টনসিলাইটিস (Tonsillitis)
বাচ্চাদের
গলায় ব্যথা হলেই আমরা বলে দেই - "তোমার তো টনসিল হয়েছে"। অমনিই জোটে এটা
খাবেনা, ওটা করবেনা এমন একগাদা উপদেশ। তো এই টনসিল টা কী? টনসিল হলো
আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটা অংশ এবং আমাদের মুখের ভেতরেই চারটি
গ্রুপে তারা অবস্থান করে। এদের নাম যথাক্রমে লিঙ্গুয়াল, প্যালাটাইন,
টিউবাল এবং এডেনয়েড।
এই টনসিল গুলোর কোনো একটির প্রদাহ হলেই তাকে বলে টনসিলাইটিস। টনসিল বলতে
আমরা সচরাচর যা বুঝি তা কিন্ত আসলে টনসিলাইটিস। আর প্যালাটাইন টনসিলটিই
প্রদাহ সৃষ্টি করে আমাদের গলা ব্যথা জাতীয় সমস্যায় ফেলে সবচেয়ে বেশী।
টনসিলাইটিস
যে শুধু বাচ্চাদের হয় তা নয় এটা বাচ্চাদের বেশী হলেও যে কোনো বয়সেই হতে
পারে। এ রোগটি হলে গলা ব্যথা হয়, সেই সাথে তীব্র জর ও থাকে, বাচ্চারা
কিছু খেতে চায়না, গলার স্বর পরিবর্তিত হয়ে কিছুটা ভারী হয়ে যায়, সেই
সাথে মুখে দুর্গন্ধ, গা ম্যাজ ম্যাজ করা, মাথা ব্যথা, কানে ব্যথা থেকে
কোষ্ঠ কাঠিন্য পর্যন্ত হতে দেখা যায়। অনেক সময় গলার বাইরের দিকে দুপাশে
বড়ই বিচির মতো দুটি দানা ফুলে উঠতেও দেখা যায়, অনেকে এগুলোকে টনসিল মনে
করলেও এরা কিন্ত টনসিল নয়। রোগী বড় করে মুখ হা করলে ভেতরের দিকে যে দুটি
বড় দানার মতো দেখা যায় তাই হলো টনসিলাইটিস এ আক্রান্ত টনসিল।
টনসিলাইটিস
হলে রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হয়। প্যারাসিটামল জাতীয় অসুধ এর ব্যথা ও জ্বর
নিবারনে কার্যকরি ভূমিকা রাখে। হাল্কা কুসুম গরম পানিতে সামান্য
এন্টিসেপ্টিক বা লবন মিশিয়ে গড়গড়া করলে রোগী আরাম বোধ করে। অনেক রোগীকেই
আদা ও লেবু দিয়ে তৈরী র’ চা (Raw Tea)
পান করলে স্বস্তি বোধ করতে দেখা যায়। ভিটামিন সি ও এই রোগের উপশমে অবদান
রাখে। নাক কান ও গলা বিশেষজ্ঞগন এর চিকিৎসায় সবচেয়ে পারদর্শী। তারা এ
রোগের জন্য ৫ থেকে ৭ দিনের এন্টিবায়োটিকের কোর্স দিয়ে থাকেন যা গ্রহনে
অধিকাংশ রোগীই দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। তবে কারো যদি বার বার টনসিলাইটিস হয়
বা এর জন্য অন্য কোনো জটিলতার সৃষ্টি হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে টনসিল কেটে
ফেলে দিতে হয়, একে টনসিলেকটমি অপারেশন বলে।
টনসিলেকটমি
অপারেশন করিয়ে নিলে কারো আর টনসিলাইটিস হবার কোনো সম্ভাবনা থাকেনা। তাই
যারা টনসিল এর সমস্যার জন্য বারবার বিপর্যস্ত হতে চাননা তারা এই স্থায়ী
সমাধানের ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সাইনুসাইটিস (Sinusitis)
