কিডনি সুস্থ্য রাখার ৭ টি উপায়
কিডনি ফেইলুর বা রেনাল ফেইলুর শরীরের এক নীরব ঘাতক, প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই কেউ না কেউ এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত। তাই আমরা সকলেই কমবেশী জানি এ রোগের ভোগান্তি কতটা নির্মম;
কিন্ত আমরা কি জানি কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলে সহজেই এই রোগ এড়িয়ে
যাওয়া সম্ভব। আসুন জেনে নেই কিভাবে সহজেই আপনার কিডনিকে সুস্থ্য রাখা
সম্ভব,
১। কর্মঠ থাকুনঃ নিয়মিত হাটা,দৌড়ানো,স্লাইকিং
করা বা সাতার কাটার মতো হাল্কা ব্যায়াম করে আপনার শরীরকে কর্মঠ ও সতেজ
রাখুন। কর্মঠ ও সতেজ শরীরে অন্যান্য যেকোন রোগ হবার মতো কিডনি রোগ হবার
ঝুকিও খুব কম থাকে।
২। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখুনঃ
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর শতকরা ৫০ জনই কিডনি রোগে আক্রান্ত হন। রক্তের
সুগার নিয়ন্ত্রনে না থাকলে কিডনি নষ্ট হবার ঝুকি আরো বেড়ে যায়। তাই
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখুন,নিয়মিত আপনার রক্তের সুগার পরীক্ষা করিয়ে দেখুন তা স্বাভাবিক মাত্রায় আছে কিনা, না
থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শুধু তাই নয় অন্তত তিন মাস পরপর হলেও একবার
আপনার কিডনি পরীক্ষা করিয়ে জেনে নিন সেটা সুস্থ্য আছে কিনা।
৩। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখুনঃ অনেকেরই ধারনা যে উচ্চ রক্তচাপ শুধু ব্রেইন স্ট্রোক (stroke) আর হার্ট এটাকের (heart attack) এর ঝুকি বাড়ায়,তাদের
জেনে রাখা ভালো যে কিডনি ফেইলুর হবার প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ
রক্তচাপ। তাই এ রোগ থেকে বাঁচতে অবশ্যই আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখতে
হবে। কোন কারনে তা ১২৯/৮৯ মি,মি, এর বেশী হলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ
নিতে হবে। নিয়মিত অসুধ সেবন এবং তদসংক্রান্ত উপদেশ মেনে চললেই সহজেই
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়।
৪। পরিমিত আহার করুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখুনঃ অতিরিক্ত ওজন কিডনির জন্য ঝুকিপূর্ণ,তাই
সুস্থ্য থাকতে হলে ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসতে হবে। পরিমিত
স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে কিডনি রোগ হবার ঝুকি অনেক কমে যায়।অন্য দিকে
হোটেলের তেলমশলা যুক্ত খাবার,ফাষ্টফুড,প্রক্রিয়াজাত
খাবার খেলে রোগ হবার ঝুকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। মানুষের দৈনিক মাত্র ১ চা
চামচ লবন খাবার প্রয়োজন আছে -খাবারে অতিরিক্ত লবন খাওয়াও কিডনি রোগ হবার
ঝুকি বাড়িয়ে দেয়। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবন পরিহার করুন।
৫। ধুমপান পরিহার করুনঃ
অধুমপায়ীদের তুলনায় ধুমপায়ীদের কিডনি ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা শতকরা ৫০
গুণ বেশী। শুধু তাই নয় ধুমপানের কারণে কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে থাকে
এবং এর ফলে কিডনির কর্মক্ষমতাও হ্রাস পেতে শুরু করে। এভাবে ধুমপায়ী একসময়
কিডনি ফেইলুর রোগে আক্রান্ত হয়ে যায়।
৬। অপ্রয়োজনীয় অসুধ সেবনঃ আমাদের মাঝে অনেকেরই বাতিক রয়েছে প্রয়োজন / অপ্রয়োজনে দোকান থেকে অসুধ কিনে খাওয়া। এদের মধ্যে ব্যথার অসুধ (NSAID) রয়েছে
