ফুসফুসের ক্যান্সার (Lung Cancer)
অন্যান্য অঙ্গে ক্যান্সার হবার চেয়ে তুলনামুলক ভাবে ফুসফুসে ক্যান্সার হবার হার একটু বেশী। কারন আর কিছু নয়, ফুসফুসের উপর প্রতিনিয়ত
অত্যাচার চালানোই এজন্য দায়ী। আমাদের চারপাশের পরিবেশে ক্যান্সার হবার
মতো যতো উপাদানই থাকুকনা কেনো জেনে হোক বা না জেনে হোক প্রায় সবকিছুই আমরা
শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে ঢুকিয়ে দেই, তা ছাড়াও শরীরের অন্য কোথাও ক্যান্সার হলে সেখান থেকেও রক্তের মাধ্যমে ফুসফুসে তা চলে আসার সম্ভাবনা খুব বেশী, তাই ফুসফুসে তো ক্যান্সার হতেই পারে, তাইনা?
সাধারনত যারা খুব বেশী ধুমপান করেন তাদের এই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা খুব বেশী। পাশাপাশি যারা ঝুকিপূর্ণ পেশায় জড়িত যেমন এসবেষ্টস কারখানায় যারা কাজ করে, বা প্রচুর ধুলাবালির মধ্যে যাদের কাজ করতে হয় তাদের ও এই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা খুব বেশী। এছাড়া বংশগত কারনেও এমন ক্যান্সার হতে দেখা যায়।
সাধারনত ৪০ উর্ধ্ব ধুমপায়ী বা তামাকসেবী লোকজনের মধ্যে এই ক্যান্সার দেখা দেয়, বৃদ্ধ বয়সে ক্যান্সার হবার ঝুকি আরো বাড়তে থাকে, তবে ৪০ এর কম বয়সের লোকজনেরও এই রোগ হতে পারে। কাশি এই রোগের অতিপরিচিত একটি লক্ষন, দীর্ঘমেয়াদী কাশি সেই সাথে হলদেটে কফ হওয়া বা কফের সাথে রক্ত যাওয়া এসব ফুসফুসের ক্যান্সার এর লক্ষন। এই ক্যান্সারে বুকে খুব ব্যথা হতে পারে যা সহজে সারতে চায়না। শ্বাস কষ্ট হওয়া, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা দেখা দেয়া, রুচিহীনতা, ঘন ঘন ক্লান্তি লাগা, ক্ষুদা মন্দা এই সবই ফুসফুস ক্যান্সার এর উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। অনেক রোগী এই রোগে ফুসফুসে পানি জমা, পাঁজরের হাড়ে ব্যথা এমনকি জন্ডিস নিয়েও আসতে পারে। কারো কারো আবার অভিযোগ থাকে শুধু একপাশের হাতে ব্যথা এবং কাশি। তাই বৃদ্ধ বয়সের ধুমপায়ী রোগী কোনো প্রকার শ্বাস কষ্ট নিয়ে আসলে চিকিৎসক গন ফুসফুস ক্যান্সার এর কথা মাথায় রাখেন।
এই ক্যান্সার সন্দেহ হলে রোগীকে বুকের এক্সরে করাতে হয় এবং তাতে টিউমারের মতো কিছু পেলে তা থেকে বায়োপসি করে নিশ্চিত হতে হয় এটা সত্যিই ক্যান্সার কিনা বা ক্যান্সার হলেও এটা কোন ধরনের ক্যান্সার। এছাড়া রোগীর কফ পরীক্ষা, নানা ধরনের রক্তপরীক্ষা, বুকের সিটি স্ক্যান, পেটের আলট্রাসনোগ্রাম সহ নানা ধরনের পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হতে পারে। আগেই বলেছি শরীরের অন্য কোথাও ক্যান্সার হলেও তা ফুসফুসে চলে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসা পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের হয় তাই এটা জানা খুব জরুরী যে ধরাপড়া ক্যান্সার টি সত্যিই ফুসফুসের ক্যান্সার না অন্য কোনো অঙ্গ থেকে এসেছে।