মুখমন্ডল ও মস্তিস্কের হাড়কে হাল্কা করার সুবিধার্তে এর ভেতরে কিছু বায়ুকুঠুরি আছে যার নাম সাইনাস (Sinus), আর এর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এর জন্য যেই রোগটি হয় তাই আমাদের অতিপরিচিত সাইনুসাইটিস(Sinusitis)।
মাথার হাড়ে এমন চারটি সাইনাস রয়েছে, এর
মধ্যে ম্যাকজিলারি ওফ্রন্টাল সাইনাস দুটি বড় তাই রোগ ও এতে বেশী হয়। এরা
নাকের গর্তে গিয়ে শেষ হয়। মাথার হাড়ের ওজন কমানো ছাড়াও মানুষের মুখের
শব্দকে ভারী এবং কিছুটা নাসিকাময় করায় এদের ভূমিকা আছে।
সাধারণত ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমনেই সাইনুসাইটিস হয়ে থাকে। তবে নাকে আঘাত পাওয়া, এলার্জি, ঠান্ডা লাগা, ধুলাবালু, নাকের হাড় বাকা হয়ে যাওয়া, নাকে টিউমার হওয়া নানাবিধ কারন গুলো এ রোগের প্রকোপ অনেকগুনে বাড়িয়ে তোলে।
নাক দিয়ে
অবিরত পানি পরা বা হটাৎ করে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়াটা সাইনুসাইটিস
রোগের একদমই পরিচিত একটি উপসর্গ। সেই সাথে তীব্র-দীর্ঘ ও বিরক্তিকর মাথা
ব্যথা তো রয়েছেই, সাইনাস গুলোর ঠিক উপরেও একটা চাপা ব্যথা থাকে। মাথা ভারী
ভারী লাগা ও সবকিছু খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া এরোগটিকে নানাভাবে
তীব্র অস্বস্তিকর একটি রোগে পরিনত করে। অনেক সময় এর সাথে জর, গা ম্যাজ
ম্যাজ করা এবং মানসিক অবসাদ যোগ হয়ে রোগীকে ভীত করে তোলে।
অনেকের এই
রোগটি বছরে কয়েকবার হয়ে থাকে, বিশেষ করে যারা বিভিন্ন এলার্জিতে
ভোগেন, তাই এরোগ এড়াতে ঐসব ব্যাপারে বিশেষ সাবধান হওয়া
আবশ্যক। শুষ্ক, খোলামেলা এবং যথেষ্ট আলো বাতাস আছে এমন ঘরে বসবাস
সাইনুসাইটিসের সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস করে।
এতো কিছুর পরও যদি এরোগ হয়েই যায় তাহলে নাক,কান,গলা বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক, হিস্টাসিন জাতীয় কিছু অসুধ এবং প্যারাসিটামল এরোগে বেশ কার্যকারিতার দাবী রাখে। সেই সাথে নাকে বাষ্পের ভাপ নেয়া, পুষ্টিকর ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া এবং বিশ্রাম নেয়া এরোগে বেশ আরাম দেয়।ব্রাঙ্কিয়াল ফিস্টুলা (Branchial Fistula)
অনেক
সময় শিশুদের এমনকি কৈশোরেও গলার নিচের দিকে প্রায় মাঝ বরাবর একটি ছোট্ট
ছিদ্র দেখা যায়। এটি দিয়ে ক্রমাগত পানি অথবা পুঁজ মিশ্রিত পানি বের হতে
দেখা যায়। জন্মগত এই ত্রুটিটির নামই ব্রাঙ্কিয়াল ফিস্টুলা। এটা লম্বা একটা
নালীর মতো সরু একটি পথ যার ভেতরের মুখটি থাকে গলার ভিতরে, জিহবার গোড়ার
দিকে এবং বাইরের মুখটি থাকে গলার বাইরের দিকে চামড়ায়। ব্রাঙ্কিয়াল ফিস্টুলা
