নবজাতকের নাভীর ইনফেকশন
নবজাতকের নাভী দিয়ে যদি সাদা দুর্গন্ধযুক্ত পুজের মতো কিছু আসে তখন ধরে নিতে হয় বাচ্চার নাভীতে ইনফেকশন বা Umbilical sepsis হয়েছে। এ অবস্থায় নাভীর চারপাশটা লালচে হয়ে যায় এবং নাভী দিয়ে ক্রমাগত ভাবে স্রাব আসতেই থাকে।
স্টেফাইলোকক্কাস নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমনে এমনটি হয়ে থাকে, নাভীর স্রাবের কালচার পরীক্ষা করে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়।
অনেক
সময় নাভী থেকে এটি লিভারে গিয়ে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরতে পারে তখন
জন্ডিস, লিভারের ফোড়া সহ ভয়াবহ অবস্থার আবির্ভাব হতে পারে। কখনো কখনো এ
ইনফেকশন হাড় অথবা অন্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পরতে পারে। তাই সন্দেহ হবার পর
দ্রুত শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।জন্মের পরপরই নাভীর যত্ন নিলে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। রোগটি হয়ে গেলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে এ রোগ ভালো হয়ে যায়। রোগটি অল্পমাত্রায় হলে নাভীটি স্পিরিট দিয়ে ঘন ঘন পরিস্কার করতে হয় সেই সাথে পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক পাউডার প্রয়োগ করতে হয়। রোগটি ছড়িয়ে পরলে হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় এন্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেয়া সহ অন্যান্য চিকিৎসা করতে হয়।
নবজাতকের ওজনহীনতা
জন্মের সময় শিশুর ওজন যদি আড়াই কেজি (কিলোগ্রাম) এর কম হয় তাহলে ধরে নেয়া হয় শিশুটি এল,বি,ডাব্লিউ বা Low birth weight baby (LBW). এই ওজন যদি দেড় কেজিরও কম হয় তাহলে তাকে খুব কম ওজনের শিশু বা Very low birth weight (VLBW) এবং ৭৫০ গ্রামের কম ওজনের হলে চরম ওজনহীন শিশু Extreme low birth weight (ELBW) বলা হয়।
কিশোরী মাতার সন্তানের ওজন সাধারণত খুব কম হয় এবং গর্ভে শিশু পরিণত বয়সপ্রাপ্ত হবার আগেই (Preterm) ভূমিষ্ঠ হলেও ওজন খুব কম হয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের যদি ডায়াবেটিস (Diabetes), হৃদরোগ, কিডনি রোগ, পুষ্টিহীনতা, রক্তশুন্যতা, বড় কোনো ইনফেকশন, টক্সেমিয়া (Toxaemia),
রক্তস্রাব বা এইধরনের জটিল কোনো রোগ থাকে তাহলে নবজাতকের ওজন কম হতে পারে।
জমজ শিশু বা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশুদের ওজন কম হতে পারে,
ধুমপায়ী মায়েদের সন্তানেরও জন্মের সময় ওজন বেশ কম থাকে।কম ওজনের নবজাতক খুব কম সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে যেতে পারে তাই এসকল শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নিতে হয়। সবসময় শিশুটিকে উষ্ণ রাখতে হবে, তাপমাত্রা কমতে দেয়া যাবেনা, পরিষ্কার হাতে শিশুকে ধরতে হবে এবং শিশুর পরিধানের কাপড়ও খুব পরিস্কার রাখতে হবে। শ্বাস নিতে কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে মুখের ভেতরের লালা এবং নাকের সর্দি পরিষ্কার করে দিতে হবে।
শিশুর
ওজন বেশ কম হলে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে শিশু বিশেষজ্ঞের
তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। সঠিক পুষ্টির জন্য মায়ের দুধের পাশাপাশি নাকে নল
দিয়ে খাবার দেয়া এমনকি শিরার মাধ্যমেও খাবার দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
শিশুর তাপমাত্রা কমে গেলে তাকে ইনকিউবেটর (Incubator) এ দিতে হবে। ইনফেকশন প্রতিরোধ করার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন এনটিবায়োটিক সেই সাথে কিছু ভিটামিন এবং ফেনোবারবিটোন (Phenobarbitone) জাতীয় অসুধ ও দিয়ে থাকেন। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ভুমিষ্ঠ হওয়া (Preterm) শিশুর অবস্থা খুব খারাপ হলে শিশুকে এন,আই,সি,ইউ (NICU - Neonatal Intensive Care Unit) তে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া লাগতে পারে।
স্পাইনা বাইফিডা (Spina Bifida)
এই ভূপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুদের বিশাল একটি অংশ নানাবিধ জন্মগত ত্রুটি (congenital malformation) নিয়ে জন্মায়। সেসবের মধ্যে সংখাধিক্যে সর্বাধিক ত্রুটিটির নাম স্পাইনা বাইফিডা (spina bifida)। বিশ্বে জন্ম নেয়া প্রতি ১০০০ শিশুর মাঝে ১ থেকে ২ টি শিশু এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে।
জন্মগত এই ত্রুটিটি নিউরাল টিউব (neural tube) নামক একটি ভ্রুনাংগের ত্রুটির কারনে হয়। এতে জন্ম নেয়া শিশুটির কশেরুকা (vertebra) নামক হাড়টির পেছনের অংশটি জোড়া লাগা অসম্পূর্ণ থাকে এবং এর ফলে মেরুদন্ডের অভ্যন্তরিস্থ স্পাইনাল কর্ড (spinal cord) এবং এর থেকে বের হয়ে আসা নার্ভ (nerve) গুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ে ।
স্পাইনা বাইফিডার তিনটি প্রকারভেদ আছে - যেটি সর্বাধিক ব্যাপক এবং ক্ষতিকর তার নাম মায়েলোমেনিংগোসিল (Myelomeningocoele)। এমনটি হলে কশেরুকার পিছনের হাড়ের জোড়া লাগার অসম্পূর্নতার কারনে তার ভেতর দিয়ে মেরুরজ্জু বা spinal cord তার বিভিন্ন আবরণ এবং স্নায়ু (nerve) সহ শরীরের পিছন দিক দিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে। কোমড় বা এর ও নিম্নদেশ (Lumber & Sacral region)দিয়ে