অন্য যেকোনো ক্যান্সারের মতো ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসাও বেশ জটিল। প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ ধরা পড়লে অপারেশন এর মাধ্যমে ফুসফুসের অংশ বিশেষ (Lobectomy) বা রোগাক্রান্ত একপাশের ফুসফুস কেটে (Pneumonectomy) ফেলে দিলে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তবে রোগ যতো দেরীতে ধরা পড়ে চিকিৎসাও তত বেশী জটিল হয়। এক পর্যায়ে অপারশনের সাথে সাথে কেমোথেরাপী নেবারও প্রয়োজন হতে পারে। রোগ খুব বেশী দেরীতে ধরা পড়লে তা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং অপারেশনের কোনো সুযোগ থাকেনা, শুধু কেমোথেরাপীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেক্ষেত্রে সুস্থ হবার সম্ভাবনাও কমতে থাকে। এই ক্যান্সার ফুসফুস থেকে মস্তিস্ক এবং অস্থিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিশ্বের অনেক হাসপাতালে এই অবস্থাতেও অপারেশন করে চিকিৎসা করার দৃষ্টান্ত আছে। তাই খুব সহজেই নিরাশ হবার কিছু নেই। সঠিক সময়ে রোগ নির্নয় করা গেলে অধিকাংশ রোগীই ৫ বছরের বেশী সময় বেঁচে থাকতে দেখা যায় তবে সমস্ত শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে এই হার নগন্য হয়ে দাঁড়ায়।
হাপানী (Asthma)
এজমা ফুসফুসের
বিশেষ প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন জাতীয় একটি রোগ যা এর আবরণী কোষ গুলোর বর্ধিত
সংবেদনশীলতার কারনে হয়ে থাকে। এজমায় আক্রান্ত রোগীর শ্বাস কষ্ট, বুক
চেপে ধরে থাকার অনুভুতি,শ্বাস টান সাথে কফ কাশি এই ধরনের উপসর্গ গুলো থেকে
থাকে।
এটা পারিবারিক
ভাবে বাহিত একটি রোগ, বাবা মা কারো এই রোগ থাকলে সন্তানের এই রোগ হবার
ঝুকি খুবই বেড়ে যায়, তবে বাবা-মা এর এজমা না থাকলে সন্তানের এজমা হতে
পারবেনা এমনটিও কিন্ত ভাবা ঠিক হবেনা।
এজমা রোগীর কোনো কোনো বিশেষ কিছুতে এলার্জি থেকে থাকে, এদের বলা হয় এলারজেন (allergen)
এবং এসবের সংস্পর্শে আসলেই এজমার আক্রমন ঘটে। এজমা রোগীদের জন্য এই
এলারজেন গুলো সনাক্ত করে নেয়া খুবই জরুরী। এগুলো হলো ঘরের পুরোনো কাপড়
ঝাড়া ধুলো বা অন্য কোনো ধুলো, ফুলের রেণু, বিশেষ বিশেষ খাবার, পশুপাখীর
শুকনো বিষ্ঠা, পালকের তৈরী বালিশ ইত্যাদি। এছাড়া কেউ বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে
গেলে, ভারী ব্যয়াম করলে, আবহাওয়া পরিবর্তনে (যেমন শীত কালে), ফুসফুসের
ইনফেকশন হলে, নির্দিষ্ট কিছু পেশায় এমনকি বিশেষ কিছু অসুধ খেলেও এই রোগের
প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
এজমা রোগী
নিজে যত্নবান হলে এ রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়। এজমা একেবারে ভালো
করে দেবে এমন কোনো ঔষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি। তবে কিছু কিছু অসুধ এ
রোগের প্রকোপ কমাতে এবং নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে। রোগের প্রাথমিক
পর্যায়ে শুধু ইনহেলার (inhaler) জাতীয় শ্বাস নালীর প্রসারক বা ব্রঙ্কডাইলেটর (bronchodilator)
ব্যবহার করে এবং কিছু নিয়ম মেনে এটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়।
রোগের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে আরো শক্তিশালী ব্রঙ্কডাইলেটর ইনহেলার এবং