অনেক সময় গলার দুই পাশেও হতে পারে।
বেশ
অস্বস্তিকর এবং বিরক্তিকর এই রোগটি থেকে শিশুকে মুক্তি দিতে হলে বাবা-মা
এর অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ শিশু সার্জন অথবা নাক, কান, গলা সার্জন এর সাথে
যোগাযোগ করা উচিত। অপারেশন করে ঐ সরু অস্বাভাবিক পথটি ফেলে দেয়াই হলো এই
রোগের একমাত্র সফল চিকিৎসা।
কেমোডেকটোমা / নিউরোজেনিক টিউমার
খুব
উচূ স্থানে বা পাহাড়ে বসবাস করে এমন লোকজনেরই সাধারনত এই টিউমারটি হতে
দেখা যায়। ৪০ বছরের আগে এই টিউমার হবার সম্ভাবনাও খুব কম। গলার
মাঝামাঝি, যে কোন এক পাশে এই টিউমারটি হতে দেখা যায়। এটা নিরীহ শ্রেনীর
একটি টিউমার আর তাই অনেকদিন ধরে খুব অল্প অল্প করে এটা বড় হতে থাকে। বড়
হলে এটা জলপাই এর মতো হয় এবং ধরলে রবারের মতো হাল্কা শক্ত মনে হয় এবং
নাড়ির স্পন্দন এর সাথে সে লাফাতে থাকে।
একে
অনেক সময় চেপে ধরে রাখলে এটা ছোটো হয়ে যায়। এর আরেক নাম ক্যারোটিড বডি
টিউমার। অন্য সব টিউমারের মতো কেমোডেকটোমার বায়োপসি বা এফ,এন,এ,সি করা
যায়না। ক্যারোটিড এনজিওগ্রাম বা এম,আর,আই করে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে
হয়। কেমোডেকটোমার একমাত্র চিকিৎসা হলো সার্জারি। রোগীর বয়স বেশী হলে
অবশ্য সার্জারি না করানই ভালো। এর অপারেশন বেশ ঝুকিপূর্ণ, তাই অভিজ্ঞ
ভাসকুলার সার্জন দ্বারা এর অপারেশন করানো উচিত। এডেনয়েড (Adenoid)
এডেনয়েড
একধরনের টনসিল, এর অবস্থান নাকের গভীরে একদম পেছনের দিকে গলার উপরিভাগে।
এর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হলে এটা বড় হয়ে যায় এবং নানাবিধ সমস্যা ও উপসর্গের
আবির্ভাব ঘটে। বাচ্চাদের এডেনয়েড বড় হয়ে গেলে তাদের শ্বাসকষ্ট হয় এবং
তাদের নাকের বদলে মুখ (Mouth breather)
দিয়ে শ্বাস নিতে দেখা যায়। এজন্য বাচ্চারা খেতে চায়না এবং তাদের স্বাস্থ্য
খারাপ থাকে। এডেনয়েড বড় হলে গলার স্বর পরিবর্তিত হতে পারে এবং বাচ্চা কানে
কম শোনা শুরু করে। এ ধরনের শিশুদের কানপাকা (Otitis Media) রোগ হবারও সুযোগ থাকে। অনেকদিন ধরে এ রোগে ভূগতে থাকলে এক সময় শিশুটির মুখ দিয়ে সবসময় লালা ঝরে পরতে থাকে (Drooling)। দাঁত উচু নিচু হয়ে যাওয়া, নাক বোঁচা হয়ে যাওয়া, চেহারা বোকা বোকা হয়ে যাওয়া, রাত্রে বিছানায় প্রসাব করে দেয়া (Enuresis) এসব উপসর্গও কালক্রমে একসময় শিশুটির কষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নাক
কান গলা বিশেষজ্ঞগণের তত্ত্বাবধানে এই রোগের চিকিৎসা করানো উচিত। রোগের
প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করালে এন্টিবায়োটিক, নাকের ড্রপ ও হিস্টাসিন
