নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা, কারন, চিকিৎসা ও পরামর্শ

সিফিলিস (Syphilis)

সিফিলিস রোগের জীবানুর নাম ট্রেপনোমা প্যালিডাম। সিফিলিস আক্রান্ত কারো সাথে যৌন মিলনে এই রোগ হয়ে থাকে, তবে রোগীর রক্ত গ্রহনের মাধ্যমেও এই রোগ হয়। আবার গর্ভাবস্থায় মায়ের সিফিলিস থেকে থাকলে সন্তান সেখান থেকে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ভূমিস্ট হয়ে থাকে। সাধারণত আক্রান্ত কারো সাথে যৌন মিলনের - সপ্তাহ পরে এই রোগের লক্ষন গূলো দেখা দেয়, তবে
কারো কারো ক্ষেত্রে মাস পর্যন্ত দেরী হতে পারে।

এটা শুরুতে পুরুষের যৌনাঙ্গের মাথায় বা শীস্নে হাল্কা গোলাপী র্ণের একটা দাগ হিসেবে দেখা দেয়। ধীরে ধীরে এটা বড় হয়ে ফোস্কা বা ঘায়ের মতো হতে থাকে। রোগ শুরুর মাসের মধ্যেও যদি চিকিসা না নেয়া হয় তবে যৌনাঙ্গের ঘা দ্রুত ছড়াতে থাকে এবং সেই সাথে জর মাথা ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয় এবং শরীরের বিশেষ করে কুচকীর গ্রন্থিগুলো বড় হয়ে যেতে থাকে। রোগ পায়ু-পথ, ঠোট, মুখ, গলনালী, খাদ্যনালী এমনকি শ্বাসনালীতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, অবশ্য এটা নির্ভর করে কোন পথে যৌনাচার করা হয়েছিলো তার উপড়।
অবস্থায় যদি কেউ চিকিৎসা নিতে অবহেলা করে তবে রোগটি খুবই জটিল আকার ধারন করে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এটি সুপ্ত অবস্থায় চলে যায় এবং বছর দুয়েক সুপ্ত থাকার পরে ভয়াবহ রুপে দেখা দেয়। এভাবে চিকিৎসাহীন থেকে গেলে পুরুষাঙ্গের মাথায় বিশাল আকৃতির বিশ্রী ক্ষত বা ঘা হয়, অবস্থা আরো জটিল হতে থাকে এবং এক সময় এই রোগ হৃদপিন্ড এবং মস্তিস্কে ছড়িয়ে পরে বা নিউরোসিফিলিস (Neurosyphilis) হয়, যা রোগীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে (যেমন VDRL, TPHA) এই রোগটি সনাক্ত করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়েই সিফিলিসের চিকিৎসা করানো উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পেনিসিলিন শ্রেনীর ঔষধ সেবন অথবা ইঞ্জেকশন গ্রহনে এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী বা যৌনসঙ্গী উভয়েরই চিকিৎসা নেয়া উচিত অন্যথায় এই ইনফেকশন সঙ্গীর কাছ থেকে আবার হতে পারে।


গনোরিয়া (Gonorrhoea)

যৌন বাহিত এই রোগটি নাইজেরিয়া গনোরি নামক একপ্রকার ব্যকটেরিয়ার কারনে হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে মিলনের -১০ দিন পর এই রোগের লক্ষন গুলো দৃষ্টিগোচর হয়। পুরুষের যৌনাংগ দিয়ে পুজ (Pus) বের হওয়া, প্রসাবে জ্বালাপোড়া এই রোগের উপসর্গ।
মহিলাদের যোনিপথ, মূত্রনালী গুহ্যদারে এই রোগ হয়। যদিও অনেক মহিলার ক্ষেত্রেই রোগটি কোনো লক্ষন প্রকাশ করেনা তবে প্রসাবে জ্বালাপোড়া, যোনিপথে স্রাব আসা (Vaginal discharge) এসব উপসর্গ নিয়ে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসকের দারপ্রান্তে উপস্থিত হয় সমকামীরা এই রোগে গুহ্যদারে আক্রান্ত হয়।
যৌনাংগ থেকে নিঃসৃত নির্যাস বা পুজ থেকে স্মেয়ার (Smear) বা স্লাইড তৈরী করে অথবা কালচার (Culture) করেও এর জীবানু সনাক্ত করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পেনিসিলিন বা সেফালোস্পোরিন জাতীয় অসুধ গ্রহনে এই রোগ ভালো হয়ে যায়। সঠিক সময়ে চিকিতৎসা না করালে পুরুষের শুক্রাশয় (Testes), মহিলাদের ডিম্বাশয় (Ovary), ডিম্বনালী এসব স্থানে প্রদাহ হয়ে রোগী বন্ধাত্ব বরণ করতে পারে। মায়ের এইরোগ থাকলে শিশু অপথাল্মিয়া নিওন্যাটারাম (Opthalmia neonataram) নামক চোখের প্রদাহ নিয়ে জন্ম নিতে পারে।