বের হয়ে আসার হারই সবচেয়ে বেশী। আর এমনটি হলে জন্ম নেয়া শিশুটি অপরিসীম
ভোগান্তি নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়।তার নিম্নাংগ গুলো অবশ থাকে এমনকি মাঝে মাঝে
নিতম্ব, উরু, পা এসব অঙ্গ পুরোপুরি অগঠিত থাকে। শিশুটির পায়খানা প্রসাব
করার পথ সহ নিম্নাংগের এমন ত্রুটিপূর্ন গঠন তাকে এবং তার অভিভাবক কে
দুর্বিসহ যাতনার মধ্যে ফেলে।
মেনিংগোসিল (Meningocoele) নামক প্রকারভেদটির হার এর চেয়ে কম। এতে কশেরুকার পিছনের ফাকটিও এতো বড় থাকেনা যে তা দিয়ে spinal cord
বের হয়ে আসতে পারে। ফলে এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মনেয়া শিশুটির পিছনের দিকে
সামান্য অংশ ফাকা ও ফুলে থাকা ছাড়া অন্য কোন সমস্যা থাকেনা বললেই চলে।
স্পাইনা বাইফিডা অকাল্টা (spina bifida occulta) প্রকারভেদটি সর্বাপেক্ষা কম ক্ষতিকর একটি ত্রুটি। এতে কশেরুকার পিছনের ফাকা অংশটি এতটাই ক্ষুদ্র থাকে যে তা দিয়ে spinal cord এর কোন কিছু বের হয়ে আসেনা। সামান্য ফাকা থাকা কশেরুকার পেছনের অংশটুকু ঢাকা থাকে সুন্দর ও সুগঠিত ত্বক (skin)
দিয়ে। যার ফলে বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায়ই থাকেনা যে শিশুটির এমন কোন
ত্রুটি আছে। শতকরা ১০ জন শিশুই এমন ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহন করতে পারে।
ত্রুটিপূর্ন অংশের ত্বকে অস্বাভাবিক চুল জন্মানো বা জন্মদাগ থাকার কারনে এই
ত্রুটিটি কারো দৃষ্টিগোচর হলেও হতে পারে।
গর্ভবতী মা’কে আল্ট্রাসনোগ্রাম (ultrasonogram)
পরীক্ষাটি করালে অনেক সময়ই বোঝা যায় গর্ভের সন্তানটির অমন ত্রুটি আছে
কিনা। তাই সন্দেহ হলে তা নিশ্চিত করতে মায়ের রক্ত পরীক্ষা করে বা
এমনিওসেন্টেসিস (amniocentesis) পরীক্ষা করে দেখতে হয়। শিশুর স্পাইনা বাইফিডা বা নিউরাল টিউব এর ত্রুটি থাকলে মায়ের রক্তে আলফা ফেটো প্রোটিন (AFP=Alpha feto protein)নামক একটি উপাদান অনেক পরিমানে বেড়ে যায়।
একবার
এই ত্রুটি নিয়ে কোন শিশু জন্মালে তা পুরোপুরি সারিয়ে তোলার কোন চিকিৎসা
এখনো আবিস্কৃত হয়নি।তবে সমস্যা যেন আরো বৃদ্ধি না পায় এজন্য শিশু
নিউরোসার্জন (pediatric neurosurgeon) শুরুতেই কশেরুকার ত্রুটিটি অপারেশনের মাধ্যমে সারিয়ে তোলেন।
স্পাইনা
বাইফিডার শিশুটির ছোট খাটো অনেক স্নায়বিক/মানসিক সমস্যাও থাকতে পারে।
যেমন এই ধরনের শিশুরা বড় হলে তাদের নির্বাহী ক্ষমতায় (executive power)পারদর্শীতা কম থাকে, তেমনি গণিত (mathematics) এবং পঠনেও (reading comprehension)
এরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল থাকে। বন্ধু তৈরী, সামাজিক সম্পর্ক গঠন বা সামাজিক
অনুষ্ঠান গুলোতে সক্রিয় অংশগ্রহনে ও এরা কিছুটা অপটু থাকে।
সাম্প্রতিক
সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে। ইদানিং গর্ভাবস্থায় কোন শিশুর
স্পাইনা বাইফিডা রোগ ধরা পরলে মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়েই তাকে সার্জারী
করে সম্পূর্ণ সুস্থ্য ভাবে জন্মদান করানো সম্ভব। অপারেশনের প্রক্রিয়াগুলো
কিছুটা জটিল এবং ব্যয়বহুল, সেই সাথে এর সাফল্যের হার ও শতকরা ১০০ ভাগ নয়
বলেই এই পৃথিবীকে হয়তো আরো কিছু সময় অপেক্ষা করে থাকতে হবে সম্পুর্ণ
স্পাইনা বাইফিডা মুক্ত শিশু বিশ্বের জন্য।
আশার কথা হলো এই রোগটি প্রতিরোধ করার মত একটি রোগ। গর্ভধারনের শুরু থেকেই মায়েরা যদি নিয়মিত ভিটামিন ফলিক এসিড/ফলেট (folic acid/folate vitamin B9)গ্রহন করে তবে এই রোগটি হবার সম্ভাবনা খুবই কমে আসে। বাজারে ফলিক এসিড যে কোন অসুধের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। তাছাড়া শাক সবজি (leafy vegetables),
বিভিন্ন ধরনের ফল (কলা, আনারস, টমেটো, আঙ্গুর ইত্যাদি) এসবেও প্রচুর ফলিক
এসিড রয়েছে। তাই স্পাইনা বাইফিডা যতো জটিল রোগই হোকনা কেন এ নিয়ে
দুশ্চিন্তা করাটা ইচ্ছা করলেই আপনি দমিয়ে রাখতে পারেন।
ডাউন সিনড্রম
আমাদের চারপাশে অনেক শিশুকেই আমরা প্রতিবন্ধি হিসেবে জন্মাতে দেখি, এর অন্যতম প্রধান কারন হলো Down syndrome
। ডাউন সিনড্রম সাধারণত বেশী বয়স্ক মায়েদের মাঝে বেশী দেখা যায়। যে সকল
মায়ের প্রথম সন্তান গর্ভে আসার সময় তার বয়স ৩৫ বা তার উর্ধে থাকে তার
সন্তানটির ডাউন সিনড্রম হবার সম্ভাবনা বেশী। এই ভাবে মায়ের বয়স বাড়ার
সাথে সাথে সন্তানের ডাউন সিনড্রম হবার সম্ভাবনা বাড়তেই থাকে।
এটা
ক্রোমোজোমের একটি ত্রুটির কারনে হয়। ২১ নম্বর জোড় ক্রোমোজোমে একটি এক্স
ক্রোমোজোম বেশী থাকায় এমনটি হয়ে থাকে, এর ফলে রোগীর দেহকোষে একটি বাড়তি Cromosome
থাকে। এই সমস্যা নিয়ে জন্মানো শিশু জন্মের সময় থেকেই কিছুটা অস্বাভাবিক
থাকে, জন্মের পর এদের হাত-পা একটু কম নড়াচড়া করে, হৃদপিন্ডে অস্বাভাবিক
ছিদ্র থাকতে পারে। কিছুটা বড় হলে দেখা যায় এদের মুখাবয়ব অনেকটা মংগোলিয়
প্রকৃতির - চ্যাপ্টা নাক, ছোটো চোখ, মাথার পেছনটা সমতল এবং সেই সাথে ছোটো
কান দুটো একটু নিচের দিকে বসানো দেখেই চিকিৎসক বুঝতে পারেন শিশুটি ডাউন