সঙ্গে ট্যাবলেট জাতীয় ব্রঙ্কডাইলেটর এমনকই স্টেরয়েড জাতীয় অসুধ ও
ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে বারবার অসুধের মাত্রা বাড়ানোর চেয়ে এ
রোগ নিয়ন্ত্রনের দিকে বেশী মনোযোগ দিলেই রোগী বেশী লাভবান হবে।
যক্ষা (Tuberculosis)
যক্ষা বা
টিবি একটি ইনফেকশন জাতীয় রোগ। এক সময় যদিও ধারনা ছিলো যে যক্ষা
একটি ভয়ানক মরণ ব্যাধি কিন্ত এখন বলা হয় যক্ষা হলে রক্ষা নাই এই কথার
ভিত্তি নাই । মূলত মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস (Mycobacterium tuberculosis)
নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমনের কারনে এই রোগ হয় যার সংক্ষিপ্ত নাম টিবি
বা টিউবারকল বেসিলাই আর সে কারনেই এই রোগ কে সংক্ষেপে টিবি রোগ বলা হয়।
তবে অন্য মাইকোব্যাকটেরিয়া জাতীয় জীবানু ও এই রোগ করতে পারে। টিবি কিন্ত
শুধু ফুসফুসেরই রোগ নয়, ফুসফুস ছাড়াও এটা শরীরের প্রায় সব অংগেই হতে
পারে।
ফুসফুসে যক্ষা
বা টিবি হলে সন্ধ্যা বেলায় জ্বর আসা, কফ কাশী, কাশীর সাথে রক্ত যাওয়া সহ
ক্ষুধামন্দা, ওজনহীনতা, অবসাদ ও ক্লান্তি, রাতে ঘুমের মধ্যে ঘেমে
যাওয়া সহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
কফ পরীক্ষা
যক্ষার সবচেয়ে নির্ভর যোগ্য পরীক্ষা, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রোগ
নির্নয় করতে এক্সরে পরীক্ষা এবং রক্ত পরীক্ষাও করা লাগে।
বিশ্বের
অন্যান্য দরিদ্র দেশের মতো বাংলাদেশেও যক্ষা রোগের অসুধ সরকারী হাসপাতাল
গুলোতে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দেয়া হয়। কোনো রকম অবহেলা ছাড়া সেই অসুধ
নিয়মিত ছয় (৬) মাস খেলে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।
ফুসফুসে পানি জমা (Pleural effusion)
অনেক সময়ই আমরা শুনি যে অমুকে শ্বাস কষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং তার ফুসফুস থেকে ১ লিটার বা দেড় লিটার পানি বের করে দেবার পর সে সুস্থ হয়ে গেছে। এসব খবর আমাদের কাছে চাঞ্চল্যতা সৃষ্টি করলেও প্রকৃতপক্ষে ঐ পানি কিন্ত ফুসফুস থেকে বের করা হয়না, আর বের করা ঐ পানিও ফুসফুসে জমা পানি না। তা হলে আসলে ওটা কোথায় থাকে? ফুসফুসকে যে পাতলা আবরনী বা প্লুরা ঘিরে রাখে তাতেই জমা হয় ঐ পানি, আর এই রোগটির নাম হলো প্লুরাল ইফিউশন।
তাহলে কি ফুসফুসে কখনোই পানি জমেনা? হ্যা, ফুসফুসেও পানি জমে তবে সেই রোগটিকে বলে পালমোনারি ইডেমা (Pulmonary Edema) আর সেই পানি কিন্ত এভাবে বের করা আনা সম্ভব না, তাই পাঠক গন সঠিক ধারনা টি মনে গেথে নিয়ে আর বিভ্রান্ত হবেন না বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
অনেক কারনে ফুসফুস আবরনী বা প্লুরায় পানি জমতে পারে, এর মধ্যে কিছু আছে ফুসফুসের নিজস্ব কারন, কিছু কারনের আবার ফুসফুসের সাথে কোনো সম্পর্কই নেই তবে বেশীর ভাগ কারনই কিন্ত এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। সাধারনত ফুসফুসের টিবি, নিউমোনিয়া, ক্যান্সার, ইনফার্কশন এই জাতীয় রোগে প্লুরায় পানি জমতে পারে। আর ফুসফুসের রোগের বাইরে হার্ট ফেইলুর, লিভার সিরোসিস, নেফ্রোটিক সিন্ড্রম, কিডনি ফেইলুর, ম্যালনিউট্রিশন, পেরিকার্ডাইটিস, লিভার এবসেস এসব রোগেও ফুসফুসের প্লুরায় পানি জমতে পারে।