মেয়েদের ঋতুচক্র বা মাসিক

প্রতি চন্দ্রমাস পরপর হরমোনের প্রভাবে পরিণত মেয়েদের জরায়ু চক্রাকারে যে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায় এবং রক্ত ও জরায়ু নিঃসৃত অংশ যোনিপথে বের হয়ে আসে তাকেই ঋতুচক্র বলে।
এর তিনটি অংশ, ১মটি চারদিন স্থায়ী হয় (৪-৭ দিন) এবং একে মিনস্ট্রাল ফেজ, ২য়টি ১০দিন (৮-১০ দিন) একে প্রলিফারেটিভ ফেজ এবং ৩য়টি ১৪ দিন (১০-১৪ দিন)স্থায়ী হয় একে সেক্রেটরি ফেজ বলা হয়।
মিনস্ট্রাল ফেজ এই যোনি পথে রক্ত বের হয়। ৪-৭ দিন স্থায়ী এই রক্তপাতে ভেঙ্গে যাওয়া রক্তকনিকা ছাড়াও এর সাথে শ্বেত কনিকা, জরায়ুমুখের মিউকাস, জরায়ুর নিঃসৃত আবরনি, ব্যাকটেরিয়া, প্লাজমিন, প্রস্টাগ্লানডিন এবং অনিষিক্ত ডিম্বানু থেকে থাকে। ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের যৌথ ক্রিয়ার এই পর্বটি ঘটে।
প্রলিফারেটিভ ফেজ ৮-১০ দিন স্থায়ী হতে পারে। শুধু ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে এটি হয়। এই সময় জরায়ু নিষিক্ত ডিম্বানুকে গ্রহন করার জন্য প্রস্ততি নেয়।
সেক্রেটরি ফেজ টা সবচেয়ে দীর্ঘ, প্রায় ১০ থেকে ১৪ দিন। একে প্রজেস্টেরন বা লুটিয়াল ফেজ ও বলা হয়। এটিও ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন উভয় হরমোনের যৌথ কারনে হয়। এই সময় নিষিক্ত ডিম্বানুর বৃদ্ধির জন্য জরায়ু সর্বোচ্চ প্রস্ততি নিয়ে থাকে।
ডিম্বাশয়ের কোনো ডিম্বানু শুক্রানু দ্বারা নিষিক্ত না হলে জরায়ু আবার মিনস্ট্রাল ফেজে চলে যায়। এভাবেই পূর্ণ বয়স্ক মেয়েদের ঋতুচক্র চলতে থাকে।

জরায়ু-মুখ ক্যান্সার

জরায়ু বা বাচ্চাদানির সবচেয়ে নিচের অংশ হলো জরায়ু মুখ যা প্রসবের পথ বা যোনিতে গিয়ে মিশেছে। জরায়ুর বিভিন্ন অংশের মধ্যে এই অংশে ক্যন্সার এর আশংকা সবচেয়ে বেশি। অতিরিক্ত সাদাস্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, অতিরিক্ত অথবা অনিয়মিত রক্তস্রাব, সহবাসের পর রক্তপাত, মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবার পর পুনরায় রক্তপাত, কোমড়-তলপেট বা উড়ুতে ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গগুলো জরায়ু মুখ ক্যান্সার এর লক্ষণ। অল্পবয়সেই যারা যৌনাচারে অভ্যস্ত হয়ে থাকে তাদের এই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। একাধিক পুরুষ সঙ্গী থাকা, বা পুরুষ সঙ্গীটির একাধিক নারী সঙ্গী থাকা কিংবা ঘন ঘন বাচ্চা নেয়া ইত্যাদি কারনেও জরায়ূ মুখ ক্যান্সার হতে পারে। বাল্য বিবাহ হওয়া মেয়েদের এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেশী।
একদিন বা একমাসে হঠাৎ করে এই ক্যান্সার হয়না স্বাভাবিক কোষ থেকে জরায়ু মুখের ক্যান্সার হতে প্রায় ১০-১৫ বছর সময় লাগে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসার দ্বারা শতকরা ১০০ ভাগ রোগীই ভালো হয়ে যেতে পারে। রোগের শুরুতে উপসর্গ গুলো অল্পমাত্রায় থাকে দেখে একে কেউ গুরুত্ব দিতে চান না। এজন্য রোগীদের পক্ষে অনেক সময়ই প্রাথমিক পর্যায়ে আসা সম্ভব হয়না। দেরীতে আসলে রোগটি ছড়িয়ে পরে তখন জীবন বাঁচাতে বড় ধরনের অপারেশন এবং রেডিওথেরাপীর (Radiotherapy) প্রয়োজন হয় কিন্ত তাতেও পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয়না।
নিয়মিত পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে জরায়ু-মুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এই রোগ থেকে মুক্ত থাকতে যে সকল মহিলার বয়স ৩০ এর বেশী (বাল্য বিবাহ হলে ২৫ এর বেশী) তাদের প্রতি তিন বছর পর পর স্ত্রী রোগ চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য কর্মী দ্বারা জরায়ু মুখ পরীক্ষা করানো উচিত। ভায়া -VIA (Visual Inspection of Cervix with Acetic acid), প্যাপ স্মেয়ার (PAP smear) ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই রোগটি সনাক্ত করা সম্ভব।


কিশোরীর স্তন বিশাল বড় হয়ে যাওয়া

অনেক সময় কিশোরী বয়সে অর্থাৎ মেয়েদের বয়োসন্ধির সময় স্তন বিশাল বড় হয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক মেয়ে প্রথম গর্ভধারনের সময় ও এমন সমস্যায় পরতে পারে। বয়োসন্ধির সময় ইস্ট্রোজেন (Oestrogen) হরমোনের প্রভাবে মেয়েদের স্তন এর স্বাভাবিক পূর্ণতাপ্রাপ্তি ও বৃদ্ধি শুরু হয়। কোনো মেয়ের যদি এই ইস্ট্রোজেন এর প্রতি অস্বাভাবিক স্পর্শকাতরতা (altered sensitivity) থাকে তাহলে স্তনের এমন অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি শুরু হয়। এমনটি হলে স্তন এতো বড় হয়ে যায় যে বসা অবস্থায় দুই পাশের স্তনই মেয়েটির হাটু পর্যন্ত এসে পৌছতে পারে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুই পাশের স্তন এই সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই সমস্যাটি অস্বস্তিকর এবং অনেক সময় তা দৃষ্টিকটু হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাই এর চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন আছে। অনেক সময় ইস্ট্রোজেন বিরোধী (Antioestrogen) অসুধ ব্যবহার করে এই সমস্যায় ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। এতে যদি স্তন ছোটো হয়ে না আসে তা হলে রিডাকশন ম্যামোপ্লাস্টি (Reduction mammoplasty) নামক অপারেশন করিয়েই এর স্থায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।


স্তনের ক্যান্সার (Breast Cancer)


উন্নত বিশ্বে মধ্য বয়স্ক মহিলাদের মৃত্যুর প্রধান কারন হলো স্তন ক্যান্সার। অনুন্নত বিশ্বেও এই হার আশংকাজনক। যুক্তরাজ্যে প্রতি ১২ জন মহিলার ১ জন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। ২০ বছর বয়সের নীচের মহিলাদের এই ক্যান্সার হয়না বললেই চলে। পুরুষদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা খুবই কম (০.৫% )। উন্নত বিশ্বের আধুনিক খাদ্যাভ্যাস নাগরিকদের অনেক সমস্যায় ফেলে, স্তন ক্যান্সার সেই খাদ্যাভ্যাসের কারনেই পশ্চিমা বিশ্বে বেশী দেখা যায় বলে ধরা হয়। বলে রাখা ভালো জাপান উন্নত বিশ্বের তালিকায় থাকলেও সেখানে স্তন ক্যান্সার কিন্ত ইউরোপ আমেরিকার মতো অতো বেশী নয়। তবে যেকোনো দেশেই অতিরিক্ত মদ্যপায়ীদের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার হার যে অনেক বেশী এটা এখন একটা পরীক্ষিত সত্য। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, যে সকল মা তাদের সন্তান কে নিয়মিত স্তন্য পান করিয়েছেন তাদের স্তন ক্যান্সার হবার হার তুলনামুলক হারে অনেক কম, তেমনি যে সকল মা কম বয়সে বাচ্চা নিয়েছেন এবং যেসকল মহিলার মাসিক একটু দেরিতে শুরু হয়েছে (Late menarche) এবং আগে বন্ধ হয়ে গেছে (Early menopause) তাদের মধ্যেও এই হার বেশ কম।
অন্য দিকে যে সকল মহিলা একটিও সন্তান নেননি অথবা যারা menopause এর পরে স্থুলকায় (Obese) হয়ে গেছেন তাদের এই ক্যান্সার হবার হার তুলনামুলক হারে বেশী।
সমীক্ষা যাই বলুক না কেন ৩০ বছরের পরে যে কোনো মহিলারই নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করে দেখা উচিত তার স্তনে গোটার মতো কিছু পাওয়া যায় কিনা। এই জন্য আয়না (Mirror) এর সামনে দুই বুক খুলে দাঁড়িয়ে নিজে নিজেই তা ভালো করে চেপে পরীক্ষা করে দেখা উচিত এবং সন্দেহ জনক কিছু পাওয়া গেলে সাথে সাথে Breast surgeon এর সাথে যোগাযোগ করা উচিত। এই পরিস্থিতিতে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা ম্যামোগ্রাম পরীক্ষা করিয়ে স্তন এ টিউমার আছে কিনা তা নিশ্চিত করা উচিত। টিউমার থাকলে তা ক্যান্সার না নিরীহ শ্রেনীর তা ১০০% নিশ্চিত করতে অবশ্যই বায়োপসি করে হিস্টপ্যাথলজি করতে হবে।স্তন পরীক্ষা
শুরুতে স্তন ক্যান্সার একটা ছোট্ট দানার মতো হাতে লাগতে পারে তবে অনেক সময় তা হাতে নাও লাগতে পারে। অনেক সময় এই রোগে স্তনের বোটা বা নিপ্যল (Nipple) কিছুটা ভিতরের দিকে ঢুকে যায় (Nipple retraction), কারো কারো আবার টিউমারের ঠিক উপরের স্তনের ত্বক কমলার খোসার মতো ছিদ্র ছিদ্র আকার ধারন করে (Peau d’orange)। এসব চিহ্ন স্তন ক্যান্সার যে বেশ অগ্রবর্তী পর্যায়ে চলে গেছে তা নির্দেশ করে। তবে এই ক্যান্সার অগ্রবর্তী হলে গোটার মতো টিউমারটি বুকের মাংসপেশীর সাথে লেগে যায় এবং বুকে ব্যথা করতে থাকে সেই সাথে বগলের লসিকা গ্রন্থিগুলো (Lymph node) ফুলে বড় হয়ে উঠতে থাকে। রোগের এক পর্যায়ে রোগীর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়, তিনি দ্রুত ওজন হারাতে থাকেন, সেই সাথে ক্ষুদামন্দা, বমি বমি ভাব, ফুসফুসে পানি জমে শ্বাস কষ্ট, লিভার আক্রান্ত হয়ে পেটে পানি জমা এই সমস্যা গুলোও একে একে যোগ হতে থাকে।
জেনে রাখা ভালো যেদিন প্রথম স্তন ক্যান্সার ধরা পরলো সেদিন সম্ভবত তা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরেছে। স্তন ক্যান্সার খুব দ্রুত হারে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরতে পারে, তাই রোগের সন্দেহ হবার পরপরই এর চিকিৎসা শুরু করা উচিত। এমন কোনো অসুধ এখনো আবিস্কৃত হয়নি যা স্তন ক্যান্সার কে পুরোপুরি ভালো করে দিতে পারে, তবে বিভিন্ন মডালিটির চিকিৎসা একই সাথে চালিয়ে গেলে এই রোগ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ার পরপরই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন রোগীকে একই সাথে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কেমোথেরাপি / রেডিওথেরাপি (নিওএডজুভেন্ট থেরাপি) শুরু করে প্রথমেই রোগটিকে নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেন। এরপর অবস্থা বুঝে অপারেশন করে টিউমার আক্রান্ত পুরো স্তন (Mastectomy) এবং সেইসাথে বগলের লিম্ফ গ্রন্থি ফেলে দেয়া হয়। এর পরে রোগীকে নির্দিষ্ট মাত্রার রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি দিয়ে রোগীর দেহ থেকে ক্যান্সার আক্রান্ত সকল কোষ মেরে ফেলার পদক্ষেপ নেয়া হয়। তবে চিকিৎসার এই পদক্ষেপ গুলো নির্ভর করে রোগী ক্যান্সার এর কোন পর্যায়ে চিকিৎসক এর কাছে এসেছে তার উপর। বেশী দেরি করে আসলে এর কার্যকরী চিকিৎসার সুযোগ একদমই কমে আসে।
স্তন ক্যান্সার এর কেমোথেরাপি তে টেমোক্সিফেন, সাইক্লোফসফামাইড, টেক্সেডিওল, ক্যাপাসিটাবিওন, এনস্ট্রাজল ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের হরমোন বা বিষ জাতীয় অসুধ বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। এসব নির্ভর করে রোগীর কোন ধরনের ক্যান্সার হয়েছে এবং সেই ক্যান্সার কোষের স্পর্শকাতরতার উপর। এসব অসুধ বেশ ব্যয়বহুল এবং এদের কার্যকারিতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ভিন্ন ভিন্ন বটে, তাই সব রোগীকে একই ধরনের অসুধ দেয়া সম্ভব হয়না। তাই রোগীর উচিত চিকিৎসার শুরুতেই এসব ব্যাপারে খোলামনে তার চিকিৎসক এর সাথে আলাপ করে নেয়া।
পরিবারে মা, খালা, ফুপু, বড় বোন এমন কারো স্তন ক্যান্সার থেকে থাকলে অন্য সদস্যদের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে, তাই এসব ক্ষেত্রে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। এসব পরিবারের সদস্যাদের অল্প বয়স থেকেই নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করানো উচিত এবং দীর্ঘায়ু হবার লক্ষে স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ার সাথে সাথেই স্তনের অপারেশন সহ অন্য চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো দ্রুত গ্রহন করা উচিত।
স্তন ক্যান্সার হবার পরে অপারেশন করানো এবং কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নেবার পরও রোগী পুরোপুরি মৃত্যুর ঝুকি থেকে মুক্ত হয়ে যায়না যদিও সব ধরনের উপসর্গ থেকে তিনি মুক্ত থাকতে পারেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে সাধারনত রোগের যে সকল অবস্থায় বা স্টেজ (stage II/III) এ রোগীরা চিকিৎসক এর কাছে আসেন তার পুর্নাঙ্গ চিকিৎসা করা হলেও রোগীর ৫ বছর বেচে থাকার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৫০ থেকে ৭০ ভাগ। খুব প্রাথমিক অবস্থায় বা স্টেজ (stage I) এ আসলে এটা বেড়ে ৮৫% পর্যন্ত হতে পারে তেমনি খুব শেষ পর্যায় (stage IV) এ আসলে ৫ বছর বাচার সম্ভাবনা কমে গিয়ে থাকে মাত্র ২৫%।
তাই পরিশেষে এই বলতে হয় স্তন ক্যান্সার বেশ খারাপ ধরনের একটি রোগ, এ রোগ হওয়া অর্থ মৃত্যু ঘনিয়ে আসা, তবে কেউ যদি খুব প্রাথমিক পর্যায়ে এই রাগের চিকিৎসা নিতে পারেন তার দীর্ঘায়ু হবার সম্ভাবনা খুব প্রবল। তাই প্রত্যেক পরিণত মহিলার উচিত নিয়মিত স্তন পরীক্ষা করে দেখা এবং কোনো প্রকার সন্দেহ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।

স্তন টিউমার / ফাইব্রোএডেনোমা (Fibroadenoma)

১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের মেয়েদের পরিণত স্তনে গোটা উঠার মতো যে
ফাইব্রোএডেনোমা
টিউমার হয় তা সাধারনত ফাইব্রোএডেনোমা। এটা খারাপ কোনো টিউমার বা ক্যান্সার নয়। একে স্তনের নিরীহ টিউমার (Benign breast tumour) বলা হয়। সাধারণত এই টিউমারটি ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয় এবং খুব কম ক্ষেত্রেই তা ৫ সে.মি অতিক্রম করে। এটি ২৫ উর্ধ্ব মহিলাদের ও হতে পারে, তাই স্তনে কোনো টিউমার হলে আগেই জেনে নেয়া ভালো এটা ক্যান্সার না ফাইব্রোএডেনোমা। ফাইব্রোএডেনোমার হলে এর জন্য কোনো চিকিৎসা নেবার প্রয়োজন হয়না একবার বায়োপসি করে শুধু নিশ্চিত হতে হয় যে এটা ক্যান্সার জাতীয় কোনো টিউমার নয়তবে কেউ যদি অস্বস্তি বোধ করে অথবা কারো মনে সন্দেহের বীজ যদি তাকে অস্থির করে তোলে তাহলে কসমেটিক সার্জন দিয়ে এটি অপারেশন (Enucleation) করিয়ে নেয়াই ভালোবয়োসন্ধির সময় অনেক ফাইব্রোএডেনোমা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে এবং সে.মিচেয়ে বড় হয়ে যেতে পারেএই পরিস্থিতিতেও অপারেশন করিয়ে অস্বস্তির হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যেতে পারে

ঋতুচক্রে স্তনে ব্যথা বা সাইক্লিকাল মাস্টালজিয়া

অনেক মেয়েরাই ঋতুচক্রের সময় তাদের স্তনে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। একে মাস্টালজিয়া বলা হয়। এ ধরনের ব্যথার কারনে তার স্বাভাবিক জীবন যাত্রা অনেক সময় অচল হয়ে পরে, মেয়েটি নিদ্রাহীনতায় ভোগে এবং তার স্বাভাবিক যৌন জীবনও ব্যাহত হয়। মাস্টালজিয়া এসব মেয়েদের মনে তীব্র ভীতির সঞ্চার করে থাকে।
অনেক মেয়েই ধারনা করে যে স্তনের এই ব্যথা বুঝিবা স্তন ক্যান্সার এর কারনে হয় কিন্ত তাদের এই ধারনা একদমই ঠিক নয়।ঋতুচক্র বা মাসিকের সময় ইসট্রোজেন হরমোনের প্রতি তাদের স্তনের বাড়তি স্পর্শকাতরতার কারনেই অনেক সময় এই সমস্যাটির সৃষ্টি হয়। স্তন ক্যান্সার বা অন্য কোনো জটিল রোগে এমন ব্যথা হবার কোনোই সুযোগ নেই।
কারো মাস্টালজিয়া হচ্ছে চিন্তা করলে চিকিৎসকের (ব্রেস্ট সার্জন) পরামর্শ নেয়া উচিত। এই সময় মেয়েটিকে সারাদিন একদম সঠিক মাপের (Appropriately fitting) একটি ব্রা (Supportive bra) পরে থাকতে হয় এবং রাতের বেলা একটি তুলতুলে নরম ব্রা (Sports bra) পরে থাকতে হয়। এসময় কফি পান করলে ব্যথার তীব্রতা বাড়তে পারে তাই এই সকল পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে।
চিকিৎসক শুরুতেই জানতে চাইতে পারেন মাসের ঠিক কয়দিন এবং কি মাত্রায় এই ব্যথা থাকে। তাই ভুক্তভোগীকে অবশ্যই এর সঠিক বর্ণনা দিতে হবে। প্রথমেই মনে রাখতে হবে এটা কোনো রোগ নয়, শুধু একটি উপসর্গ, এজন্য স্তন বা মেয়েটি কারোরই কোনো ক্ষতি হচ্ছেনা। ব্যথার স্থায়ী নিবারনের জন্য চিকিৎসকগন অয়েল অব ইভিনিং প্রিম্রোজ নামক একধরনের অসুধ তিন মাসের জন্য সেবন করার উপদেশ দিয়ে থাকেন এবং এতে ৩৫ উর্ধ্ব বেশীর ভাগ মহিলাই ভালো অনুভব করেন। যাদের খুব তীব্র ব্যথা থাকে তাদের ইস্ট্রোজেন বিরোধী অসুধ যেমন ডানাজল বা টেমোক্সিফেন অথবা প্রলাকটিন বিরোধী ব্রোমোক্রিপটিন বা এল,এইচ,আর,এইচ এগোনিস্ট সেবন করার পরামর্শ দেয়া হয়।
যাদের স্তনের ব্যথা ঋতুচক্রের সাথে সম্পর্কিত নয় তাদের চিকিৎসা কিন্ত ভিন্ন। এসব মহিলার ক্ষেত্রে প্রথমেই জেনে নিতে হবে এটা সত্যি সত্যিই স্তনের ব্যথা না বুকের মাংশ পেশী বা অন্য কোথাও এর উৎস। যদি সত্যিই স্তনের ব্যথা হয় তাহলে অবশ্যই স্তন বায়োপসি করে নিশ্চিত হতে হবে যে তার স্তন ক্যান্সার হয়নি। এটা নিশ্চিত করতে পারলে এসব ক্ষেত্রে ব্যথানাশক অসুধ সেবন অথবা ব্যথার স্থানে অবশ করা ইঞ্জেকশন ব্যবহার করে এই সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়া যেতে পারে।



স্তনের বোটা ভেতরে ঢুকে যাওয়া

বয়োসন্ধিতে স্তনের পরিপূর্ণতা ও বৃদ্ধির সময় অনেক মেয়ের স্তনের বোটা (Nipple) স্তনের ভিতরের দিকে ঢুকে যায়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শুধু একপাশের স্তন এই ধরনের সমস্যায় পরে। এর জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। সাধারণত গর্ভধারন অথবা দুগ্ধদানের সময় নিজে নিজেই এই সমস্যা ভালো হয়ে যায়। যদি দুগ্ধদানের সময় এই সমস্যা ভালো না হয়ে যায় সেক্ষেত্রে তা শিশুকে দুগ্ধদানে বাধা সৃষ্টি করে। একধরনের মেকানিকাল সাকশন ডিভাইস ব্যবহার করে এই সমস্যা থেকে পরিত্রান পাওয়া যেতে পারে। তাতেও কাজ না হলে কসমেটিক সার্জারির মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব কিন্ত এতে অনেক সময় স্তনের ডাক্ট কেটে যেতে পারে এবং তখন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
পরিণত বয়সে নতুন করে কারো স্তনের বোটা ভিতরে ঢুকে যাওয়া স্তনের আভ্যন্তরিন জটিল কোনো সমস্যা নির্দেশ করে থাকে। ডাক্ট এক্টেশিয়া, মাসটাইটিস বা টিউমার হলে এমনটি হতে পারে। অনেক সময় ক্যান্সার হলেও নতুন করে স্বাভাবিক স্তনের বোটা ভিতরের দিকে ঢুকে যেতে পারে। তাই পরিণত বয়সে নতুন করে এই সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হতে হবে।



স্তনের ফোড়া / ইনফেকশন

স্তনের ফোঁড়া বা ইনফেকশন হওয়া রোগটি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দুগ্ধদানকারী মায়েদের হঠাৎ করে হয়ে থাকে। তবে অন্য সময়ও এ রোগটি হতে পারে। স্তনে জোরে আঘাত পেয়ে রক্ত জমে যাওয়া, স্তনের বোটায় শিশুর বা অন্য কারো কামড়ে দেয়া বা অন্য কোনো ঘা থেকেও এমনটি হতে পারে। জন্মগত ভাবে যে সকল মহিলার স্তনের বোটা ভেতরের দিকে থাকে (Nipple retraction) তাদের এই রোগ হবার হার অনেক বেশী। তবে এই রোগটি ব্যাকটেরিয়া জনিত একটি রোগ এবং স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস (Staphylococcus aureus) নামক ব্যাকটেরিয়াটিই এই রোগ ঘটানোর জন্য মুলত দায়ী
রোগ হলে স্তনে টনটনে ব্যথা হয়, স্তন গরম হয়ে যায়, কিছুটা লালচে বর্ণ ধারন করে এবং ফুলে যায়অনেক সময় স্তনের ত্বক টানটান হয়ে চকচকে হয়ে যায় এবং স্পর্শ করলেই তা ব্যথার উদ্রেক করে
শুরুতেই এই রোগ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসলে তার পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক খেলে রোগটি নিয়ন্ত্রিত থাকেএই সময় স্তনটিকে বিশ্রামে রাখতে হয় এবং তা থেকে শিশুকে দুগ্ধদান বন্ধ রাখতে হয়, তবে ব্রেস্ট পাম্প নামক যন্ত্রের সাহায্যে দুগ্ধ বের করে ফেলতে হয়শিশুটি এই সময় অন্য পাশের স্তন থেকে দুগ্ধপান করতে পারেসাধারনত এন্টিবায়োটিক শুরুর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ইনফেকশন নিয়ন্ত্রনে চলে আসে এবং এটি অনেক সময় একটি চাকার মতো হয়ে জমে যায়এমনটি হলে তা থেকে পরবর্তীতে আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখে সিরিঞ্জের মাধ্যমে পাজ (Pus) বের করে দিতে হয়৪৮ ঘন্টার মধ্যেও যদি অসুধ কাজ না করে তাহলে অপারেশন এর মাধ্যমে Pus বের করে দিতে হয়

স্তনের লাইপোমা (Lipoma of the Breast)

এটা স্তনের একটি নিরীহ টিউমার, স্তনে এই ধরনের টিউমার খুব একটা হতে দেখা যায়না। স্তনে অবস্থিত পরিণত চর্বি কোষ এর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারনে এই টিউমারটি হতে পারে। টিউমারটি রোগীর মনে অস্বস্তি এবং আতংক সৃষ্টি করতে পারে তাই বায়োপসি করে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে এটা লাইপোমা। লাইপোমা হলে এর জন্য কোনো চিকিৎসা নেবার প্রয়োজন হয়না। তবে রোগী খুব অস্বস্তি বোধ করলে breast surgeon বা কসমেটিক সার্জন দ্বারা অপারেশন (Enucleation) করিয়ে নিতে পারেন।

স্তন বোটার প্যাজেটস রোগ

অনেক সময় স্তনে ক্যান্সার হলে এর বোটা বা নিপল এ পাঁচড়ার মতো একধরনের ঘা হয়। একজিমা হিসেবে দীর্ঘদিন এর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হলেও তা নিপল বা এর চারপাশের গাঢ় বর্নের ত্বক (Areola) থেকে সেরে যায়না। একসময় নিপল এর ক্ষত (Erosion of nipple) বাড়তে থাকে এবং তা স্তনের গা থেকে খুলে পরে যায় (disappear) । ঐ একজিমা যে স্তন ক্যান্সার এর কারনে হচ্ছিল তখন সেটাও পরিস্কার হয়ে উঠে। তাই স্তনের বোটায় কখনো একজিমা হয়েছে সন্দেহ হলে অবশ্যই তার বায়োপসি করিয়ে দেখা উচিত অন্যথায় তা রোগীর জীবন বিপন্ন করে তুলতে পারে।

স্তনের টিবি রোগ (Tuberculosis of the Breast)