সিনড্রম এ ভুগছে। এসকল শিশুর হাত-পা গুলো ছোটো ছোটো এবং হাত ও পায়ের পাতা
গুলো বড় বড় হয়। বুদ্ধিমত্তাও এদের কিছুটা কম থাকে (IQ ৫০ এর কম হয়ে থাকে)।
সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় Amniocentesis পরীক্ষাটি করালে বোঝা যায় সন্তানটি ডাউন সিনড্রম নিয়ে জন্মাবে কিনা। ক্যারিওটাইপিং (Karyotyping) পরীক্ষার মাধ্যমে ক্রোমোজোম পর্যবেক্ষন করে ডাউন সিনড্রম নিশ্চিত করা হয়।
চিকিৎসক রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত হলে অনেক সময়ই গর্ভবতী মাকে গর্ভপাত বা Abortion
করানোর ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ডাউন সিন্ড্রম নিয়ে জন্মানো
শিশুটির চিকিৎসার দ্বারা ভালো হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এসকল রোগীর গড় আয়ুও
বেশ কম। শিশুর জন্মগত হৃদরোগ থাকলে সেটির চিকিৎসা করাতে হবে। উন্নত বিশ্বে
এসব শিশুদের জন্য ভিন্ন ধরনের স্কুল /শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমন শিশুর
মা-বাবা কে তাদের পরবর্তী সন্তান গ্রহনের ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত এবং
চিকিৎসক এর পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই কেবল আরেকটি
সন্তান গ্রহনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা উচিত।
বার্থ এসফেক্সিয়া (Birth asphyxia)
নবজাতক
জন্মের সাথে সাথেই যদি নিজে নিজে নিঃশ্বাস নিতে ব্যর্থ হয় তাকে বার্থ
এসফেকশিয়া বা এসফেকশিয়া নিউনেটারাম বলে। সাধারণত এ ধরনের শিশুদের জন্মের ৫
মিনিট পর আপগার স্কোর ৬ এর নীচে থাকে, যদি তা ৩(তিন) এর নীচে নেমে যায়
তাহলে ধরে নিতে হবে শিশুটির অবস্থা বেশ জটিল।
গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের নিউমোনিয়া, হার্ট ফেইলুর, খীচুনি, রক্তস্রাব বা এক্লামপসিয়া (Ecclampsia) জাতীয়
কোনো রোগ থাকে তাহলে শিশুর এস্ফেক্সি্ইয়া নিউনেটারাম হতে পারে। এছাড়া
প্রসবের সময় শিশুর গলায় অনেক্ষন নাড়ীর প্যাচ লেগে থাকা, মাথায় রক্তপাত হওয়া
বা আঘাত পাওয়া কিংবা কিছু অসুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারনেও এমন সমস্যার
সৃষ্টি হতে পারে।
একজন নবজাতক বিশেষজ্ঞ বা নিউন্যাটোলজিস্ট (Neonatologist)
এই রোগ নিরাময়ে সর্বাপেক্ষা অধিক ভূমিকা রাখতে পারবেন। শিশু জন্মের ১
মিনিট এর মধ্যে ও যদি শ্বাস না নেয় তাহলে দ্রুত তার মুখ গহবর পরিষ্কার করে
মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দিতে হবে এবং শিশুকে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, লক্ষ্য রাখতে হবে শিশুর তাপমাত্রা যেনো কোনোভাবেই কমে না যায় এজন্য তাকে উষ্ণ কাপড়ে মূড়ে রাখতে হবে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীকে সাকশন (suction) দিয়ে মুখ
ও পেট খালি করা হয় এবং ৮০% অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়। জন্মের তিন মিনিটের
মধ্যেও শ্বাস না নিলে মুখে বা গলায় নল দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস দিতে হয়
সেই সাথে হাতের তালু দিয়ে বুকে ঘন ঘন চাপ দিয়ে (Cardiac massage) হৃদপিন্ড সচল রাখতে হয়।
বার্থ এসফেক্সিয়া তীব্র হলে বা চিকিৎসা করতে সামান্য দেরী হয়ে গেলে শিশু মানসিক প্রতিবন্ধকতা, মৃগী রোগ, নির্জীব থাকা বা প্যারালাইসিস(Cerebral palsy) সহ নানা জটিলতায় ভুগতে পারে, এ রোগে শিশুর মৃত্যুর হার ও অত্যাধিক।
টার্নার্স সিন্ড্রোম (Turner’s Syndrome)
টার্নার্স সিন্ড্রোম মানব দেহের ক্রোমোজমের (chromosomal disorder) একটি
রোগ। পৃথিবীর প্রতি ২৫০০ মহিলাদের মাঝে একজন এমন রোগে আক্রান্ত। বোঝাই
যাচ্ছে ছেলেরা এ রোগে আক্রান্ত হয়না। আসলে এ রোগ নিয়ে জন্ম নেয়া মানুষটির
একটি ক্রোমোজম (chromosome) কম থাকে। একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষের যেমন ৪৬ টি ক্রোমোজম থাকে (মহিলাদের 44+XX আর পুরুষের 44+ XY) এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটির সেখানে ক্রোমোজম থাকে ৪৫ টি (44+X)। আর তাই একগাদা উপসর্গ নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুটি একজন মেয়ে হিসেবেই বড় হতে থাকে।
উইলিয়াম টার্নার নামক একজন এন্ডোক্রাইনলজিস্ট (endocrinologist) বা
হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ১৯৩৮ সালে সর্বপ্রথম এই রোগটি বর্ননা করেন আর তার নাম
অনুসারেই এ রোগের নাম করন করা হয়। যদিও মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় ই এই রোগটি
নির্নয় করা সম্ভব তবে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুটির বয়সন্ধির আগে রোগটি ধরা
পরেনা।
অভিভাবকের প্রথম অভিযোগ থাকে এই যে মেয়েটি তার বয়স অনুযায়ী লম্বা হচ্ছেনা (short stature)। তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে খর্বাকৃতি ছাড়াও মেয়েটি শরীরে আরো উপসর্গ ধারন করে যেমন ঘাড় অনেক মোটা হওয়া (webbing of neck), কান গুলো অপেক্ষাকৃত নীচে থাকে (low set ears), পেছন দিকে মাথার তালু ছাড়িয়ে ঘাড় থেকেও চুল ওঠা (low cut hairline), হাত ও পা ফুলে যাওয়া (lymphoedema), আঙ্গুল ছোট হওয়া, মুখ মাছের মুখের (fish mouth) মত হওয়া ইত্যাদি। শিশুটির বুক অনেক চওড়া থাকে (shield chest) এবং স্তনবৃন্ত গুলো একটা আরেকটা থেকে অনেক দূরে দূরে থাকে(widely spaced nipple)।