প্লুরাল ইফিউশন হলে রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, সেই সাথে বুকে ব্যথা, কাশি, হাল্কা কফ, জ্বর এসব সমস্যাও থাকতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যা হলে চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হওয়া উচিত। বুকের একটি এক্সরে করালে প্লুরাল ইফিউশন সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়, তবে পানি খুব কম মাত্রায় জমলে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা সিটিস্ক্যান করার প্রয়োজন হতে পারে। সেই সাথে সুই দিয়ে পানি বের করে এনে তার নানা রকম পরীক্ষা করে দেখা হয় পানি জমার কারন কি বা পানির প্রকৃতিই বা কিরকম। অনেক সময় এই রোগে প্লুরার বায়োপসি করার ও প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে রোগীর কি রোগের কারনে এই সমস্যা হয়েছে তা নিশ্চিত করেন এবং তার উপর নির্ভর করে চিকিৎসা শুরু করেন। যেমন টিবি হবার কারনে এমনটি হলে রোগীকে টিবির অসুধ দেন আবার ক্যান্সার এর কারনে এমনটি হলে ক্যান্সার এর চিকিৎসা শুরু করতে হয়। তেমনি ফুসফুস্ এর বাইরে অন্য কোনো রোগের জন্য এমন সমস্যা হলে সেই রোগের চিকিৎসা করালে প্লুরাল ইফিউশন এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।
অনেক সময় খুব বেশী পানি জমা হলে সুই দিয়ে ফুটো করে বিশেষ পদ্ধতিতে সব পানি বের করে দেয়া হয় (Pleurodesis), তাও যদি ব্যর্থ হয় তাহলে ছোট্ট অপারেশনের মাধ্যমে প্লুরায় একটি টিউব প্রবেশ করিয়ে দিয়ে (Tube thoracostomy) পানি বের করে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন যাবত প্লুরায় পানি থাকার পরও যদি চিকিৎসা শুরু করা না হয় তাহলে প্লুরায় শক্ত আবরন পরে গিয়ে তা ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতির কারন হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে বড় অপারেশনের (Decortication of Lung) মাধ্যমে তা সরিয়ে ফেলতে হয়। তাই কারো এই প্লুরাল ইফিউশন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
নিউমোনিয়া (Pneumonia)
নিউমোনিয়া (Pneumonia)
ফুসফুসের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন জাতীয় রোগ যা মূলত বিভিন্ন
ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্য জীবাণুর আক্রমনের কারনে হতে পারে। নিউমোনিয়া
হলে কাপুনি সহ তীব্র জর, সাথে বমি, মাথা ব্যাথা, বুকে এবং সমস্ত শরীরে
ব্যথা, রুচিহীনতা এবং কিছুটা খয়েরি রঙ্গের কফ সহ কাশি হতে পারে। কাশির
সাথে কখনো কখনো রক্তও যেতে পারে।
এক্সরে, রক্ত
পরীক্ষা এবং কফ পরীক্ষার মাধ্যমে নিউমোনিয়া সনাক্ত করা হয়। ইনফেকশন জনিত
নিউমোনিয়ার মূল অসুধ হলো এন্টিবায়োটিক - যা অবশ্যই চিকিৎসকের
পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া উচিত।