শীর্ষ তালিকায়। জেনে রাখা ভাল যে প্রায় সব অসুধই কিডনির জন্য কমবেশী
ক্ষতিকর আর এর মধ্যে ব্যথার অসুধ সবার চেয়ে এগিয়ে। নিয়ম না জেনে
অপ্রয়োজনীয় অসুধ খেয়ে আপনি হয়তো মনের অজান্তেই আপনার কিডনিকে ধংস করে
যাচ্ছেন -তাই যে কোন অসুধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছ
থেকে জেনে নিন তা আপনার ক্ষতি করবে কিনা।
৭। নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানঃ আমাদের মাঝে কেউ কেউ আছেন যাদের কিডনি রোগ হবার ঝুকি অনেক বেশী, তাদের অবশ্যই নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো উচিত। কারো যদি ডায়াবেটিস এবং / অথবা উচ্চ রক্তচাপ থাকে,ওজন বেশী থাকে (স্থুলতা / Obesity),পরিবারের
কেউ কিডনি রোগে আক্রান্ত থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে তার কিডনি রোগে আক্রান্ত
হবার ঝুকি অনেক বেশী। তাই এসব কারন থাকলে অবশ্যই নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা
করাতে হবে।
কিডনি ফেইলুর হয়ে গেলে ভালো হয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই, ডায়ালাইসিস কিংবা প্রতিস্থাপন (Renal Transplant) করে
শুধু জীবনকে দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। তাই এই রোগ এড়িয়ে যাবার চেষ্টা
চালিয়ে যাওয়াটা প্রতিটি সুস্থ্য মানুষের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে।রেনাল ফেইলুর (Renal failure)
বৃক্ক বা কিডনির (kidney) কাজ মূলত চারটি।
১। মূত্র তৈরী ও তার মাধ্যমে শরীরের অপ্রয়োজনীয় বর্জ পদার্থ বের করে দেয়া,
২। শরীরের অতিরিক্ত পানি ও মৌল বের করে দিয়ে এদের ভারসাম্য রক্ষা করা,
৩। জরুরী কিছু হরমোন তৈরী করা এবং
৪। ভিটামিন ডি ও ক্ষুদ্র কিছু আমিষের বিপাক ঘটানো। কিডনি যখন প্রথম কাজ দুটি করতে ব্যর্থ হয় তখন রেনাল ফেইলুর হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়।
রেনাল ফেইলুর দুই প্রকার। এর মধ্যে যেটি এক্যুট (acute) বা হঠাৎ করে হয় তার তীব্রতা কম এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা করলে পুরোপুরি ভালোও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যেটি অনেক দিন ধরে ধীরে ধীরে হয় এবং ক্রমাগত চলতেই থাকে তাকে ক্রনিক (chronic) রেনাল ফেইলুর বলে। আসলে দুটি কিডনিরই উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো কারনে স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেলে তখন ক্রনিক রেনাল ফেইলুর হয়, এ রোগে কিডনি তার কাজ করার চারটি ক্ষমতাই হারায়, আর তাই এই রোগের পরিণতি ও বেশ খারাপ।
ক্রনিক রেনাল ফেইলুর হলে রোগী খুব দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে যায়। রক্ত শূন্যতা দেখা দেয়া, অস্থি ক্ষয় হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, প্রসাবে ইনফেকশন, মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি এই রোগের উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়।
এ রোগ হলে রক্তে ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, পটাসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই রক্ত পরীক্ষাসহ মূত্রের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা এবং এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষাও করা লাগতে পারে। নেফ্রলজিস্ট (nephrologist) বা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানেই কেবল এই রোগের চিকিৎসা করানো উচিত।
