বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস যাত্রা ॥ বার্নে শোনা ৭ মার্চের ভাষণ




বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস যাত্রা ॥ বার্নে শোনা ৭ মার্চের ভাষণ
ওয়ালি-উর রহমান
৭ মার্চ ১৯৭১। আমি তখন সুইজারল্যান্ডে। কয়েক দিনের রেডিও টিভি ও সংবাদপত্রের খবরে জানতে পেরেছিলাম বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন মার্চের ৭ তারিখে রেসকোর্সে। ইউরোপের প্রধান দৈনিকগুলো-লন্ডন টাইমস্, টেলিগ্রাফ, ইকোনমি, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, অবজারভার, লোমন্ড, জার্নাল জনেড আমি নিয়মিত পড়তাম। নদীর পাড়ে ছোট শহর বার্ন-সুইস রাজধানী, সেখানে একটি বিদেশী রেডিওতে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ঘোষণা শুনলাম। আমার কাছে একটা পুরনো রেডিও ছিল। সেখানে রেডিও পাকিস্তান শুনতে পেতাম। বার বার ওরা রিপিট করল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। সেখানে স্পষ্ট শুনতে পেলাম তিনি বলছেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রতিদিনই ফুটে উঠছে। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত প্রতীকী স্টাইলে ভাষণটি দিয়েছেন।ৎৎ


একদিকে মুক্তিকামী মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানী শাসকদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিয়েছেন। উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব-টা সরাসরি হলো না। হলে, রেসকোর্স হয়ে যেত লাশের স্তূপ। আমি শুনতে পেয়েছিলাম যে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে কামান তাক করে রাখা হয়েছিল রেসকোর্সের দিকে। ওদের আর্টিলারি ও ক্যাভালরি ছিল রণসজ্জায়। ২ থেকে ৪ স্কোয়াড্রন যুদ্ধ বিমান ঢাকার আকাশকে ল-ভ- করে দিত। অন্যদিকে বহির্বিশ্বেও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে পারত পাকিস্তানি প্রশাসন- বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দিয়েছেন। তখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, যা রেসকোর্স নামে প্রসিদ্ধ ছিল, বোম্বার্ডমেন্ট করে বঙ্গবন্ধুসহ লাখ লাখ বাঙালীকে মারতেও তারা পিছপা হতো না। আমি আগেই এক লেখায় বলেছি, বঙ্গবন্ধু শুধু একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বমাপের কূটনীতিবিদ। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি সবকিছুকে প্রকাশ করেছেন একজন কূটনীতিবিদের মতো। তিনি বলেছেন, বিগত ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস। তিনি ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর নির্বাচন, ৫৮-এর সামরিক শাসন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনসহ তৎকালীন পাকিস্তানে বাঙালী বঞ্চনার কথা জানিয়েছেন, অন্যদিকে যুদ্ধকৌশলও বলে দিয়েছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, যদি যুদ্ধ হয় তবে বাঙালীরা যেন বর্ষাকালকে বেছে নেয় যুদ্ধের জন্য। আমার মনে হয়, এ বক্তৃতার সারমর্ম পাকিস্তানীরা বুঝতে পারেনি। শুধু যাদের জন্য এই বক্তৃতা করেছেন তিনি, তারা ঠিকই তা বুঝতে পেরেছিলেন। আমার স্বল্প জ্ঞানে আমি এ বক্তৃতাকে তুলনা করি রোমান সাম্রাট সিসেরোর বক্তৃতার সঙ্গে। এ বক্তৃতার তুলনা হয় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পিটসের ভাষণের সঙ্গে। আর তুলনা চলে আব্রাহাম লিঙ্কনের বিখ্যাত গ্যাটিসবার্গ এড্রেসের সঙ্গে। আমি মাঝে মধ্যে ভাবি, তিনি কিভাবে এ রকম চমৎকার একটি ভাষণ তার প্রিয় জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন।