ব্রঙ্কাইটিস (Bronchitis)
অনেকের
বাড়িতেই বুড়ো দাদুদের দেখা যায় বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত কাশি সেই সাথে
বিজল কফ ফেলা সহ তীব্র শ্বাস কষ্টে ভুগতে। হঠাৎ করেই এদের শ্বাস কষ্ট খুব
খারাপ হয়ে যায় হাসপাতালে ভর্তি করা সহ নানা রকম দৌড়া-দোড়ি শুরু হয়ে
যায়। দাদুদের এই রোগটিই আমাদের কাছে ব্রঙ্কাইটিস নামে পরিচিত। এর কেতাবি
নাম সি,ও,পি,ডি (Chronic Obstructive Pulmonary Disease)। এই রোগ হলে কাশি আর কফ তো হয়ই সেই সাথে মাঝে মাঝে কফের সাথে রক্ত যেতেও দেখা যায়।
আবার
শ্বাস কষ্ট, শ্বাসের টান, বুক চেপে দম বন্ধ হয়ে আসার অনুভুতি, শ্বাসের
সময় বুকে শো-শো শব্দ করা এই সব উপসর্গ ও এই রোগেরই নিত্য সঙ্গী।
তাহলে
দাদু হওয়াই কি এ রোগ হবার কারন। আদৌ তা নয়। মধ্য বয়সেও এই রোগটি হতে
পারে আবার বৃদ্ধ বয়সে এটি নাও হতে পারে। সোজা কথায় যারা খুব বেশী ধুমপান
করে তারাই শুধুমাত্র এই রোগের শিকার। তবে অনেক সময় পেশাগত কারনে ধুলোময়
পরিবেশে কাজ করা, বার বার শ্বাসের ইনফেকশন হওয়া বা দীর্ঘদিন স্যাঁতস্যাতে
পরিবেশে থাকার কারনেও এই রোগ হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এরোগ
হলে কখনোই তা পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়না তবে নিয়ম মেনে চললে এবং নিয়মিত
চিকিৎসা করালে রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। এজন্য প্রথমেই জেনে নেয়া
প্রয়োজন আপনার রোগটি সি,ও,পি,ডি কিনা। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞগণ এরোগ
নির্নয়ে সিদ্ধহস্ত, তারাই সঠিক পরামর্শটি রোগীকে দিয়ে থাকেন। রোগ
নির্নয়ে রোগীকে বুকের এক্সরে, পালমোনারি ফাংশন টেষ্ট (Spirometry), ব্লাড গ্যাস এনালাইসিস সহ অন্যান্য পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
আগেই
বলেছি কোনো অসুধেই এই রোগ পুরোপুরি ভালো হয়ে যাবেনা - কেবল নিয়ন্ত্রণ
করা যাবে। এজন্য রোগীকে সারাজীবনের জন্য ধুমপান এবং তামাক জাতীয় দ্রব্য
পরিত্যাগ করতে হবে। অল্পমাত্রার ব্রঙ্কোডাইলেটের জাতীয় অসুধ সেবন করতে
হবে, শ্বাস কষ্ট হলে ইনহেলার ব্যবহার করতে হবে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
অনুযায়ী স্টেরয়েড জাতীয় অসুধ ইনহেলারের মাধ্যমে সেবন বা ট্যাবলেট আকারে
গ্রহন করতে হতে পারে। কোনো প্রকার শ্বাসকষ্ট বা শ্বাসের ইনফেকশন হলে সাথে
সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা
করাতে হবে। মনে রাখতে হবে সি,ও,পি,ডি কখনো ভালো হয়ে যায়না তাই সুস্থ্য
থাকতে হলে অবশ্যই সতর্কতার সাথে সমস্ত নিয়ম মেনে চলতে হবে, এর অন্যথা হলে
ফুসফুস ক্রমান্বয়ে নষ্ট হতে হতে একসময় নিশেষ হয়ে যেতে পারে এবং তাতে
হঠাৎ শ্বাস কষ্টে রোগীর মৃত্যুবরণ করাটাও অস্বাভাবিক নয়।
ফুসফুসের ফোঁড়া (Lung abscess)