এমন
রোগে আক্রান্ত শিশুটির অনেক সময়ই বুদ্ধিশুদ্ধি ভালো থাকতে দেখা যায় তবে
এদের অনেকেই আবার কম বুদ্ধি সম্পন্ন হয়। এদের গনিতে পারদর্শিতা অপেক্ষাকৃত
কম থাক, কম থাকতে পারে শ্রবন ক্ষমতা এমন কি দৃষ্টি শক্তিও।
ভালো মত পরীক্ষা নিরিক্ষা করলে দেখা যায় এদের হার্টেও বেশ কিছু সমস্যা থাকে যেমন মহা ধমনী সরু হয়ে যাওয়া (coarctation of aorta), ভাল্ভ সরু হয়ে যাওয়া (aortic stenosis)। তেমনি অনেকের কিডনিও থাকে রোগাক্রান্ত (Horshoe Kidney)। শিশুটির একটি ক্রোমজম কম থাকার কারনে তার ডিম্বাশয় শুকিয়ে যায় (streak ovaries) যার ফলে স্বাভাবিক বয়সে তার বয়সন্ধি শুরু হয়না। মাসিক (menstruation) শুরু
না হওয়ার কারনেও অনেক সময় অভিভাবক চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হন। খর্বাকৃতির
এমন একটি মেয়ে শিশুর অভিভাবক অনেক সময়ই প্রচন্ড হতাশায় ভোগেন এবং মানসিক
ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যান।
মনে রাখতে হবে টার্নার সিন্ড্রম এর চিকিৎসা আছে, আর এ রোগটিতে আক্রান্ত হওয়া শিশুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আগেই জানানো হয়েছে গর্ভাবস্থাতেও এমনিওসেন্টেসিস (amniocentesis) এর মাধ্যমে এ রোগ নির্নয় করা সম্ভব। জন্মের পরেও এ রোগ নির্নয় হলে সমস্যা নেই। রোগটি নিশ্চিত করতে ক্যারিওটাইপিং (Kariotyping) নামে একটি পরীক্ষা করতে হয়।
শুরুতেই একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের (endocrinologis) তত্বাবধানে থেকে চিতিৎসা শুরু করতে হবে। স্বাভাবিক লম্বা হতে হলে তাকে সঠিক বয়সে Growth Hormone দিতে
হবে। যেহেতু শিশুটি একটি মেয়ে এবং তার ডিম্বাশয় পরিপূর্ন নয় তাই পূর্নাঙ্গ
নারী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তাকে সঠিক বয়সে অবশ্যই ইস্ট্রোজেন (estrogen) হরমোন দিতে হবে। এসব হরমোনের প্রভাবে শিশুটি
একজন স্বাভাবিক কিশোরী হিসেবে বড় হতে থাকবে এবং পরিপূর্ন নারীতে পরিণত
হবে। দীর্ঘস্থায়ী এ চিকিৎসা সঠিক ভাবে চালিয়ে গেলে একসময় তার পক্ষে
গর্ভধারন করাও সম্ভব।
তাই হতাশ হলে চলবেনা, যেই
বয়সেই এই রোগটি নির্নয় হোক না কেন এর ফলপ্রসু চিকিৎসা রয়েছে। টার্নার
সিন্ড্রমের অনেক রোগীই স্বাভাবিক মেধাসপন্ন হয় এবং সম্পূর্ন স্বাভাবিক একটি
জীবন ফিরে পেতে পারে। ধৈর্য্য ধরে শুধু চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াটাই তখন
একমাত্র কষ্টের কাজ হতে পারে।
সিস্টিক হাইগ্রোমা (Cystic Hygroma)
জন্মের সময় অথবা এর পরপরই অনেক সময় শিশুর গলার একপাশ জুড়ে বিশাল অংশ ফুলে থাকতে দেখা যায়। হাল্কা তুলতুলে নরম, ভেতরে পানি পানি ভরা এই টিউমারটির নাম সিস্টিক হাইগ্রোমা। এটা আসলে তেমন কোনো টিউমার নয়, বাচ্চাদের
গলার লসিকা থলির বেশ কিছু অংশ অস্বাভাবিক ভাবে রয়ে যাবার কারনেই এমনটি হতে
পারে।
শিশুটি যখন কান্না করে অথবা হাল্কা কাশি দেয় গলার এই ফোলা অংশটি তখন আরো
অনেক বড় হয়ে যায় এবং বাবা-মা এতে বেশ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ফোলা বড় হয়ে
শিশুটির শ্বাস কষ্ট হলে বাবা-মার ভয়ের পরিমান আরো বাড়তে থাকে। এই নিয়ে
দুঃশ্চিন্তা না করে তাদের উচিত একজন
অভিজ্ঞ শিশু সার্জন এর সাথে যোগাযোগ করা। কারণ সার্জারিই হচ্ছে এর একমাত্র
চিকিৎসা। অনেকে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে একে কমিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তবে এর ফলে রোগটি আরো জটিল হতে পারে এবং পরবর্তীতে অপারেশন করা দুরূহ হয়ে উঠতে পারে।
ক্লিনফেল্টার সিন্ড্রোম (Klinfelters Syndrome)
ক্লিনফেল্টার সিন্ড্রোম, টার্নারস সিন্ড্রোম (Turner’s syndrome)এর মতোই একটি জেনেটিক রোগ (genetic disease) তবে এই রোগে কেবলমাত্র একটি ছেলেশিশুই আক্রান্ত হয়। এই রোগীদের দেহকোষে স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে ক্রোমোজমের (chromosome) সংখ্যা একটি বেশী থাকে। সোজা কথায় একজন স্বাভাবিক মানুষের দেহকোষে ক্রোমোজম থাকে ৪৬ টি (মহিলাদের 44+XX আর পুরুষের 44+ XY) আর এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটির ক্রোমোজমের সংখ্যা ৪৭ টি (44+XXY)। আর যেহেতু আক্রান্ত শিশুটির কোষে একটি Y ক্রোমজম থাকে সে জন্যই সে একজন ছেলের রূপ নিয়েই জন্মায়।
১৯৪২
সালে হেনরি ক্লিনফেল্টার সর্বপ্রথম এই রোগটি বর্ননা করেন আর তার
নামানুসারেই এ রোগের নামকরণ করা হয়। ভুমিষ্ট হওয়া প্রতি ১০০০ ছেলে সন্তানের
মাঝে একজনের এ রোগ নিয়ে জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে।
একটি শিশু বয়ঃসন্ধি হবার আগ পর্যন্ত খুব সময়ই
বোঝা যায় সে এমন রোগে ভুগছে কিনা। তবে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়
ক্লিনফেল্টার সিন্ড্রোম এ আক্রান্ত শিশুটির মাংশ পেশীর গঠন থাকে অপেক্ষাকৃত
স্বল্প ও দুর্বল প্রকৃতির। ।যার ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই সে দুর্বলতায় ভোগে, বিশেষ করে যে কোন খেলাধুলায় তাকে সব সময়ই পিছিয়ে থাকতে দেখা যায়। এদের কিছু সংখ্যকের মেধা বা বুদ্ধি ও সামান্য কম থাকতে দেখা যায়।