সম্প্রতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেন, ৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বক্তৃতার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, টউও (টহরষধঃবৎধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব) ঘোষণা করবেন। এটা করলে বিদ্রোহের শামিল হতো। আমার সামনে বায়াফ্রার দৃষ্টান্ত ছিল। বায়াফ্রা বিদ্রোহ করলেন এবং জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হধষ খবমরঃরসধপু পেলেন না। কারণ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থেকে কেউ প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে না। নাইজিরিয়া সরকার তাদের ওপর অত্যাচার করেছে সত্য, কিন্তু পৃথিবী সেভাবে তাদের স্বাধীনতার স্পৃহাকে স্বাগত জানায়নি। কারণ জাতিসংঘ যতক্ষণ কোন রাষ্ট্রকে মেনে না নেয়, ততক্ষণ কেউ খবমরঃরসধপু পেতে পারে না। বঙ্গবন্ধু যখন টউও-এর ধারণাটা পরিবারের সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করলেন, তখন মহীয়সী বেগম ফজিলাতুন্নেসা বললেন, ‘না, এটা তুমি করতে পারবে না। ছয় দফার মধ্যে দিয়ে তুমি বাঙালী হৃদয়ে যে স্থায়ী আসন বানিয়েছ, তোমার এ ঘোষণা তাদের কি ক্ষতির সম্মুখীন করবে-ভেবে দেখেছ? পাকিস্তানী আর্মি ওৎপেতে বসে আছে তোমার এ ঘোষণার জন্য। ওরা টউও শুনে তোমাকে তো মারবেই, তোমার প্রিয় বাঙালী জাতিকেও শেষ করে দেবে।’ বেগম মুজিবের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু নাকি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পাইপ ধরালেন। তখনই তিনি টউও-এর ধারণা থেকে সরে এলেন। ঠড়রপব ড়ভ অসবৎরপধ-য় শেখ হাসিনার সেদিনের স্মৃতিচারণা থেকে এ বিষয়টি নতুন করে বেরিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধু যদি উরধৎু লিখতেন তাহলে সে মুহূর্তটিকে আরও সজীব করে রাখতে পারতেন। বেগম মুজিব না থাকলে শেখ মুজিব আজকের ‘মহামানব মুজিব’ হয়ে উঠতেন কি না, আমার সন্দেহ। বেগম মুজিবের অনেক সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধু বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতেন। রাজনীতিবিদের সঙ্গে সংসার করতে করতে তিনি নিজেও পাকা রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে টউও ঘোষনা না দেয়াটা একটি মাইলফলক। এর মাত্র ৯ মাস পরই বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
৭ মার্চের ভাষণ নানা কারণে ঐতিহাসিক। এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতা। এ বক্তৃতার কারণে তিনি ‘চড়বঃ ড়ভ চড়ষরঃরপং’ হিসেবে খ্যাত। অনেকে অনেকভাবে ৭ মার্চকে ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ কবিতা লিখেছেন, কেউ প্রবন্ধ লিখেছেন। আবার অনেকে বিতর্ক ছড়িয়েছেন। কেউ এমনও লিখেছেন- অমুকের কারণে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা সরাসরি দেননি। কিন্তু আজ আমি স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, বেগম মুজিবের কারণেই সেদিন তিনি টউও থেকে সরে এসেছিলেন। স্ব^াধীনতার সরাসরি ঘোষণা না দিলেও স্বাধীনতার চেতনাকে আরও বেগবান এবং পোক্ত করতে পেরেছিলেন। এ বক্তৃতাটি স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতার মধ্যে এক নম্বর। গ্যাটিসবার্গ এড্রেস আব্রাহাম লিঙ্কন লিখে নিয়েছিলেন। লাখো জনতার সামনে একটি অনুপম কবিতার মতো, স্ফুলিঙ্গের মতো, সাগরের উত্তাল জলরাশির মতো শব্দগুলো উচ্চারণ করেছেন বঙ্গবন্ধু। এর গ্রন্থনা, তাৎপর্য, গুরুত্ব সেদিন যারা কাছে বসে শুনেছেন, তারাই বুঝতে পারবেন। সমগ্র বাঙালী জাতিকে এক করতে এ ভাষণের কোন বিকল্প ছিল না। তিনি যথার্থই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালী। সিসেরো রোমানদের উজ্জীবিত করতে অনেক চমৎকার চমৎকার বক্তৃতা করেছিলেন। তাঁর বাগ্মিতাও ছিল অসাধারণ। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বঙ্গবন্ধুকে একমাত্র সিসেরোর সঙ্গে তুলনা করা যায়; যিনি রোমান পার্লামেন্টে অনেক অলিখিত ভাষণ দিয়েছেন। রোমান শৌর্য-বীর্যের বীজ নিহিত ছিল সিসেরোর বক্তৃতায়। জাতিকে উজ্জীবিত করতে তাঁর তুলনা ছিল না। এখনকার রোম থেকে একটু ওপরে ক্যাম্পুদুরিয়ায় ছিল রোমান পার্লামেন্ট। সেখানে তিনি ঊীঃববসