লিভার / যকৃৎ এর বিভিন্ন রোগ, লক্ষন, পরামর্শ

জন্ডিস (Jaundice)

সত্যিকার অর্থে জন্ডিস কোনো রোগ নয়, এটা রোগের একটা উপসর্গ। জন্ডিস সম্বন্ধে কম বেশী সবাই কিছু না কিছু জানে। এ রোগে চোখের সাদা অংশ, হাত-পা এর তালু, মুখমন্ডল থেকে শুরু করে সমস্ত শরীরই হলুদ বর্ণের হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে দুর্বলতা, গা ম্যাজ ম্যাজ করা, বমি বমি ভাব, রুচিহীনতা, পায়খানার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, শরীর চুলকানো সহ নানা উপসর্গ থাকাটা জন্ডিস এর নিত্য সঙ্গী।
রক্তে বিলিরুবিন এর মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস হয়। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার অনেকগুলো কারন আছে তাই জন্ডিস হবার কারনও অনেকগুলো। রক্তকণিকা অতিরিক্ত পরিমান ভেঙ্গে যাওয়া, পিত্তনালীতে পাথর/টিউমার/ক্রিমি বা অন্য কারনে বাধার সৃষ্টি হওয়া, যকৃত বা লিভারের জন্মগত কিছু ত্রুটি, লিভার প্রদাহ বা হেপাটাইটিস হওয়া সহ নানাবিধকারনে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

যেহেতু জন্ডিস রোগের কারণ অনেকগুলো তাই কারণ নির্ণয় ও রোগের অবস্থা জানার জন্য রোগীকে অনেকগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা ও ধরণ, লিভার এনজাইম, ভাইরাল মার্কার, প্রথমবিন টাইম থেকে শুরু করে আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে বায়োপসি বা কোলাঞ্জিওগ্রাম ও করা লাগতে পারে।
এতোক্ষনে নিশ্চয়ই পাঠকের বোঝা হয়ে গেছে যে সব ধরনের জন্ডিস এর চিকিৎসা এক হবেনা, ঠিক তাই ঠিক যে কারনে জন্ডিস হয়েছে তা নির্ণয় করে সেই কারনটির চিকিৎসা করাই হলো জন্ডিস চিকিৎসার মূল লক্ষ্য। যেমন কিছু কিছু প্রকৃতির জন্ডিস হলে তার কোনো চিকিৎসারই প্রয়োজন নেই (যেমন গিলবার্ট ডিজিজ), তেমনি কিছু জন্ডিস শুধু বিশ্রাম নিলেই ভালো হয়ে যায়, কিছু আবার কোনো চিকিৎসাতেই ভালো হয়না, তেমনি কিছু আছে অপারেশন করলে একদম পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়। তাই নিজে নিজে বেশী করে পানি খাওয়া, আখের রস খাওয়া বা রোদে না গিয়ে বিশ্রাম নেয়া ইত্যাদি জাতীয় চিকিৎসা না নিয়ে সকলের উচিত চিকিৎসকের কাছ থেকে এ রোগের সঠিক কারণ ও প্রতিকার জেনে নেয়া। জন্ডিস এর অন্যতম কারন হেপাটাইটিস এবং বিএর টিকা নিয়ে এ রোগের হাত থেকে অতি সহজেই বাঁচা যায়, তাই চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেয়া উচিত আপনি এই টিকা নিতে পারবেন কিনা।

পিত্তনালির ক্যান্সার (Cancer of the Bile duct)