বয়সন্ধির
সময় হলে বাবা মা প্রথম বুঝতে পারে যে তাদের ছেলেটি পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।
কারন তার গোফ দাড়ি যেমন জন্মায় না তেমনি সমস্ত শরীরে কিশোরীদের মতো কোমলতা
দেখা দেয়। তার স্তন বড় হয়ে যেতে থাকে (gynaecomastia)এবং নিতম্ব এর বৃদ্ধি ও অনেক বেশী হয় (broader hips)। শিশুটি কৈশোরে তার সমবয়সীদের তুলনায় অনেক বেশী লম্বা হয়ে থাকে (tall stature)। তার এই ক্রমবর্ধমান লম্বা হতে থাকাটাও অনেক সময় মা-বাবার চোখে প্রথম লক্ষনীয় বিষয় হয়ে দেখা দেয়।
আক্রান্ত শিশুটি হাইপোগোনাডিজম (hypogonadism) নামক একটি রোগের শিকার। তার শরীর একটি এক্স ক্রোমোজম (chromosome) বেশী থাকার কারনে সে এমন সব বৈশিষ্টের অধিকারী হতে থাকে। তার অন্ডকোষ (testicle) পুরোপুরি গঠিত হয়না, যার ফলে তার টেস্টেস্টেরন (testosterone) নামক হরমোন (hormone) টির মাত্রা থাকে নগন্য। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তার অন্ডথলি (scrotum)তে অবস্থিত অন্ডকোষ (testicle)গুলো খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির এবং নরম।
কোন শিশুর ক্লিনফেল্টার সিন্ড্রোম আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে ক্যারিওটাইপিং (karyotyping) নামক একটি পরীক্ষা করতে হয়। অভিভাবকের ঘাবড়ানোর কিছু নেই,এ রোগের চিকিৎসা আছে। একজন হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞের (endocrinologis)অধীনে তাকে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা নিতে হয়। এমন রোগীদের বিয়ে-সাদি এমন কি বাচ্চা উৎপাদন করাও সম্ভব, তবে এদের স্তন ক্যান্সার (breast cancer),থ্রম্বোএম্বলিজম (thromboembolism),অটোইমিউন ডিজিজ (autoimmune disease)এবং অস্টিওপোরোসিস (osteoporosis)হবার ঝুকি থাকে অন্যদের চেয়ে একটু বেশী। তাই নিয়মিত চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হয়ে নিশ্চিত হতে হবে তার এসব রোগ হয়েছে কিনা।
সব কথার শেষ কথা ক্লিনফেল্টার সিন্ড্রমের অনেক রোগীরই কোন ধরনের উপসর্গ থাকেনা, এবং সবার ক্ষেত্রে সব গুলো উপসর্গ বা ঝুকিও সমান ভাবে উপস্থিত থাকেনা। আর তাই অনেক রোগীই স্বাভাবিক একজন মানুষ হিসেবে তার জীবন পার করে দিতে পারে।শিশুদের বয়সভিত্তিক বৃদ্ধি
শিশুর
বাহ্যিক বৃদ্ধি দেখে অনেক সময়ই আমরা বুঝতে পারি শিশুটির মানসিক ও
মস্তিস্কের বৃদ্ধি ঠিক মতো হচ্ছে কিনা। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শিশুর ভিন্ন
ভিন্ন অংগ পূর্ণ বৃদ্ধি লাভ করতে পারে। এর একদম নির্দিষ্ট সময় কাল না
থাকলেও একটা সীমারেখা আছে। নীচে তার কিছু উল্লেখ করা হলো।
তিন মাসঃ
শিশুকে
এই সময় পিঠে বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিলে সে সোজা হয়ে বসে থাকতে পারে, মাথা
বা ঘাড় কাত হয়ে পরে যায়না। নিজের হাত নাড়িয়ে তা সে লক্ষ্য করে, চোখ
ঘুরিয়ে সব কিছু লক্ষ্য করতে চায়, শব্দ শুনলে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতে চায়। এ
সময় সে তার মাকে ভালোভাবেই চিনতে পারে।
ছয় মাসঃ
এই
সময় শিশু হাত দিয়ে তার খাবার বোতলটি ধরতে পারে, নিজে নিজেই উপুড় বা চিত
হয় এমনকি হামাগুড়ি দেয়া শিখে ফেলে, বসিয়ে দিলে কোনো কিছুর সাহায্য
ছাড়াই বসে থাকতে পারে এমনকি খেলনা একহাত থেকে অন্য হাতে নিতে পারে। এই
সময় শিশু তার নিজের নাম ধরে ডাকলে বুঝতে পারে এবং তাকায়, কেউ কথা বললে
সেদিকেও সে তাকাতে পারে, মাথা ঘুরিয়ে সব কিছু সে দেখতে চায়। মুখ ও ঠোট
দিয়ে অস্পস্ট শব্দ করতে শেখে।
এক বছরঃ
৯
মাস বয়সেই শিশু কোনো শক্ত একটা কিছু ধরে দাঁড়িয়ে যেতে চায় এবং কখনো
কখনো পারেও। ১ বছর বয়সে সে নিজেই শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে এবং শক্ত কিছু
ধরে নিজ়ে নিজেই হাটা শুরু করে দেয়। নিজে নিজে একা একা খেলা, কোনো কিছু
প্রয়োজন হলে ইশারায় তা দেখিয়ে দেয়া এসবও সে তখন ভালোই পারে। শিশুকে এই
সময় কোনো নির্দেশ দিলে সে টুকটাক বুঝতে পারে এবং তা মানতে চেষ্টা করে। এই
সময় সে বেশ কিছু পরিচিত অর্থবোধক শব্দ বলতে শেখে।
দেড় বছরঃ
শিশু
এই সময় হাটতে হাটতে সিড়ি বেয়ে উঠতে পারে এমনকি উলটো দিকেও হাটতে পারে।
হাটার সময় হাতে একটা খেলনা ধরে রাখাটাও তার অভ্যাসে এসে যায়। নিজে নিজে
কাপে করে দুধ খাওয়া, টয়লেটের প্রয়োজন হলে দেখিয়ে দেয়া কিংবা শরীরের
৩/৪ টা অঙ্গ চিনে তা বলা এসব সে ভালোই পারে এতোদিনে। ছবির বই এনে দিলে তা
দেখে বেশ মজাও করতে শেখে। পরিচিত শব্দগুলো মিলিয়ে এক আধটা পুর্ন বাক্য বলে
আত্মীয়স্বজনদের আনন্দের খোরাক হতে তার বেশ ভালোই লাগে এ সময়।
দুই বছরঃ
এই
সময় শিশুটি চায় সবাই তার প্রতি মনোযোগী হোক, মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে
থাকাটাই তার যত বাসনা। বেশ দক্ষতার সাথে দৌড়াতে শেখে সে এসময়, পথের দু
একটা বাধা ডিঙ্গিয়ে চলাতেও পারদর্শী হয়ে উঠে। দরজার হাতল ঘুরিয়ে খুলে
ফেলা, নিজে নিজে জামা কাপড় পরে ফেলা কিংবা নাম ধরে ৪/৫ টা খেলনা চেয়ে
বসতে পারে। দেখিয়ে দিলে কাগজে আকতে পারে লম্বা দাগ। এই সময় প্রায় গোটা
পঞ্চাশেক অর্থবোধক শব্দ তার শব্দ ভান্ডারে জমা হয় এবং তা দিয়ে সে কথা
বার্তা ভালোই চালিয়ে যেতে পারে।
আপগার স্কোর (APGAR score)
জন্মের
পর পরই নবজাতকের সার্বিক অবস্থা অনুধাবনের জন্য যে পর্যবেক্ষন করা হয় তার
সংখাবাচক প্রকাশই হলো আপগার স্কোর (APGAR score)। যে সকল শিশু জন্মের পরপরই
শ্বাস কষ্ট নিয়ে জন্মায় তাদের জন্মের সাথে সাথে এবং ৫ মিনিট পর আপগার
স্কোর করে দেখা হয়। অন্য সকল স্বাভাবিক শিশুকেও আপগার স্কোর করে দেখা হয়।
ইংরেজি
৫টি অক্ষর ‘এ’ ‘পি’ ‘জি’ ‘এ’ ‘আর’ এর সমন্বয়ে APGAR শব্দটি গঠিত। A দিয়ে
এপিয়ারেন্স(Appearance) বা বাহ্যিক দর্শন, গায়ের বর্ণ (নিল না স্বাভাবিক) P
দিয়ে পালস(Pulse) বা নাড়ীর গতি(হৃদ স্পন্দন) G দিয়ে গ্রিমেস(Grimace) -
ব্যথা বা খোচা লাগার পর বাচ্চার কান্নাকরা/মুখভঙ্গী A দিয়ে
একটিভিটি(Activity) বা হাত-পা নাড়ার ক্ষমতা, R দিয়ে রেসপিরেশন(Respiration)
বা শ্বাস প্রশ্বাসের অবস্থা নির্দেশ করা হয়। এই ৫টি বিষয়ের প্রতিটিকে আবার
০,১,২ এভাবে ভাগ করে নিরুপন(assess) করা হয়। ২ পেলে বাচ্চা ভালো আছে আর
শুন্য পেলে খারাপ। এভাবে মোট আপগার স্কোর ১০ এর মধ্যে কেউ যদি ৮-১০ পায় ধরে
নেয়া হয় সে খুবই সুস্থ্য আছে আর ৪-৭ পেলে মোটামূটি ভালো। কোনো বাচ্চার
আপগার স্কোর ০-৩ থাকলে পরিস্থিতি আশংকাজনক বলে ধরে নেয়া হয়।
শিশুর স্থায়ী দাঁত উঠা
শিশুর
দুধ দাঁত পরে যাবার পর যে সকল দাঁত উঠে তা বার্ধক্য পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
এসকল দাঁত উঠার একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে। দুধ দাঁত কোনো কারনে আগে পরে
গিয়ে থাকলেও যখন স্থায়ী দাঁত উঠেনা বাবা মা তাতে অস্থির হয়ে উঠেন।
এই তালিকাটি মা-বাবা কে সেই দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখবে বলে আশা রাখছি।শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ (Breast Feeding)
মায়ের
দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে আদর্শ খাবার। ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুশু মায়ের দুধ ই
শিশুর প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টির যোগান দিতে পারে, এর পর শিশুর খাদ্য হিসেবে
অন্য কিছু যোগ করার প্রয়োজন হতে পারে। জন্মের পরপরই শিশুর মুখে চিনির
পানি, মধু বা সাদা পানি দেবার বিষয়টি পরিচিত ভ্রান্ত একটি ধারনা।
স্বাভাবিক
প্রসবের পর মা এবং শিশু সুস্থ থাকলে যতো দ্রুত সম্ভব শিশুকে মায়ের বুকে
দুধ খেতে দেয়া উচিত। শিশু যখনই ইচ্ছা প্রকাশ করবে তখনই তাকে দুধ খেতে
সূযোগ দেয়া উচিত। মায়ের প্রথম দুধ যা শাল দুধ নামে পরিচিত তা কোনো
অবস্থাতেই ফেলে দেয়া যাবেনা, এটা শিশুর জন্য খুবই উপকারী এবং শিশুকে
শালদুধ পানের সুযোগ থেকে কোনো অবস্থায় বঞ্চিত করা ঠিক হবেনা।
মায়ের
দুধ নিরাপদ, পরিস্কার, স্বাস্থ্যসম্মত, সহজপ্রাপ্য, শিশু খুব সহজেই তা হজম
করতে পারে এমন নানাগুনে সন্বেবেশিত। একমাত্র মায়ের দুধই শিশুর
প্রইয়োজনিয় তাপমাত্রায় থাকে এবং শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়।
মায়ের দুধে শিশুর রোগ প্রতিরোধের এমন কিছু উপাদান আছে যা শিশুকে অনেক
রোগের হাত থেকে বাচায় এবং মস্তিস্ক গঠন ও বৃদ্ধিতে সহয়তা করে, মায়ের দুধ
পান শিশুর চোয়াল, দাত ও মাড়ি গঠনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। মায়ের
দুধপান করা শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগেনা এবং এসব শিশুর শিশুমৃত্যুর হার ও কম।
স্তন্য
দানে মায়ের সাথে শিশুর একটি বিশেষ বন্ধন তৈরী হয় এবং এর ফলে মায়ের স্তন
ক্যান্সার হবার ঝুকি কমে যায়। প্রাকৃতিক পরিকল্পনার একটি অঙ্গ হলো এই
দুগ্ধদান, এর ফলে মাইয়ের ডিম্বানু নিষেকের সময় পিছিয়ে যায় এবং দ্রুত
আরেকটি সন্তান হবার ঝুকি কমে যায়। সন্তান প্রসবের পর মহিলাদের
যৌনাঙ্গ/প্রসবের পথ পূর্বাবস্থায় দ্রুত ফিরিয়ে আনতে স্তন্যদান বিশেষ
কার্যকরি ভূমিকা রাখে।
অনেক সময় শিশু এতো অপরিণত থাকে যে তার পক্ষে মায়র দুধ টানা সম্ভব
হয়না তখন মায়ের স্তন থেকে অন্য প্রক্রিয়ায় দুধ সংগ্রহ করে শিশুকে
খাওয়াতে হবে। তবে মা যদি যযেষ্ট দুধ প্রদান করতে সক্ষম না হয় সেক্ষেত্রে
অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্য কোনো খাদ্যের ব্যবস্থা
করা যেতে পারে কিন্ত স্মরন রাখতে হবে যতক্ষন মা ও শিশু সুস্থ আছে মায়ের
দুধই শ্রেষ্ঠ দুধ।
মায়ের
খুব জটিল কোনো মানসিক ব্যাধি থাকলে, দুই স্তনে ফোড়া থাকলে, টিবি, খীচুনি,
জটিল ইনফেকশন থাকলে অথবা মা ক্যান্সার বা অন্যরোগের কারনে শিশুর ক্ষতি হবে
এমন কোনো অসুধ গ্রহন করতে থাকলে শিশুকে মায়ের দুধ দেয়া যাবেনা। মুমূর্ষু
মায়ের স্তন্য দানও শিশুর জন্য অত্যাবশ্যক নয়।
বুকের দুধ কম হলে কি করবেন
১- উভয় স্তনের বোটা কে শিশুর জন্য পাচ মিনিট করে চুষতে দিতে হবে, একেবারে একফোটা দুধ না আসলেই এই কাজটা নিয়মিত করেই যেতে হবে।
২-
এই সময়ে শিশুর পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য শিশুকে প্রক্রিয়াজাত কৌটার
দুধ বা গরুর দুধ খাওয়ানো যেতে পারে কিন্ত লক্ষ্য রাখতে হবে কোনো অবস্থাতেই
তা ফিডার বোতলে খাওয়ানো যাবেনা।