শরীরের কোথাও পুঁজ বা Pus জমলে আমরা তাকে ফোঁড়া বলি, এই ফোঁড়া যে শুধু ত্বকেই হয় তা কিন্ত নয়, শরীরের প্রায় সব অংগেই পুঁজ জমে এমন ফোঁড়া হতে পারে, ফুসফুসও তার ব্যতিক্রম নয়। নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিয়েকটেসিস, এটেলেকটেসিস, সেপটিসেমিয়া, ফুসফুসের টিউমার বা ক্যান্সার এসব রোগে সাধারনত ফুসফুসে পুঁজ জমতে (Lung abscess) দেখা যায়।
এছাড়া যে সকল রোগে রোগীর রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কমে যায় কিংবা রোগীর চেতনবোধ কমে যায় (Stroke, Alcohol intoxication, Coma, Unconsciousness) সেসব রোগেও এই লাং এবসেস হতে পারে।
এ রোগে রোগীর শরীরে কাপুনিসহ তীব্র জ্বর হয়, সেই সাথে দুর্গন্ধযুক্ত কফ-কাশি, বুকে ব্যথা, শ্বাস কষ্ট, কাশির সাথে রক্ত যাওয়া, অত্যাধিক ক্লান্তি বা অবসাদ লাগা, প্রচুর
ঘাম হওয়া সহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। লাং এবসেস এক ধরনের ইনফেকশন জাতীয় রোগ
হলেও এটা কোনো সাধারন ইনফেকশন নয়। এ রোগে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই, সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
বুকের এক্সরে করলে এই রোগ সম্বন্ধে ধারনা পাওয়া যায়, বুকের সিটি স্ক্যান করলে রোগের ব্যপ্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য মিলে। এছাড়া কফ এর কালচার পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা সহ বিশেষ পদ্ধতিতে সুই দিয়ে পুঁজ বের করে এনে (FNAC- Fine Needle Aspiration Cytology) তার
পরীক্ষা করিয়ে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী রোগের চিকিৎসা শুরু করতে হয়। লাং
এবসেসটি জটিল না হলে বা ছোটো হলে কালচার এ ফলাফল অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক
শিরায় নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি ভালো হয়ে যায়। তবে জটিল রোগে রোগীকে
অপারেশন করা ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকেনা। থোরাসিক সার্জন গন এই অপারেশন করে
থাকেন, সফল
অপারেশন এর পর রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। তবে ক্যান্সার বা টিউমার এর
কারনে এই রোগ হয়ে থাকলে প্রকৃত রোগের চিকিৎসা হবার আগ পর্যন্ত রোগী
পুরোপুরি সুস্থ হয়না।
ব্রঙ্কিয়েকটেসিস (Bronchiectasis)
ব্রঙ্কিয়েকটেসিস
আর ব্রঙ্কাইটিস শব্দ দুটো খুব কাছাকাছি হলেও রোগদুটি কিন্ত পুরোপুরি
ভিন্ন। ব্রঙ্কিয়েকটেসিস যে কোনো বয়সেই হতে পারে। শিশুরা জন্মগত কারনে এই
রোগে ভুগতে পারে আবার অনেকদিন ধরে ধুমপান করলে কিংবা টিবি রোগ থেকেও এই রোগ
হতে পারে। কারন যাই হোকনা কেনো সব রোগীকেই দেখা যায় প্রতি সকালে মুখভর্তি করে খাকী রঙের দুর্গন্ধযুক্ত কফ ফেলতে। এতো বেশী কফ এরোগ ছাড়া আর খুব কম রোগেই দেখা যায়।
বেলা বাড়ার
সাথে সাথে কফের পরিমানও আস্তে আস্তে কমতে থাকে। আবার অনেক সময় শোয়া থেকে
বসলে বা বসা থেকে শুতে গেলেও মুখভর্তী একগাদা কফ চলে আসতে পারে। কফের সাথে
কখনো সখনো হাল্কা রক্ত যাওয়াও অস্বাভাবিক নয় তবে রক্ত যাবার পরিমান যখন খুব