জাতীয় অসুধ সেবনে এই রোগ নিয়ন্ত্রনে থাকে। সেই সাথে শ্বাসের কিছু ব্যয়াম
করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, খোলামেলা পরিবেশে থাকা ইত্যাদি বিষয় গুলোও
রোগীকে সুস্থ্য রাখতে সাহায্য করে। এডেনয়েড খুব বড় হয়ে গেলে অপারেশন (Adenoidectomy)
করানো ছাড়া এটা ভালো হয়না। যে সকল শিশুর এডেনয়েড বড় হবার কারনে মুখ দিয়ে
শ্বাস নিতে হয় বা শ্বাস কষ্ট হয় তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে নেয়াই
বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
থাইরোগ্লোসাল সিস্ট (Thyroglossal Cyst)
থাইরোগ্লোসাল
সিস্ট হলে গলার ঠিক মাঝ বরাবর ছোট্ট একটি অংশ ফুলে থাকে। আসলে এই ফুলে
থাকা অংশটিই হলো সিস্ট। এর ভেতরে পানির মতো তরল থাকে। সাধারনত শিশুদের
জন্মের পরে এই সমস্যাটি দেখা দিতে পারে তবে পরিণত বয়সেও এটি দেখা দিতে
পারে। এটা আসলে একটি জন্মগত ত্রুটি, থাইরয়েড হরমোন গ্রন্থিটির নিচে নামার
পথটি রয়ে গেলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। শিশু ঢোক গেলার সময় বা জিহবা বের করলে
এই সিস্টটি গলার সামান্য উপরের দিকে উঠে আসে, এটা দেখেই চিকিৎসকেরা এই
রোগটি সনাক্ত করে থাকেন। এটির একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন করে সিস্ট টি
ফেলে দেয়া। এই অপারেশনের নাম সিস্ট্রাঙ্ক অপারেশন। শিশু সার্জন বা নাক কান
গলা সার্জন উভয়েই এই অপারেশন করতে অভিজ্ঞ বলে ধরে নেয়া হয়।
লাডউয়িগ এনজিনা (Ludwig’s Angina)
এনজিনা শব্দটি শুনলে আমরা অনেকেই ভাবি এটা বুঝি বুকে ব্যথা বা হৃদপিন্ডের ব্যথা। লাডউয়িগ এনজিনা আসলে তেমন কিছু নয়, তবে এটাতেও ব্যথা হয় এবং সেটা বুকে নয় বরং মুখে। এটা স্ট্রেপটোকক্কাস নামক একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত মুখগহ্বরের সেলুলাইটিস (Cellulitis) জাতীয় একটি ইনফেকশন, থুতনির
কাছে বাদামি হয়ে যাওয়া এবং মুখের ভেতর ফুলে যাওয়া সেই সাথে মুখে তীব্র
দুর্গন্ধ হওয়া এসবই এই রোগের লক্ষন। এ রোগে অনেক সময় রোগীর ঢোক গিলতে
অসুবিধা হয় এবং শ্বাস নিতেও অসুবিধা হতে পারে।
এমন হলে রোগীকে অবশই নাক,কান, গলা
বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর কাছে যেতে হবে। অনেক সময় শিরায় এন্টিবায়োটিক অসুধ
ব্যবহারেই এই রোগ ভালো হয়ে যায়। তবে রোগটি আরো জটিল হয়ে গেলে অপারেশন এর
প্রয়োজন হতে পারে। লোকাল এনেসথেসিয়া দিয়ে শুধু ঐ স্থানটি অবশ করে থুতনির
নিচে সামান্য অংশ কেটে এই অপারেশন করা হয়। বেশী জটিল হলে রোগীর গলার ভেতরে
নলও দেয়া (Tracheostomoy) লাগতে পারে।