অবশ্যই বাটিতে করে ছোট্ট চামচে করে তুলে খাওয়াতে হবে। মনে রাখতে হবে
ক্ষুধার্ত শিশুকে প্রথমে স্তন বোটার সাথেই ধরতে হবে এবং মিনিট পাচেক চুষবার
পরে বাটি ও চামচ দিয়ে অন্য দুধ খাওয়াতে হবে। এভাবে প্রসুতি মা ধীরে ধীরে
স্বাভাবিক দুগ্ধ উৎপাদন করে শিশুর সকল চাহিদা মেটাতে পারবে।৩- শিশু স্তন চুষবার সময় ম'কে অবশ্যই নিরুদ্বিগ্ন এবং চিন্তামুক্ত থাকতে হবে।
৪-মা
এর নিজের মনে অবশ্যই এই আস্থা থাকা বাঞ্ছনীয় যে এই প্রক্রিয়ায় দুগ্ধ
নিঃসরণ বাড়বে, মা'কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত করা অভিভাবক দের দায়িত্ব হিসেবে
নিতে হবে। তাকে কখনোই তিরস্কার বা হতাশ করা যাবেনা, তাহলে এটা ফলপ্রসু নাও
হতে পারে।
৫-
মা'কে পর্যাপ্ত আহার করতে হবে, তার নিদ্রা বা বিশ্রামের ও ব্যাঘাত ঘটা
যাবেনা। স্তন্য দানের ১৫ মিনিট পূর্বে মা' দুই গ্লাশ পানি পান করে নিলে
স্তন্য দান সহজ হবে।
৬-
এই মুহুর্তগুলিতে শিশুকে সবসময় মায়ের সংস্পর্শে রাখতে হবে। মা' এবং
শিশুর মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক হওয়া এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
৭-
উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহনের ১৫ দিন থেকে ২০ দিনের মধ্যেও যদি মায়ের বুকে
পর্যাপ্ত দুধ না আসে বা কম আসে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দুধ
বাড়ার অসুধ গ্রহন করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে এর আগে দুই থেকে তিন
সপ্তাহ ধৈর্য্য ধরলে এম্নিতেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
৮-
কখনো মায়ের দুধ কম হবার কারনে শিশুকে প্রক্রিয়াজাত অন্য দুধ খাওয়াতে
হলে মনে রাখতে হবে শিশু প্রথমে মায়ের দুধ টুকু গ্রহন করবে এর পর তার
বাড়তি প্রয়োজন অন্য কিছু দিয়ে পূরণ করতে হবে। এ অবস্থাকে ঝামেলাপুর্ন
মনে হওয়ায় মায়ের দুধ বন্ধ করে দেয়া যাবেনা, কারণ মায়ের দুধের কোনোই
বিকল্প নাই।
মায়ের বুকের দুধ কম হবার কারণ
১।
মায়ের অপুষ্টি ই প্রধান কারন হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক সময় মহিলাদের
গর্ভবতী অবস্থায় এবং সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়ে কুসংস্কারজনিত কারনে
মাছ-মাংস জাতীয় পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। সন্তান বড় হলে
প্রসবে কষ্ট হবে এমন ভুল ধারনার কারনেও অনেকে গর্ভবতীকে কম খাবার দিয়ে
থাকেন। এ সকল কারনে মা প্রসব পরবর্তী সময়ে অপুষ্টিতে ভোগেন এবং তার বুকের
দুধের পরিমান কমে যেতে পারে। ফলস্বরূপ মায়ের অপুষ্টি সন্তানের অপুষ্টির
কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২। সঠিক অবস্থানে শিশুকে ধরে না রাখলে শিশু স্তনবৃন্ত বা নিপল চুষতে পারেনা,
এর ফলে মায়ের পক্ষে দুগ্ধ উৎপাদন করা সম্ভব হয়না। শিশুর স্তন চূষবার
প্রতিক্রিয়ায় ই স্তন উতপন্ন হয়, এমন তথ্য জানা থাকলে অনেক মা'ই হয়তো এ
ব্যাপারে আরো বেশী সতর্ক হতে পারতেন।৩। শিশুকে স্তন্য দানে মায়ের অনিচ্ছা। অনেক আধুনিক মা এ ব্যাপারে অনিচ্ছা দেখান এবং শিশুকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেন। অনেকের ভুল ধারনা আছে যে স্তন্য দান করলে হয়তো স্তনের গঠন নষ্ট হয়ে যায়; কিন্ত এটা একদম ভুল ধারনা। একজন মা' যখন তার শিশুটিকে তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত খাবার স্তন্যদুগ্ধ দান করেন তাকেই আধুনিক, চৌকষ বা স্মার্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত মহিলার পক্ষেই ভুল কাজ করা শোভা পায়।
৪।
অনেক সময় প্রসুতি মা যদি উদ্বিগ্ন, পারিবারিক অশান্তি, দুশ্চিন্তা, হতাশা
বা ভয়ভীতিতে ভোগেন সে ক্ষেত্রেও দুগ্ধ উৎপাদন কমে যেতে পারে।
৫।
মায়ের কিছু রোগ যেমন যক্ষা, ক্রনিক রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি অসুখ থাকলে
এবং সে অসুখের অসুধ খেতে থাকলে সে কারনেও দুগ্ধ উৎপাদন কম হতে পারে। এসব
ক্ষেত্রে অনেক সময় স্তন্য দান করা থেকে মা'কে বিরত থাকতেও বলা হয়।
৬।শিশুকে
একই সঙ্গে মায়ের স্তন এবং ফিডার বোতলের নিপলে খেতে দিলে শিশুর মায়ের
বুকের প্রতি আসক্তি কমে যেতে পারে। শিশুর জন্মের পর পর এক দুই বোতল দুধ
খাওয়ালেই শিশুর স্তন্য পানের সম্ভাবনা প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে যায়।
ফিডারে নিপল চূষে খাওয়া খুব সহজ তাই শিশু তখন স্তন্য পান পুরোপুরি বর্জন
করে এবং এর ফলশ্রুতিতে মায়ের দুগ্ধ উৎপন্ন করাও কমে যায়।
৭।
শিশুকে যদি চুষনি চোষার অভ্যাস করানো হয় সে ক্ষেত্রেও শিশুটি মায়ের
স্তনের প্রতি অনাগ্রহ দেখায় এবং মায়ের দুগ্ধ উৎপাদন আশংকাজনক হারে হ্রাস
পায়।
শালদুধ বা কলস্ট্রাম
জন্মের
ঠিক পর থেকে শুরুর ২/৩ দিন পর্যন্ত মা তার স্তন থেকে যে দুধ নিঃসরণ করে
তাকে শালদুধ বলা হয়। শালদুধ নিয়ে অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠিতে
অনেক কুসংস্কার আছে এজন্য অনেক নবজাতকই এমন দূর্লভ, অমূল্য একটি খাদ্য থেকে
জন্মের পরপরই বঞ্চিত হয়ে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে
শালদুধে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান (উচ্চমাত্রার আমিষ, স্নেহ ও শর্করা)
ছাড়াও রয়েছে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার বেশ কিছু জরুরী উপাদান
যার একটি ‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন এ’ নামে
পরিচিত। এটা শিশুকে রক্তের ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে। এছাড়া শাল দুধ
শিশুর ক্ষুদ্রান্তকে ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা করে এবং শিশুকে
কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝামেলা থেকে বাচায়। তাই প্রত্যেক সচেতন অভিভাবকের অবশ্য
কর্তব্য জন্মের পর পর শিশুর শালদুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা
মনে
রাখা প্রয়োজন শিশুর মায়ের বুকের দুধ একমাত্র মানব সন্তানের জন্যই তৈরী
করা হয়েছে। অন্য কোনো প্রানীর দুধ অবশ্যই অন্য কোনো প্রানীর সন্তানের জন্য
তৈরী করা হয়েছে। অন্য কোনো পশুর চাহিদা এবং মানব শিশুর চাহিদা কখনো এক
হতে পারেনা। কৃত্রিম দুধ বা কৌটার দুধ কখনোই মায়ের দুধ থেকে তৈরী করা
হয়না তাই সেসব খাদ্য কখনোই মায়ের দুধের বিকল্প হতে পারেনা। তবে হ্যা
জন্মের পরপর মা যদি খুব অসুস্থ থাকে বা স্তন্য দানে অক্ষম হয় তখন নিরুপায় হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে
অন্য খাবার (দুধ) দেয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে শিক্ষিত পাঠকগন খুব নিশ্চিত
থাকবেন যে সেই দুধ কখনোই মায়ের দুধের সঠিক বিকল্প (Substitute) নয়।
কৃত্রিম দুধ বেশী পুষ্টি দেবে এমন ধারনা এখনো কারো থেকে থাকলে আশা করবো
তিনি এতক্ষনে তা থেকে অবশ্যই সরে এসেছেন। ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধই শিশুর প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টির যোগান দিতে পারে।মায়ের দুধ নিরাপদ, পরিস্কার, স্বাস্থ্যসম্মত, সহজপ্রাপ্য, শিশু খুব সহজেই তা হজম করতে পারে এমন নানাগুণ সম্বলিত অমূল্য এক প্রাপ্তি। একমাত্র মায়ের দুধই শিশুর প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় থাকে এবং শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়। মায়ের দুধে শিশুর রোগ প্রতিরোধের এমন কিছু উপাদান আছে যা শিশুকে অনেক রোগের হাত থেকে বাচায় এবং মস্তিস্ক গঠন ও বৃদ্ধিতে সহয়তা করে, মায়ের দুধ পান শিশুর চোয়াল, দাত ও মাড়ি গঠনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। মায়ের দুধপান করা শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগেনা এবং এসব শিশুর শিশুমৃত্যুর হার ও কম।
স্তন্য
দানে মায়ের সাথে শিশুর একটি বিশেষ বন্ধন তৈরী হয় এবং এর ফলে মায়ের স্তন
ক্যান্সার হবার ঝুকি কমে যায়। প্রাকৃতিক পরিকল্পনার একটি অঙ্গ হলো এই
দুগ্ধদান, এর ফলে মায়ের ডিম্বানু নিষেকের সময় পিছিয়ে যায় এবং দ্রুত
আরেকটি সন্তান হবার ঝুকি কমে যায়। সন্তান প্রসবের পর মহিলাদের
যৌনাঙ্গ/প্রসবের পথ পূর্বাবস্থায় দ্রুত ফিরিয়ে আনতে স্তন্যদান বিশেষ
কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
বুকের দুধ সম্পর্কে কিছু প্রশ্নোত্তর
- প্রঃ সব মা'কি বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন?
উঃ হ্যা বিশেষ কোনো রোগাক্রান্ত না হলে সব মা'ই বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন।
- প্রঃ সব মা'এর কি পর্যাপ্ত বুকের দুধ হয়?
উঃ হ্যা, মা শিশুর চাহিদা মতো বুকের দুধ দিলে এবং দিতে চাইলে পর্যাপ্ত পরিমান দুধ তৈরী হবে। মা যদি মনে করেন যে তার যথেষ্ট দুধ নেই তাহলে তাকে আস্থা ও উৎসাহ দিতে হবে।
- প্রঃ বুকের দুধ কি নষ্ট হতে পারে?
উঃ না, বুকের দুধ নষ্ট হয়না, এটা সব সময়ই বিশুদ্ধ এবং নিরাপদ।
- প্রঃ স্তনের বোটায় ঘা বা ক্ষত হলে কি করতে হবে?
উঃ বুকের সামান্য দুধ বের করে তা বোটার ক্ষতস্থানে লাগিয়ে শুকিয়ে নিলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এ ছাড়া হাল্কা গরম শেক দেয়া যেতে পারে। এরপর ও সমস্যার সমাধান না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটি খুব সাধারন এবং বহুল প্রচলিত একটি সমস্যা।
- প্রঃ বোতলে দুধ খাওয়ালে কি শিশুর কোনো ক্ষতি হয়?
উঃ হ্যা, বোতলে দুধ খাওয়ালে শিশুর অনেক রকম ক্ষতির সম্ভাবনা আছে। এর ফলে শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং শিশুর ঘন ঘন পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হয়। এর ফলে শিশু অতি মূল্যবান এবং দুষ্প্রাপ্য মায়ের দুধ থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
- প্রঃ শিশু বড় হলে দুধ ছাড়তে না চাইলে কি করতে হবে?
উঃ বাচ্চাকে দুধ ছাড়ানোর প্রধান উপায় হলো সঠিক বয়সে তাকে উপযুক্ত খাবারে অভ্যস্ত করা। শিশুকে তার পাচ ছয় মাস বয়স থেকে বয়সানুপাতিক খাবারে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করার ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে।
- প্রঃ হঠাৎ করে দুধ ছাড়ানোর জন্য স্তন বোটায় করলার রস দেয়া যাবে কি?
উঃ হঠাৎ করে শিশুকে দুধ ছাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই এবং এটা শিশুর জন্য ক্ষতিকর, শিশুকে স্বাভাবিক খাবারে অভ্যস্থ করতে হবে। স্তনে অনেক সময় উলটা পালটা জিনিষ লাগালো স্তনবৃন্ত এবং শিশু উভয়েরই ক্ষতি হতে পারে।