এ রোগে পরিমিত পানি, আমিষ ও লবন খেতে হয়। এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন, রক্ত শুন্যতা থাকলে তা দূর করণসহ নানারকম নিয়ন্ত্রনের মধ্যে থাকতে হয়। ক্রনিক রেনাল ফেইলুর কখনো চিরতরে ভালো হয়ে যায়না, চিকিৎসার এক পর্যায়ে ডায়ালাইসিস করার প্রয়োজন দেখা দেয়, এতেও যখন রোগ নিয়ন্ত্রন করা যায়না তখন কিডনি বদল বা রেনাল ট্রান্সপ্লান্টেশন (renal transplantation) করা অনিবার্য হয়ে পরে।
প্রসাবে রক্ত যাওয়া বা হেমাচুরিয়া (Hematuria)
হেমাচুরিয়া
বলতে প্রসাবে রক্ত যাওয়াকে বোঝায়। এই রক্ত যাবার কারনে প্রসাবের রঙ
ঘোলাটে দেখা যায় এবং কখনো কখনো তা গোলাপি বর্ণ ধারন করে। একজন সুস্থ্য
মানুষের প্রসাবের সাথে কোনো রক্ত বা রক্ত কনিকা যাবেনা এটাই স্বাভাবিক।
অবশ্য পরিনত সুস্থ্য মেয়ে / মহিলাদের প্রসাবে শুধুমাত্র মাসিক ঋতু চক্রের সময় কিছু রক্ত কণিকা পাওয়া যাওয়াটা স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়।
হেমাচুরিয়া
অনেক কারনে হতে পারে তবে প্রধানত এটা কিডনির এবং মুত্রনালির নানাবিধ
সমস্যার কারনেই হয়ে থাকে। কিডনি এবং মুত্রথলিতে ইনফেকশন, পাথর, টিউমার,
ক্যান্সার বা টিবি হলে প্রসাবে রক্তকনিকা পাওয়া যেতে পারে,এছাড়া কিডনি
কোনো কারনে আঘাত প্রাপ্ত হলে বা এ,জি,এন (AGN), পায়োলোনেফ্রাইটিস ইত্যাদি হলেও প্রসাবে রক্ত কনিকা পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া ইউরেটার (Ureter) এবং ইউরেথ্রায় (Urethra)
পাথর, টিউমার, ইনফ্লামেশন হলে এবং প্রষ্টেট গ্রন্থির ঘা অথবা ক্যান্সার
হলেও হেমাচুরিয়া হতে পারে। কিডনির সমস্যার বাইরে রক্তজমাট বাধার সমস্যা (Bleeding disorder), এন্ডোকার্ডাইটিস, অস্বাভাবিক উচ্চ রক্ত চাপ (Malignant hypertension) এমনকি কিছু অসুধ সেবনের কারনেও হেমাচুরিয়া হওয়া সম্ভব।
কিডনি বিশেষজ্ঞগণ হেমাচুরিয়ার জন্য প্রসাব ও রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা, কিডনির বিভিন্ন প্রকার এক্সরে (Plain, Contrast), আলট্রাসনোগ্রাম, সিস্টোস্কোপি (Cystoscopy),
বায়োপসি ইত্যাদি পরীক্ষা করিয়ে রোগের কারন নির্নয় করেন এবং চিকিৎসা
করেন। হেমাচুরিয়ার চিকিৎসা পুরোপুরি এর কারন এর উপর নির্ভর করে। প্রসাবে
রক্ত যাওয়া একটি আশঙ্কাজনক উপসর্গ - তাই এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে
অতিসত্ত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
নেফ্রোটিক সিন্ড্রম (Nephrotic Syndrome)
কোনো রোগকে ঘিরে যখন অনেকগুলো উপসর্গ এক সাথে বিরাজ করে তাকে সিনড্রম বলা হয়। নেফ্রোটিক সিনড্রম কিডনির এমনই অনেক গুলো উপসর্গের সমন্বয় যা অনেক গুলো রোগের কারনে হতে পারে, কিন্ত
উপসর্গগুলো সব সময় একসাথে থাকে আর এর চিকিৎসা পদ্ধতিও একই। তা হলে প্রশ্ন
আসতেই পারে নেফ্রটিক সিনড্রম হলে কি হয়। আসলে কিডনির যে যে রোগে প্রসাবে
প্রচুর প্রোটিন যায়, রক্তে
প্রোটিনের মাত্রা অনেক কমে যায় আর কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেড়ে যায় এবং
সেই সাথে সমস্ত শরীরে পানি জমে ফুলে যায় তাকে এক কথায় নেফ্রটিক সিন্ড্রম
বলে।
এবার তাহলে জানা যাক কি কি কারনে এই সিনড্রম হতে পারে - একেতো কিডনির ছাকুনির মতো অঙ্গানু বা গ্লোমিউরুলাসের নানা প্রকার প্রদাহের কারনে এ রোগ হতে পারে, এছাড়া সমস্ত শরীর জুড়ে হয় যেমন এস,এল,ই(SLE); পি,এ,এন(PAN), ডায়াবেটিস, এমাইলয়ডোসিস এসব কারনেও এমনটি হতে পারে। এছাড়া ম্যালেরিয়া, হেপাটাইটিস ‘বি’, হৃদপিন্ডের এন্ডোকার্ডাইটিস জাতীয় ইনফেকশন, কিছু ক্যান্সার, কিছু অসুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এমনকি জন্মগত কারনেও নেফ্রটিক সিনড্রম হতে পারে।
