিৎসা করাতে হয়। বিশেষজ্ঞ ভাসকুলার সার্জনগন অপারেশনের মাধ্যমে এই ফিস্টুলা টি বন্ধ করে দিতে পারেন।
আবার জটিল কিডনি রোগ বা রেনাল ফেইলুর (Renal failure) হলে হেমোডায়ালাইসিস (Hemodialysis) করার জন্য অপারেশন করে কৃত্রিম ভাবে রোগীর হাতের কব্জির কাছে একটি এভি ফিস্টুলা তৈরী করে দেয়া হয়। ফিস্টুলা তৈরীর চার থেকে ছয় সপ্তাহ পরে এটি পরিপক্ক হয় এবং এটা দিয়ে হেমোডায়ালাইসিস করা যায়। বার বার ডায়ালাইসিস করায় এটি নষ্ট হয়ে গেলে হাতের আরো উপড়ের দিকে নতুন করে আরো একটি ফিস্টুলা তৈরী করে দিতে হয় এবং পুরোনো ফিস্টুলা টি বন্ধ করে দিতে হয়।
ভেরিকোস ভেইন
এটা শিরার (রক্তনালী) একটি রোগ। শরীরের কোনো অংশের শিরা যদি প্রসারিত হয়ে যায় অর্থাৎ দৈর্ঘে ও
প্রস্থে বড় হয়ে যায় তাকে ভেরিকোস ভেইন বলে। শতকরা প্রায় ২০ মানুষই এই
রোগে আক্রান্ত। সাধারণত পা এবং হাতের শিরায় এই রোগটি বেশী হতে দেখা যায়
তবে শরীরের যে কোনো স্থানের শিরায় ই এই রোগটি হতে পারে।
ভেরিকোস ভেইন রোগটি হবার নানাবিধ কারন আছে, সাধারনত ভেইন বা শিরার ভাল্ভ নষ্ট হয়ে যাবার কারনে এই রোগটি হয়। তবে শিরায় ইনফেকশন হলে, গর্ভাবস্থায়, পেটে টিউমার হলে বা পানি জমলে, পেশাগত কারনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে (ট্রাফিক পুলিশ) হলেও এ রোগটি হতে দেখা যায়।
পায়ের গোড়ালি থেকে হাটুর মধ্যবর্তি অংশে (সেফানাস ভেইন-Saphenous vein) ভেরিকোস ভেইন বেশী হতে দেখা যায়, এ রোগ হলে শিরা বরাবর রোগী ব্যাথা অনুভব করে। চামড়ার ঠিক নীচে মোটা মোটা ভেইন গুলো দেখতেও বেশ কদাকার মনে হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করালে পায়ে আলসার বা ঘা হয়ে যেতে পারে, পায়ের স্নায়ু নষ্ট হয়ে গ্যাঙ্গরিন হতে পারে। অল্প আঘাতেই এসকল শিরা থেকে রক্তপাত শুরু হবার সম্ভাবনাও খুব বেশী। প্রতিরক্ষা বাহিনী বা পুলিশ হিসেবে চাকরী করতে চাইলে ভেরিকোস ভেইন একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
অসুধ খেলে ভেরিকোস ভেইন ভালো হয়ে যাবার কোনো সম্ভাবনা নেই, অপারেশন ই এর একমাত্র চিকিৎসা। কোমড়ের নীচের অংশ অবশ করে এই অপারেশন করা হয়। স্ট্রিপার নামক একটি যন্ত্রের সাহায্যে ভাসকুলার সার্জন গন ঐ ত্রুটিযুক্ত শিরা টিকে তুলে নিয়ে আসেন।
ভেরিকোস ভেইন অপারেশনের আগে অবশ্যই জেনে নিতে হবে রোগীর ঐ পায়ের গভীর শিরা (Deep vein) টি ভালো আছে কিনা, অন্যথায় এই অপারেশন করা যাবেনা। এটা নির্ণয়ের জন্য রোগীকে অবশ্যই পায়ের ডুপ্লেক্স স্ক্যান পরীক্ষাটি করে নিতে হবে। ডিপ ভেইন ভালো না থাকা অবস্থায় এই অপারেশন করলে রোগীর পায়ের চরম ক্ষতি হবে।
ভেরিকোস ভেইন অপারেশনের পর পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ পড়তে হয়। অল্প কিছু বিরাম নেয়া ছাড়া প্রথম ৭-৮ দিন এটা পড়ে থাকতে হয়। এরপর প্রায় মাস তিনেক সারাদিন পড়ে থাকতে হয় এবং বিশ্রাম নেবার সময় বা রাত্রে খুলে রাখা যায়।
থ্রমবোএম্বোলিজম (Thromboembolilsm)
থ্রমবোএম্বোলিজম
ধমনীর (রক্তনালী) একটি রোগ। ধমনী হার্ট থেকে রক্ত শরীরের বিভিন্ন স্থানে
পৌছে দেয়। ধমনীর কোথাও যদি রক্ত জমে যায় তাহলে তার পরবর্তী অংশে রক্ত যেতে
পারেনা, ফলে
পুষ্টি এবং অক্সিজেনের অভাবে ঐ অংশটির মৃত্যু হয়। এই জমে যাওয়া রক্ত যদি
ছুটে দুরবর্তী কোনো ছোটো ধমনীতে আটকে যায় তাহলে তাকে থ্রমবোএম্বোলিজম বলে।
অনেক সময় বড় ধমনীতেও থ্রমবোএম্বোলিজম হয়।