বেড়ে যায় সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। এ রোগে জ্বর, ক্ষুধামন্দা, রুচিহীনতা, ক্লান্তিলাগা, শরীরের ওজন কমে যাওয়া এই উপসর্গগুলোও কফ কাশির সাথে সহাবস্থান করে। শিশুদের এই রোগ হলে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি বাধাপ্রপ্ত হয়।
বক্ষব্যধি বিশেষজ্ঞ গন এ রোগ চিকিৎসায় বিশেষ পারদর্শী বলে বিবেচনা করা হয়। বুকের এক্সরে অথবা সি,টি স্ক্যান করে এই রোগ নির্নয় করা যায়। কফ পরীক্ষা করে দেখতে হয় কোনো ইনফেকশন আছে কিনা কিংবা কোন জীবানুর কারনে ইনফেকশন হয়েছে। তবে রোগ হবার সঠিক কারন নির্ণয় করতে হলে আরো অনেক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
রোগের কারন বা উপসর্গ যাই হোকনা কেনো চিকিৎসা কিন্ত একই। রোগীকে প্রতিদিন সকালে উঠে বিছানা থেকে মাথা মেঝের দিকে ঢালু করে কাশি দিয়ে সমস্থ কফ বের করে দিতে হয়। কেউ এসময়ে পিঠ চাপড়ে দিলে রোগীর জন্য কফ বের করা খানিকটা সহজ হয়। রোজ এই প্রক্রিয়াটি (Chest physiotherapy) ৫ থেকে ১০ মিনিট করলে সারাদিন রোগী কিছুটা ভালো থাকেন, তবে কারো কারো জন্য এটা দিনে ২-৩ বার করা লাগতে পারে।
এই চেষ্ট ফিজিওথেরাপীর সাথে রোগীকে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়। কফ পরীক্ষায় কি জীবানু আছে তার উপড় নির্ভর করে বিশেষজ্ঞগন এই এন্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট করেন। এছাড়া ব্রঙ্কোডাইলেটর জাতীয় অসুধ্ও রোগীকে নিয়মিত সেবন করতে হয়। সেই সাথে অনেক সময় ম্যন্থল ভ্যাপার নিলে কফ বের হতে সুবিধা হয়। আবার কফের সাথে হাল্কা রক্ত গেলে রক্ত বন্ধ করার অসুধ খেতে হয়।
একটা কথা জেনে রাখা ভালো যে একবার কারো ব্রঙ্কিয়েকটেসিস হলে তা কখনো পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়না। অবশ্য অসুধ খেয়ে এবং নিয়মনীতি মেনে চলে রোগটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভব। তবে অনেক সময়ই রোগটি নিজে নিজে বাড়তে থাকে এবং এক সময় রোগীর প্রচুর শ্বাস কষ্ট হয় এবং কাশির সাথে মাত্রাতিরিক্ত রক্ত যেতে থাকে। এজন্য সব সময় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।
সার্জারি করে ব্রঙ্কিয়েক্টেসিস যুক্ত ফুসফুসের অংশটি ফেলে দিলে (Segmentectomy /Lobectomy of lung) রোগী পুরোপুরি এই রোগ থেকে মুক্ত হয়ে যেতে পারে। তবে এটা নির্ভর করে রোগটি কি কারনে হয়েছে বা কোন পর্যায়ে আছে তার উপর। তবে রোগটি যখন খুব বেশী জটিল হয়ে যায় এবং কাশির সাথে খুব বেশী রক্ত যেতে থাকে তখন সার্জারি (Lobectomy, Pneumonectomy, Ligation of Bronchial artery, Bronchial artery embolization) করা ছাড়া আর কোনো উপয়া থাকেনা। তেমনি ব্রঙ্কিয়েকটেসিস এর কারনে কোনো পাশের ফুসফুস পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলেও সার্জারি করে তা ফেলে দিতে (Pneumonectomy) হয়। এর পর রোগী শুধু একপাশের ফুসফুস নিয়েই একটু সতর্ক ভাবে প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারেন। ফুসফুসের অন্যান্য রোগের মতো এই রোগেও ধুমপান রোগীর জন্য একে বারে নিষিদ্ধ, ধুমপান করলে রোগীর অবস্থা হঠাৎ করে খারাপ হয়ে যেতে পারে।