এই সিনড্রম হলে মুখ-মন্ডল ও চোখের পাতা ফুলে ঢলঢলে হয়ে যায়, শরীরের সমস্ত স্থানে পানি জমে (যেমন পেটে পানি জমে এসাইটিস, বুকে জমে প্লুরাল ইফিউশান) শরীর ফুলে যায়, তবে এ রোগে রোগীর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক থাকে। অনেক সময় এ রোগে রোগীর ইনফেকশন হবার হার বেড়ে যায়, থ্রম্বোএমবোলিজম হয় আবার কখনো কখনো রোগী শক (Hypovolumic shock) এও চলে যেতে পারে। এমন কিছু হলে রোগীকে সাথে সাথে কিডনি বিশেষজ্ঞ বা নেফ্রলজিষ্টের তত্ত্বাবধানে ভর্তি করিয়ে দেয়া উচিত। তিনি এ রোগের সঠিক কারন নির্ণয়ে প্রসাব ও রক্তের বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা, এক্সরে এবং কখনো কখনো এন্টিনিউক্লিয়ার ফ্যাক্টর এমনকি রেনাল বায়োপসিও করিয়ে থাকেন।
নেফ্রটিক সিনড্রম হলে রোগীকে লবন এবং তরল জাতীয় খাবার পরিমান কমিয়ে আনতে হয়, এক্ষেত্রে রোগী স্বাভাবিক মাত্রার প্রোটিন বা আমিষ জাতীয় খাবার খেতে পারেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে এন্টিবায়োটিক, ডাইরেটিক এবং ক্ষেত্র বিশেষে স্টেরয়েড জাতীয় অসুধ দেয়া হয়। নেফ্রটিক সিনড্রম কোনো সাদাসিধে রোগ নয়, তাই যে কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা না করিয়ে সব সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া উচিত। অপরিমিত চিকিৎসার কারনে রোগীর রেনাল ফেইলুর, রিকেট, পেরিটনাইটিস ইত্যাদি রোগ হবার সম্ভাবনা আছে।
একিউট গ্লোমেরুলো নেফ্রাইটিস - এ জি এন (AGN)
অনেক
সময় হাতে পায়ে পাঁচড়া বা ঘা হওয়া বাচ্চাদের দেখা যায় হঠাৎ করে নাক
মুখ ফুলে উঠে ভীষন অসুস্থ হয়ে যেতে। কিডনির প্রদাহ জনিত এমন একটি রোগের
নামই একিউট গ্লোমেরুলো নেফ্রাইটিস (AGN)।
সাধারনত দরিদ্র ঘরের বাচ্চারাই এই রোগে বেশী অসুস্থ হয়ে থাকে তবে
অবস্থাপন্ন পরিবারে এমন যে হয়না তা কিন্ত নয়। এতটুকু পড়ে কারো মনে হতে
পারে এই রোগ বুঝি শুধু শিশুদেরই হয়।তা কিন্তু নয় -বেশীর ভাগ রোগীর বয়স ৫
থেকে ১০ বছরের মধ্যে হলেও বড়দেরও এমন রোগ হতে পারে।
বাচ্চাদের হাতে, পায়ে বা শরীরে পাঁচড়া বা স্ক্যাবিস (Scabies)
হলে অনেক সময় তাতে স্ট্রেপটোকক্কাস নামক এক প্রকার ব্যক্টেরিয়ার সংক্রমন
হয়।এই ব্যকটেরিয়ার বিরুদ্ধে শরীর প্রতিরোধমুলক যে এন্টিবডি তৈরী করে
তা এই ব্যকটেরিয়াকে যেমন ধ্বংস করে তেমনি ব্যক্টেরিয়ার মতো উপাদান
আছে বলে কিডনির অত্যন্ত জরুরী উপাদান গ্লোমিউরুলাস (যা ছাকনির মতো কাজ করে)
কেও ধ্বংস করে দেয়।এর ফলে আক্রান্ত রোগীর প্রসাবের সাথে শরীরের অত্যন্ত
মুল্যবান প্রোটিন এবং রক্ত কনিকা বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে রক্ত ও
প্রোটিনের পরিমান কমে যেতে থাকে সেই সাথে রোগীর মুখ ও চোখের চারপাশে পানি
জমেতা ফুলে উঠে, সমস্ত শরীরে পানি জমে এবং হাত পা ফুলে উঠে, রোগীর রক্ত চাপ
বা ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়, প্রসাব লাল বা ঘোলাটে হয়ে যায় সেই সাথে
প্রসাবের পরিমান ও কমতে থাকে। এই রোগ হলে রোগীরহাল্কা জ্বর হয়, গা ম্যাজ
ম্যাজ করে, ক্লান্তিবোধ হয়, কোমড়ের কাছে ব্যথা হয় এছাড়াও ক্ষুধামন্দা,
বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়াটাও এ রোগে খুব পরিচিত উপসর্গ।