খুব কম লোকেরই পিত্তনালিতে ক্যান্সার হতে দেখা যায় তবে একবার ক্যানার হলে তা সারানোও আবার তেমনই দুস্কর। সাধারনত ৬০ বছরের বেশী বয়স্ক লোকদের এই ক্যান্সার হতে দেখা যায়। এ রোগে রোগীর পেটের উপরের অংশে সামান্য ব্যথা হয় সেই সাথে খুব দ্রুত ওজন কমতে থাকে এবং জন্ডিস দেখা দেয়। এই ধরনের জন্ডিসে শরীরে খুব চুলকানি হয় এবং পায়খানার রঙ সাদাটে হয়ে যায়। পরীক্ষা করলে দেখা যায় রোগীর লিভার বেশ বড় হয়ে গেছে। পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করালে ক্যান্সার সম্বন্ধে ধারনা পাওয়া যায়। বায়োপসি করার মাধ্যমে রোগটি সম্পর্কে শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়। এই রোগের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো যখন তা ধরা পড়ে ৯০% রোগীরই চিকিৎসার নেবার কোনো সুযোগ থাকেনা। শতকরা মাত্র ৫-১০ ভাগ রোগীকে অপারেশনের মাধ্যমে সুস্থ্য করে তোলার সুযোগ থাকে। অপারশনের মাধ্যমে রোগীর লিভার এর বিশাল একটি অংশ এবং পিত্তনালি কেটে ফেলে দেয়া হয়। অপারেশন না করানো গেলে সমীক্ষা অনুযায়ী ৯০% রোগীরই একবছরের মধ্যে মৃত্যুর আশংকা থাকে। সফল অপারেশনের পর ২০ শতাংশ রোগীর ৫ বছরের বেশী দীর্ঘায়ু হবার সম্ভাবনা থাকে।

পিত্তথলির এমপায়েমা (Empyema of the Gall bladder)

পিত্তথলির ভেতরে পুঁজ (Pus) জমে তা যদি বিশাল আকার ধারন করে তাকে এমপায়েমা বলা হয়। সাধারনত পিত্তথলির প্রদাহ বা কলিসিস্টাইটিস, পিত্তথলির মিউকোসিল বা পিত্তথলি বা পিত্তনালির টিউমারের জটিলতা হিসেবে এই রোগটি দেখা দেয়। পিত্তথলিতে ইনফেকশন হবার কারনেই মুলত এতে পুঁজ জমে এবং এমপায়েমা হয়। এর ফলে রোগীর তীব্র জ্বর হয়, পেটের উপরের অংশে ব্যথা হয় এবং রোগী শারীরিক ভাবে বেশ অসুস্থ হয়ে পরে। তার পেটের উপরের অংশে শক্ত চাকার মতো একটি অংশ ফুলে উঠে। আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখতে হয় যে এটা পিত্তথলি থেকে উঠেছে কিনা এর পর এসপিরেশন করে নিশ্চিত হতে হয় যে এটা এমপায়েমা। এমপায়েমা হলে প্রথমে পিত্তথলির পুঁজ বের করে দিতে হয়, এর পর অপারেশন করে পিত্তথলিটি ফেলে দিতে হয়। অপারশনের পর রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। তবে এমপায়েমা যদি টিউমার বা ক্যান্সার এর জটিলতার কারনে সৃষ্টি হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে রোগীর পুরোপুরি আরোগ্য লাভের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রকৃত রোগটির চিকিৎসার উপর।

পিত্তথলির প্রদাহ (Cholecystitis / Acalculous Cholecystitis)

পিত্তথলির প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কে বলা হয় কলিসিস্টাইটিস। অনেকের ধারনা পিত্তথলিতে পাথর হলেই শুধু এ রোগ হয় কিন্ত বাস্তবতা ভিন্ন, পাথর হওয়া ছাড়াও এ রোগ হতে পারে। এ রোগ হলে পেটের উপরের দিকে ডান পাশে তীব্র ব্যথা হয় যাকে অনেকে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যথা বলে থাকেন। এটা সাধারনত মিনিট খানেক স্থায়ী হয় তবে তা ঘণ্টা খানেক ও থাকতে পারে। ব্যথাটি পেটের পিছনের দিকে, কাধে, পেটের মাঝ বরাবর এবং বুকের ভেতরেও ছড়িয়ে পরতে পারে। সেই সাথে বমি বমি লাগা বা বমি করে ফেলা, হাল্কা জ্বর এই সব উপসর্গও থাকতে পারে।
কলিসিস্টাইটিস এর ব্যথা অত্যন্ত তীব্র এবং এমন ব্যথা হলে সাথে সাথে রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাওয়া উচিতরোগটি নিশ্চিত করার জন্য প্রথমেই পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষাটি করে নিতে হয়, সেই সাথে কিছু রক্তের পরীক্ষা, ইসিজি, এক্সরে এই সব পরীক্ষা করে দেখতে হয় ব্যথার অন্য কোনো কারন আছে কিনাএছাড়াধরনের রোগীর খুব গ্যাসের সমস্যা থাকে দেখে অনেক সময় পাকস্থলীএন্ডোসকোপি পরীক্ষা করে দেখতে হয় তাতে আলসার হয়েছে কিনাপশ্চিমা দেশগুলোতে অনেক সময় এই রোগে কোলাঞ্জিওগ্রাম অথবা ,আর,সি,পি পরীক্ষাটিও করিয়ে নেয়া হয়
ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীকে মুখের সবধরনের খাবার বন্ধ করে স্যালাইন দেয়া হয়, সেই সাথে ব্যথার অসুধ, গ্যাসের অসুধ এবং এন্টিবায়োটিকও দেয়া হয়৯০% এর বেশী রোগীই এই চিকিৎসাতে সুস্থ হয়ে যানএরপর চিকিৎসক রোগের কারন প্রকৃতি বুঝে রোগীকে অপারশন করে পিত্তথলি ফেলে দেবার (Cholecystectomy) প্রয়োজন আছে কিনা তার পরামর্শ দেনঅনেক সময়ই এই রোগে রোগীর অপারেশন বা কলিসিস্টেকটমি করার প্রয়োজন হয় তবে অনেক সময় শুধু অসুধ সেবনেও রোগী ভালো থাকতে পারেনঅবশ্য এটা নির্ভর করে রোগটি কি কারনে হয়েছে তার উপরতাই আপনার চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন কি কারনে আপনার এই রোগটি হয়েছে এবং তার পরামর্শ অনুযায়ীই চিকিৎসা চালিয়ে যান

ক্যারোলিস ডিজিজ (Caroli’s Disease)

এটা পিত্তনালির জন্মগত একটি ত্রুটি। এই রোগে যকৃতের মধ্যবর্তী পিত্তনালির অংশ অনিয়মিত ভাবে বড় হয়ে যায় এবং একই সাথে এর বিভিন্ন অংশ সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে ঐ সকল সংকুচিত অংশে পাথর হতে পারে এবং প্রদাহ বা কোলাঞ্জাইটিস হতে পারে। এ রোগটি নিয়ে জন্মানো শিশুর সংখ্যা খুব বেশী নয়, আর যারা এ ত্রুটি নিয়ে জন্মায় কৈশর বা প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে তাদের তেমন কোনো সমস্যা হতেও দেখা যায়না। যদি এর ফলে কোনো সমস্যা হয়েই থাকে তাহলে পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করে তা দেখতে হয়। কোলাঞ্জিওগ্রাম বা ই,আর,সি,পি পরীক্ষাটি এই ক্ষেত্রে আরো নির্দিষ্ট ভাবে রোগ নির্নয়ে সাহায্য করে। প্রদাহ বা কোলাঞ্জাইটিস হলে এন্টিবায়োটিক সেবনে তা ভালো হয়ে থাকে, পাথর হলে অপারশন করে তা অপসারন করতে হয়। অনেক সময় ক্যারোলিস রোগটি হলে রোগীর পিত্তনালিতে ক্যান্সার (Cholangiocarcinoma) হতে দেখা যায়। তাই এই রোগের চিকিৎসার ব্যপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।


পিত্তথলি (Gall bladder)

পিত্ত ও পিত্তথলি দুটো শব্দই আমাদের কাছে খুব পরিচিত। আমাদের গৃহীত খাদ্য দ্রব্য হজম বা বিপাকে পিত্ত যে খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই বিশ্বাসও বোধকরি সব পাঠকেরই আছে। এই পিত্তরস বা বাইল (Bile) নিঃসৃত হয় যকৃত বা লিভার থেকেএর প্রধান কাজ স্নেহ জাতীয় খাবার কে ভেঙ্গে হজম বা বিপাকে সহায়তা করা।
লিভার নিয়মিত নির্দিষ্ট হারে বাইল তৈরী নিঃসরন করতে থাকে, বাইল কিন্ত লিভার থেকে সরাসরি আমাদের অন্ত্রে চলে যায়নাঅন্ত্রে যাবার আগে যে ছোট্ট থলিটির মধ্যে তা জমা থাকে তার নামই গলব্লাডার বা পিত্তথলিআমরা যখন খালি পেটে থাকি তখন এই গলব্লাডার এর মুখ বন্ধ থাকে এবং খাবার পরপরই তা থেকে আমাদের ক্ষুদ্রান্তে বাইল বা পিত্তরস বের হয়ে আসে
পিত্তথলির অবস্থান লিভার বা যকৃত এর ঠিক নিচে আমাদের পেটের উপরেদিকে ডান পাশেপিত্তথলি থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা একটি থলি যাতে তরল বাইল এসে জমা হয়পিত্তথলির কাজ হলো এই যকৃত নিঃসৃত পিত্তরসকে থেকে ১০গুন ঘন করা, মিউকাস নিঃসরন করে একে পিচ্ছিল বানানো এবং অন্ত্রে পিত্তরসের নিঃসরনের মাত্রা নির্ধারন করাগল ব্লাডারে নানা ধরনের রোগ হতে পারে যেমন প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন (Cholecystitis), পাথর জমা (Cholelithiasis or Gall stone disease), মাত্রাতিরিক্ত মিউকাস জমা (Mucocele), পুঁজ জমা (Empyema), ক্যান্সার হওয়া (Cancer) ইত্যাদিএই সব রোগ হলে গলব্লাডারটি অপারেশন করে ফেলে দিতে হয়গলব্লাডার ফেলে দেবার পর মানুষ সম্পুর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেখাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তন আনা ছাড়া অন্য কিছুতে এর তেমন কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয়না

পিত্তনালিতে ক্রিমি (Biliary ascariasis)

আমাদের দেশের প্রায় সব মানুষই কোনো না কোনো সময় কৃমি (Worm, helminthiasis) রোগে ভুগে থাকেন। এসব ক্রিমির মধ্যে গোল কৃমি (Round worm, Ascaris lumbricoides) অন্যতম। এই গোল কৃমি একসময় চলতে চলতে ক্ষুদ্রান্ত হয়ে পিত্তনালিতে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে আক্রান্ত মানুষের পেটের উপড়ের অংশে তীব্র ব্যথা হয় এবং মানুষটি সাথে সাথে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর ফলে একসময় পিত্তনালির সরু হয়ে যাওয়া, ঘা হয়ে পুঁজ হয়ে যাওয়া, যকৃত এবং পিত্তথলিতে পুঁজ জমে যাওয়া সহ নানা জটিল পরিস্থিতির আবির্ভাব ঘটতে পারে। তবে কৃমিটি যদি জীবিত অবস্থায় শুধু পিত্তনালির মুখে প্রবেশ করা অবস্থায় চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া যায় তাহলে তা কেবল অসুধ সেবনের মাধ্যমে পিত্তনালি থেকে বের করে দেয়া যায়
এর পর যথারীতি রোগীকে কৃমিনাশক অসুধ খাইয়ে এই রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচানো সম্ভবতবে অসুধে কাজ না হলে ERCP করেও ক্রিমিটি বের করে নিয়ে আসা যায়কৃমিটি যদি পিত্তনালিতে মারা গিয়ে থাকে বা আটকে যায় বা অন্য জটিল কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে তাহলে রোগীর অপারেশন (Choledochotomy) লাগতে পারে। অপারেশন করে ক্রিমি বা এর সৃষ্ট জটিলতা সরিয়ে দিলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। নিয়মিত ৬ মাস পরপর ক্রিমিনাশক খেলে এই রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

পিত্তথলির পাথর (Gall stone disease / Cholelithiasis)

পিত্তথলিতে পাথর হওয়া আমাদের চারপাশের অতিপরিচিত রোগ গুলোর মধ্যে একটি, আত্মীয়স্বজনের কারো পিত্তথলিতে পাথর হয়নি বা এজন্য গলব্লাডার ফেলে দিতে হয়নি এমন লোক মনে হয় খুঁজে পাওয়া দুস্কর হবে। সত্যিই কি পাথর হয় না এগুলো অন্য কিছু। এসব কি সত্যিকারের পাথরের মতো, কিভাবে ওখানে গেলো ওসব এ জাতীয় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আমাদের মনে।
হ্যাসত্যি সত্যিই পিত্তথলিতে পাথর হয়কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম, বিলিরুবিন ইত্যাদির সংমিশ্রনে যে পাথর গুলো পিত্তথলিতে হয় তা দেখতে অনেকটাই রাস্তার পাথরের মতোএদের কোনোটি ময়লা সাদা, কোনোটি হাল্কা বাদামী আবার কোনোটি একদম কুচকুচে কালো বর্ণের হয়
সাধারনত স্থুলাকায় মানুষের এই রোগ বেশী হতে দেখা যায়, মহিলাদের মাঝেও এই রোগ হবার প্রবনতা বেশীযারা চর্বি জাতীয় খাবার বেশী খান ৪০ এর কাছাকাছি বয়সে তাদের এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেশী এমন একটা শক্ত ধারনা খুব প্রচলিতপিত্তথলিতে পাথর হলে এতে প্রদাহ বা কলিসিস্টাইটিস হয়তখন পেটের উপরেদিকে ডান পাশে তীব্র ব্যথা হয় যাকে অনেকে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যথা বলে থাকেনএটা সাধারনত মিনিট খানেক স্থায়ী হয় তবে তা ঘণ্টা খানেক থাকতে পারেব্যথাটি পেটের পিছনের দিকে, কাধে, পেটের মাঝ বরাবর এবং বুকের ভেতরেও ছড়িয়ে পরতে পারেসেই সাথে বমি বমি লাগা বা বমি করে ফেলা, হাল্কা জ্বর এই সব উপসর্গও থাকতে পারে
কলিসিস্টাইটিস এর ব্যথা অত্যন্ত তীব্র এবং এমন ব্যথা হলে সাথে সাথে রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাওয়া উচিতহেপাটোবিলিয়ারি সার্জন বা জেনারেল সার্জন উভয়েই এই রোগের বিশেষজ্ঞ সার্জনতাদের তত্ত্বাবধানেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া উচিতরোগটি নিশ্চিত করার জন্য প্রথমেই পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষাটি করে নিতে হয়, সেই সাথে কিছু রক্তের পরীক্ষা, ইসিজি, এক্সরে এই সব পরীক্ষা করে দেখতে হয় ব্যথার অন্য কোনো কারন আছে কিনাএছাড়া ধরনের রোগীর খুব গ্যাসের সমস্যা থাকে দেখে অনেক সময় পাকস্থলীএন্ডোসকোপি পরীক্ষা করে দেখতে হয় তাতে আলসার হয়েছে কিনাপশ্চিমা দেশগুলোতে অনেক সময় এই রোগে কোলাঞ্জিওগ্রাম অথবা ,আর,সি,পি পরীক্ষাটিও করিয়ে নেয়া হয়
চিকিৎসার শুরুতে রোগীকে মুখের সবধরনের খাবার বন্ধ করে স্যালাইন দেয়া হয়, সেই সাথে ব্যথার অসুধ, গ্যাসের অসুধ এবং এন্টিবায়োটিকও দেয়া হয়শতকরা ৯০ ভাগ রোগীই এই চিকিৎসায় সুস্থ বোধ করেনএরপর চিকিৎসক সময় বুঝে রোগীকে অপারশন করে পিত্তথলি ফেলে দেবার (Cholecystectomy) পরামর্শ দেনপ্রায় সময়ই এই ভর্তিতেই অপারেশন বা কলিসিস্টেকটমি করে দেয়া হয়তবে রোগীর অন্য কোনো সমস্যা থাকলে -মাস পরেও এটা করা যেতে পারেপেট কেটে এবং মেশিনের সাহায্যে সামান্য ফুটোকরে দুভাবেই কলিসিস্টেকটমি করা যায়শুধু পিত্তনালীতে (Biliary tree) পাথর হলে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অপারেশন না করে শুধু ,আর,সি,পি (ERCP) করেও তা সরিয়ে ফেলা যায়, পিত্তথলিতে পাথর হলে তেমন করার সুযোগ থাকেনামনে রাখতে হবে শুধু অসুধ সেবনে পিত্তথলির পাথর ভালো করে দেয়া সম্ভব নয়, তাই এই ধরনের প্রচারনায় বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক হবেনা
অনেক সময় পিত্তথলিতে পাথর হলেও রোগী কোনো প্রকার ব্যথা বা অন্য সমস্যা অনুভব করেনাসাধারনত অন্য কোনো রোগের জন্য পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়ে এটা ধরা পরেএসব ক্ষেত্রে অনেক চিকিৎসকই কলিসিস্টেকটমি না করে অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং ব্যথা হলে তবেই অপারেশন করাতে বলেনতবে এই নিয়ে বিতর্ক আছে কারন অনেক দিন পাথর থাকা অবস্থায় অপারেশন না করালে তা ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে এসব বিষয়ও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছেতাই সব দিক বিবেচনা করে পিত্তথলিতে পাথর হলে তা একজন অভিজ্ঞ সার্জন কর্তৃক ল্যাপকলির মাধ্যমে অপারেশন বা ল্যাপারোস্কপিক কলিসিস্টেকটমি করিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে

পিত্তথলির ক্যান্সার (Cancer of Gall bladder)

পিত্তথলি বা গল ব্লাডার এ পাথর হলে তা অপারেশন করে ফেলে দেয়া হয় এবং অপারেশনের পরপর সাধারনত ঐ পিত্তথলিটির বায়োপসি পরীক্ষা করানো হয়। এ ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দেখা যায় যে পাথর ভর্তি গলব্লাডার এ ক্যান্সার হয়ে গেছে। এমনিতে গলব্লাডারে ক্যান্সার হয়ে খুব বেশী রোগী যে ডাক্তার এর কাছে আসেন তা কিন্ত নয় বরং অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় এই অঙ্গটির ক্যান্সার হবার হার তুলনামুলকভাবে অনেক কম।
সাধারনত দীর্ঘ দিন ধরে যারা পিত্তথলির পাথরে ভুগেন বা যাদের পিত্তথলি ক্যালসিয়াম জমে শক্ত হয়ে যায় তাদের মাঝেই এই ক্যান্সার হবার প্রকোপ বেশী।
কারো যদি আগে থেকে পিত্তথলিতে পাথর থেকে থাকে এবং নতুন করে পেটের উপড়ের ডান দিকে তীব্র ব্যথা হয় এবং চাকার মতো একটা ফুলে উঠে বা সেই সাথে জন্ডিস শুরু হয় অনুমান করা হয় তাদের হয়তো পিত্তথলিতে ক্যান্সার এর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তবে সত্যিই যদি ক্যান্সার এর সাথে জন্ডিস থাকে তাহলে বোঝা যায় যে ক্যন্সারটি অনেক দূর এগিয়েছে।
রক্তে CA 19-9 নামক মারকার পাওয়া গেলে অনেক সময় অনুমান করা যায় যে গলব্লাডার এ ক্যান্সার হয়েছে। এমন অনুমান হলে গল ব্লাডার এর বায়োপসি তো করাতে হয়ই তার সাথে কোলাঞ্জিওগ্রাম, পেট ও বুক এর সিটি স্ক্যান, লিভার এর এনজিওগ্রাম সহ ল্যাপারোস্কপি করে দেখতে হয় রোগটা কতদুর ছড়িয়েছে। ক্যান্সার যদি শুধু পিত্তথলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে রোগীর সেই ক্যান্সার নিয়ে বাড়তি ঝুকির সম্ভাবনা খুব কম, তবে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে রোগীর মৃত্যুর ঝুকি বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় লিভার এর ডান পাশের অর্ধেকটা ফেলে দিয়ে রোগীর ক্যান্সার নিরাময়ের চেষ্টা করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার এ কেমোথেরাপিও ব্যবহার করা হয়। তবে পিত্তথলির ক্যান্সার এর সাথে যদি এর কারনে জন্ডিস এর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে এর পরিনতি ভয়াবহ বলেই ধরে নেয়া হয়।

কলিডোকাল সিস্ট (Choledochal Cyst)

কলিডোকাল সিস্ট খুব বেশী পরিচিত কোন রোগ নয় তবে এই রোগটি হলে তা ক্যান্সারে রূপান্তরিত হবার সুযোগ থাকে বলে এর ব্যাপারে চিকিৎসকগন একটু বেশী সচেতন। এটা পিত্তনালির একটি রোগ, এটি হলে পিত্তনালি অস্বাভাবিক বড় হয়ে যায়। বার বার কারো প্যানক্রিয়াটাইটিস বা অগ্নাশয়ের প্রদাহ হলে এই রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে। এ রোগে অনেক সময়ই রোগীর কোনো উপসর্গ দেখা যায়না কিন্ত জটিলতা হলে জন্ডিস দেখা দেয়, সেই সাথে তীব্র কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, পেটের উপড় অংশে প্রচন্ড ব্যথা, বমি, পেট ফুলে যাওয়া সহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম করলে রোগটি নির্নয় করা সম্ভব তবে এম,আর,আই পরীক্ষাটি করালে এর সম্বন্ধে পূর্ন ধারনা পাওয়া যায়। যেহেতু এ রোগে ক্যান্সার হওয়ার ঝুকি অনেক তাই অপারেশন করে পিত্তনালির বড় হয়ে যাওয়া অংশটি ফেলে দেয়াই একমাত্র চিকিৎসা। এর পর পিত্তনালির সাথে ক্ষুদ্রান্তের একটি অংশের জোড়া দিয়ে রোগীর পিত্তরসের স্বাভাবিক গতিপথ নিশ্চিত করা হয়। এমন রোগ হলে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করানো উচিত কারন একবার এ থেকে পিত্তনালিতে ক্যান্সার হয়ে গেলে তার পরিনতি খুব ভয়াবহ বলেই প্রমানিত।

পিত্তথলির মিউকোসিল (Mucocele of the Gall bladder)

পিত্তথলিতে কোনো কারনে মিউকাস জমে যদি তা বিশাল বড় হয়ে যায় তাকে মিউকোসিল বলা হয়। সাধারনত পিত্তথলিতে পাথর হলে তার সরু অংশে যদি পাথরটি আটকে যায় তার ফলে এমন রোগ হতে পারে। এছাড়া পিত্তথলিতে টিউমার হলেও এমনটি হতে পারে। এর ফলে পিত্তথলিটি ফুলে এত বড় হয়ে যায় যে তা পেটের উপড়ের অংশে একটা চাকার মত দলা হয়ে দেখা দিতে পারে। এর ফলে রোগীর পেটে ব্যথা হতে পারে। মিউকোসিল এ ইনফেকশন হলে তা এমপায়েমায় পরিণত হতে পারে এবং তারে রোগীর তীব্র জ্বর সহ পেটে ব্যথা এবং দুর্বলতা, বমি বমি ভাব সহ অন্য উপসর্গ গুলোও দেখা যেতে পারে। এমন রোগ হলে রোগীকে অপারেশন করে পিত্তথলি ফেলে দিতে (Cholecystectomy) হয়। এই অপারেশনের পর রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।


^উপরে যেতে ক্লিক করুন