টিবি (TB) শব্দটি আসলে একটি সংক্ষিপ্ত রূপ। এর পূর্ণ রূপ হল Tubercular bacilli, যা আসলে Mycobacteria tuberculosis নামক জীবানু বা ব্যাকটেরিয়ার অপর একটি নাম। তবে টিবি শব্দটি দ্বারা কারো ঐ জীবানু দিয়ে রোগটি হয়েছে বলে বোঝানো হয়। বাংলায় অবশ্য টিবি হয়েছে বললে যক্ষা রোগ হয়েছে বলেই বোঝায়
টিবি রোগটি শরীরের যেকোনো অঙ্গেই হতে পারেস্তন তার ব্যতিক্রম নয়, যদিও স্তনে এই রোগ হবার কথা খুব বেশী শোনা যায়নাতবে কারো ফুসফুসে যদি যক্ষা থেকে থাকে বা টিবির জীবানু জীবিত ও কার্যকর থেকে থাকে তাহলে তার স্তনে টিবি হবার সম্ভাবনা থাকতে পারে। স্তনে টিবি হলে তা অনেকগুলো ফোঁড়ার মতো একসাথে দেখা দেয় এবং এই ফোঁড়া (Abscess) গুলোর চারপাশের ত্বক নীলচে হয়ে যায় এবং কোনো এন্টিবায়োটিক অসুধেই এরা ভালো হতে চায়না। তখন এই সকল ফোঁড়ার পাজ / পুজ (Pus) পরীক্ষা করে টিবির জীবানুর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়।
সাধারনত টিবির অসুধ সেবনেই এই রোগ ভালো হয়ে যায় যদিও এর জন্য অনেক সময় লাগতে পারেতবে কেউ যদি শুধু অসুধে পুরোপুরি ভালো না হয় বা বার বার এই ফোড়া হতেই থাকে তাহলে তাকে অবশ্য ব্রেস্ট সার্জন দ্বারা অপারেশন (Mastectomy) করে স্তন ফেলে দিতে হতে পারে।


এমাজিয়া (Amazia)

এমাজিয়া স্তনের একধরনের জন্মগত ত্রুটি এর অর্থ হলো জন্মগত ভাবে কারো স্তন তৈরী না হওয়াএমাজিয়া বুকের একপাশে অথাবা উভয় পাশেই হওয়া সম্ভবমহিলাদের অপেক্ষা পুরুষরাই এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা বেশীঅনেক সময় স্তনের পাশাপাশি এর ঠিক নিচের মাংশপেশীও জন্মগত ভাবে অনুপস্থিত থাকতে পারে, তখন একে পোলান্ড সিনড্রম বলা হয়

ফাইলডস টিউমার (Phyllodes Tumour)

এটা স্তনের নিরীহ ধরনের একটি টিউমার, সাধারনত ৪০ উর্ধ্ব মহিলারা এমন স্তন টিউমারে বেশী আক্রান্ত হন তবে এর চেয়ে কম বয়সেও এ রোগটি হতে পারে। অনেক সময় দ্রুত বাড়ার কারনে এটি স্তনের ত্বকে আলসার সৃষ্টি করে থাকে এবং তা খুব ভয়াবহ দেখায়। নিরীহ শ্রেনীর টিউমার হলেও এই টিউমার টির ক্যান্সারে রূপান্তরিত হবার সুযোগ আছে। এসব কারনে অপারেশন (Enucleation) এর মাধ্যমে এই টিউমারটি অপসারন করে ফেলা ভালো এবং একই সাথে তা বায়োপসি করে দেখা উচিত যে এর ভেতরে ক্যান্সার এর কোনো বীজ আছে কিনা। খুব বড় আকারের ফাইলডস টিউমার হলে বা ইনিউক্লিয়েশনের পর আবার টিউমার হলে অথবা এতে ক্যান্সার এর বীজ আছে সন্দেহ হলে অপারেশন করে স্তন ফেলে দেয়াই (Mastectomy) ভালো।


পলিমাজিয়া (Polymazia)

পলিমাজিয়া স্তনের এক ধরনের জন্মগত ত্রুটি। এটা ধরনের ত্রুটিযুক্ত ব্যক্তি বা মহিলার দুই এর অধিক স্তন থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুল স্তনের পাশে দুই বগল (Axilla) এ অতিরিক্ত স্তন দুটি থাকে। এছাড়া অনেকের কোমড়ের কুচকি (Groin), নিতম্ব (Buttock) অথবা উরুতেও (Thigh) এরা অবস্থান করতে পারে। গর্ভপরবর্তি মহিলারা দুগ্ধ দানের সময় এই বাড়তি স্তন থেকে দুগ্ধ উৎপাদিত হতে দেখা যায়। এই বাড়তি স্তন কারো সমস্যা করে থাকলে তা সার্জারি করে কাটিয়ে নিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে যায়।


গ্যালাকটোসিল (Galactocele)

এটা স্তনের সিস্ট (Cyst) জাতীয় একটি টিউমার, যা নিরীহ শ্রেনীর একটি রোগ। খুব বেশী মহিলাকে এই রোগে ভূগতে দেখা যায়না। স্তনের বোঁটার পাশের গাঢ় (Areola) অংশের ঠিক নিচে ছোট্ট একটি দানার মতো এটা শুরু হয়। এর বিশেষত্ব হচ্ছে মা যেদিন প্রথম স্তন্য দান শুরু করেন সেদিন থেকেই এই সিস্ট এর আবির্ভাব ঘটে এবং আস্তে আস্তে এটা বড় হতে থাকে। আসলে এই সিস্ট এর ভেতরে দুধ জমা হয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। এভাবে বাড়তে বাড়তে এটা একসময় বিশাল আকার ধারন করতে পারে এমনকি স্তন বড় হয়ে রোগীর হাটু পর্যন্ত চলে আসতে পারে।
তাই শুরুতেই এর চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। এজন্য প্রথমেই সিস্ট টিকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়ে এর অবস্থান নিশ্চিত করে সিরিঞ্জের একটি সুই ঢুকিয়ে Aspiration করা হয়। সিস্ট খুব বড় হলে অবশ্য আল্ট্রাসনোগ্রাম করা নাও লাগতে পারে। Aspiration এ প্রাপ্ত তরল পরীক্ষা করলেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটা গ্যালাকটোসিল। অনেক সময় শুধু এসপিরেশনের করলেই সিস্ট জাতীয় অসুখ ভালো হয়ে যায়। তবে এটা যদি বার বার হতে থাকে বা ভালো না হয় তা হলে কসমেটিক সার্জন বা ব্রেস্ট সার্জন দিয়ে অপারেশন করে বের (Excision) করে দিতে হয় এবং বায়োপসি ও হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করাতে হয়।

সদ্যজাত শিশুর স্তন্যদান (Witch’s milk)

শিশুর জন্মের তৃতীয় অথবা চতুর্থ দিনে অনেক সময় সদ্যপ্রসুত শিশুটির স্তন একটু বড় বড় মনে হয়। এই সময় স্তনে হাল্কা একটু চাপ দিলে তা থেকে স্বচ্ছ পরিস্কার এক ধরনের তরল পদার্থ বের হয়ে আসে। এর কিছুদিন পর অনেক সময় শিশুর স্তন থেকে দুগ্ধবর্নের তরল (Milk) বের হয়ে আসে। জন্মের তৃতীয় সপ্তাহের পর থেকে এই ধরনের সমস্যা থেকে শিশুটি নিস্তার পায়। অনেক আগে একে যাদুকরীর যাদু হিসেবে ধরা হতো এবং একে ডাইনীর দুধ বলা হতো। প্রকৃতপক্ষে মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের প্রলাকটিন (Prolactin) নামক হরমোন শিশুর রক্তে চলে আসায় তা শিশুর স্তনকে প্রভাবিত করে এবং শিশুটি এই সমস্যাটির সম্মুখীন হয়। এই সমস্যাটি নিজে নিজেই চলে যায়, এর জন্য কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। ছেলে এবং মেয়ে শিশু উভয়েই এই সমস্যাক্রান্ত হতে পারে যদিও এর হার খুবই নগন্য।



গাইনিকোম্যাশিয়া (Gynaecomastia)

ছেলেদের স্তন বড় হয়ে যাওয়াকে গাইনিকোম্যাশিয়া বলে। বয়োসন্ধির সময় ইসট্রোজেন হরমোনের উদ্দিপনায় মেয়েদের স্তনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে, এন্ড্রোজেন নামক হরমোন এটি হতে বাধা দেয়। এন্ড্রোজেন এর প্রভাবে একজন বালক পুরুষে রুপান্তরিত হবার দিকে এগিয়ে যায়। কোনো কারনে বালকদের দেহে এন্ড্রোজেন অপেক্ষা ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বেশী হলে তাদের স্তন মেয়েদের মতো আকারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
বালক বয়সের গাইনিকোম্যাশিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই কারন অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে তা নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়। তবে কোনো ছেলে শিশুর যদি পৌরুষত্ব তৈরীর হরমোন গুলোর উৎপাদন ব্যহত হয় বা হরমোন উৎপাদনের অঙ্গগুলো পরিণত না হয় (Hypogonadism) তা হলে গাইনিকোম্যাশিয়া হবার সাথে সাথে তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ ও মেয়েদের মতো হয়ে যেতে শুরু করে।
পরিনত পুরুষের একপাশে গাইনিকোম্যাশিয়া হলে ধরে নেয়া হয় তার স্তন ক্যান্সার হয়েছে এবং তা নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত। পুরুষের দুই পাশেই গাইনিকোম্যাশিয়া হলে আগে জেনে নিতে হয় তিনি ডিগক্সিন, সিমেটিডিন, স্পাইরেনোল্যাকটোন বা অন্য কোনো হরমোন জাতীয় অসুধ খাচ্ছেন কিনা। এই অসুধ গুলো দীর্ঘদিন ধরে খেলে গাইনিকোম্যাশিয়া হতে পারে।
অতিরিক্ত চর্বিহবহুলতার কারনে অনেক সময় স্তন বড় দেখাতে পারে কিন্ত মনে রাখতে হবে গাইনিকোম্যাশিয়া হলে স্তন শুধু আকারে বড় হয়না এর ভেতরে দুগ্ধ তৈরীর গ্রন্থিগুলোও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই একজন চিকিৎসক হাত দিয়ে ভালো করে টিপে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারেন তার রোগীর গাইনিকোম্যাশিয়া হয়েছে কিনা। গাইনিকোম্যাশিয়া হবার সন্দেহ হলে এর কারণ বের করার জন্য টেসটোস্টেরন (Testosterone), লিউটেনাইজিং হরমোন (Leutinizing hormone), ইস্ট্রাড্রিয়ল(Oestradiol), প্রলাকটিন(Prolactin), হিউমান কোরিওনিক গোনাডোট্রোপিন (Human chorionic gonadotrophin) ইত্যাদি হরমোনের রক্তের মাত্রা নির্ণয় করে দেখা হয়।
পুরুষের শুক্রাশয় (Testes) স্বাভাবিক থাকলে এবং উপরোল্লিখিত কোণো অসুধ খাবার ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও যদি গাইনিকোম্যাশিয়া হয় তা হলে তা কোনো অসুধে ভালো করা সম্ভব নয়। বড় স্তন যদি দৃষ্টিকটু লাগে বা অন্যান্য সমস্যার সৃষ্টি করে তাহলে তা কসমেটিক সার্জন বা প্লাস্টিক সার্জন কতৃক অপারেশন করিয়ে নেয়াই ভালো।


^উপরে যেতে ক্লিক করুন