এটি কিডনির প্রদাহ রোগ হলেও একে শরীরের বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিজনিত (Auto immune disease)
রোগ বলে বিবেচনা করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগের সঠিক চিকিৎসা না করা
হলেরোগটি খুব জটিল হয়ে যেতে পারে, তাই উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথেই
রোগীকে কিডনি বিশেষজ্ঞ বা নেফ্রোলজিষ্ট এর তত্ত্বাবধানে ভর্তি করিয়ে দেয়া
উচিত।
সঠিক
রোগটি নির্ণয়ে রোগীকে অনেক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হতে পারে, প্রসাব
পরীক্ষা এর মধ্যে একটি। এ রোগ হলে প্রসাবে প্রচুর পরিমানে রক্ত কনিকা এবং
প্রোটিন পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন রক্তপরীক্ষা, এক্সরে, ইমিউনোলজিকাল
টেষ্ট ও করা হয়। এ রোগ হলে রোগীকে পূর্ন বিশ্রামে থাকতে হয়,
নেফ্রোলজিষ্টের পরামর্শ অনুযায়ী স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যকটেরিয়ার বিরুদ্ধে
কাজ করে এমন একটি এন্টিবায়োটিকও অবশ্যই চালিয়ে যেতে হয়। এছাড়া খাদ্যে
দৈনিক লবন, তরল /পানি ও প্রোটিনের মাত্রা কমাতে হয়, ডাইরূটিক্স জাতীয়
অসুধ এবং উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রনের অসুধ ও সেবন করতে হয়।
সঠিক
চিকিৎসা করালে অধিকাংশ রোগীই ভালো হয়ে যায় তবে চিকিৎসা শুরু করতে দেরী
হলে অথবা রোগের তীব্রতা খুব বেশী হলে এ রোগের জটিলতা হিসেবে হার্ট ফেইলুর,
কিডনি ফেইলুর অথবা এনকেফালোপ্যাথি জাতীয় রোগ হতে পারে।
এনুরিয়া (Anuria)
এনুরিয়া
বলতে বোঝায় ২৪ ঘন্টায় একদম প্রসাব বা মুত্র না হওয়া। এটা ভয়াবহ একটি
পরিস্থিতি। এমনটি হলে প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে সত্যিই কি গত ২৪ ঘন্টা
ধরে তৈরী প্রসাব হয়নি নাকি প্রসাব মুত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডারে জমে
আছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন দেখা যায় যে রোগীর প্রসাব তৈরী হয়েছে কিন্ত
বের হতে পারছেনা, এমন পরিস্থিতি কে এনুরিয়া বলা হয়না, বলা হয় ইউরিনারি
রিটেনশন। মুত্র নালি দিয়ে ক্যাথেটার পরিয়ে দিলেই রিটেনশন দূর হয়ে
যায়, কিন্ত এনুরিয়া হলে ক্যাথেটার পরালেও কোনো ইউরিন বা মুত্র আসেনা।
শরীরে
খুব তীব্র মাত্রার পানি শুন্যতা দেখা দিলে (যেমন, তীব্র ডায়ারিয়া বা বমি
হওয়া, প্রচুর রক্তপাত হওয়া, শরীরের ব্যাপক অংশ পুরে যাওয়া
ইত্যাদি), হৃদপিন্ড অপরিমিত পাম্প করলে (কার্ডিওজেনিক শক), এনেসথেসিয়ার
পার্শপ্রতিক্রিয়ায়, হাইপোক্সিয়া বা তীব্র অক্সিজেন শুন্যতায় বা ভুল
গ্রুপের ব্লাড দিয়ে রিএকশন হলে বা কিছু অসুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়
এমনটি হতে পারে। আবার মুত্রথলির আগে মুত্রের গতি পথের কোথাও পাথর, টিউমার
বা এমন অন্য কোনো কারনেও এনুরিয়া হয়। এনুরিয়া খুব ভয়াবহ একটি রোগ, কোনো
প্রকার দেরি না করে সাথে সাথেই এর চিকিৎসা শুরু করা উচিত। এমন পরিস্থিতির
উদ্ভব হলে একজন নেফ্রোলজিষ্ট বা কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়া জরুরী। কি কারনে এনুরিয়া হয়েছে তা
নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করাতে হয় এবং তার ফলাফলের উপর
ভিত্তি করে এর চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসা শুরু করতে দেরী হয়ে গেলে প্রায়
সময়ই দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে যায় যা রোগীর অকাল মৃত্যুর কারন হয়ে
দাঁড়ায়