যে অংগে (যেমন হাত, পা ইত্যাদি) এমনটি হয় তাতে হঠাৎ করে প্রচন্ড ব্যথা অনুভুত হয় এবং তা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যেতে শুরু করে এবং নীলচে কালো বর্ণ (Cyanosis) ধারণ করে। কালো বর্ণ ধারণ করার অর্থ ঐ স্থানের কোষগুলো আর বেচে নেই, তাই কালো হবার অনেক আগেই এই রোগের চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
রিউমেটিক ফিভার বা বাতজর জনিত হৃদরোগ, করোনারি হৃদরোগ, মহাধমনীতে চর্বি জমে যাওয়া (Atherosclerosis) বা অস্বাভাবিক প্রসস্থ হয়ে যাওয়া (Aortic aneurysm) প্রভৃতি কারনে ধমনীতে রক্ত জমে যেতে পারে। এসব জমাট রক্ত ছুটে থ্রমবোএম্বোলিজম হবার ৬ ঘন্টার মধ্যেই অপারেশন করে তা ছুটিয়ে দিতে হয়। বেশী দেরী করলে হাত-পা বা সংস্লিষ্ট অঙ্গটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং তা কেটে ফেলতে (Amputation) হতে পারে। অপারেশনের পর রোগী সুস্থ হয়ে গেলেও অনেক দিন রক্ত পাতলা করার বড়ি (ওয়ারফেরিন) খেতে হয়। তাই যেসব রোগীর রক্ত জমাট হয়ে যাবার প্রবণতা আছে তারা এই বড়ি সেবন করে এবং রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়ে এই রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
ডিভিটি - ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস
অনেক সময় বয়স্ক মানুষের পা হঠাৎ করে ফুলে ব্যথা শুরু হয়, লাল
হয়ে যেতে শুরু করে এবং নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাড়তে বাড়তে অনেক সময়
ব্যথা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। এমন একটি রোগের নামই ডিভিটি বা ডিপ ভেইন
থ্রম্বোসিস। যারা উড়োজাহাজে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন তাদের অনেকেরও এমনটি হতে
পারে। ইকোনোমি ক্লাশের যাত্রীদের এ রোগটি বেশী হয় বলে একে ইকোনোমি ক্লাশ
সিনড্রম (Economy class syndrome) ও বলা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো ডিভিটি মানুষের শিরার (রক্তনালী) একটি রোগ।
আমাদের শরীরে দুই ধরনের শিরা আছে, একদল থাকে শরীরের উপরিভাগে -চামড়ার নীচে যা আমরা খালি চোখে দেখতে পারি (Superficial vein)। আর একদল আছে যারা থাকে মাংশপেশীর গভীরে, যা বাইরে থেকে দেখা যায়না(Deep vein)। এরাই বেশিরভাগ রক্ত প্রবাহ হৃদপিন্ডে নিয়ে আসে। এই গভীরের রক্তনালীগুলোতে রক্ত জমাট বেধে গেলেই ডিভিটি হয়।
ডিভিটি
বা ইকনোমি ক্লাশ সিন্ড্রম হলে সাথে সাথেই চিকিৎসা শুরু করা উচিত। চিকিৎসা
শুরু করতে দেরি হলে এটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং পায়ে ঘা হয়ে যেতে
পারে। বেশী দেরি করলে এমনকি পা কেটে ফেলা দেবার ও প্রয়োজন পরতে পারে। এখান
থেকে জমাট রক্ত ছুটে ফুসফুসে গিয়ে মৃত্যু ঘটার নজির ও কিন্ত কম নয়।
ষাটোর্ধ বয়স, ক্যান্সার, মেদবহুল শরীর, গর্ভাবস্থা, জন্মনিয়ন্ত্রনের বড়ি খেয়েচলা, কোমড়ের বা হাটুর বড় অপারেশন করানো, দীর্ঘ সময় পা না নাড়িয়ে বসে থাকা ইত্যাদি নানা কারনে ডিভিটি হতে পারে। ডুপ্লেক্স (Duplex) স্ক্যান পরীক্ষার মাধ্যমে এটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব।
রক্তনালী বিশেষজ্ঞগন (Cardiovascular surgeon) এই
রোগের চিকিৎসায় রক্ত পাতলা করার জন্য রক্তনালীতে হেপারিন ইঞ্জেকশন দিয়ে
থাকেন। এছাড়া রোগ পরবর্তী সময়ে ওয়ারফেরিন ট্যাবলেট ও অন্যন্য রক্ত
পাতলাকারি অসুধ দিয়ে থাকেন। এই রোগীকে হাটা চলার সময় ক্রেপ ব্যান্ডেজ
নামক এক ধরনের বিশেষ আবরনী পায়ে পরে থাকতে হয়। ঘুমানোর সময় ক্রেপ
ব্যান্ডেজ খুলে শুতে হয় এবং পায়ের নীচে বালিশ দিয়ে পা সামান্য উচু করে
শুতে হয়।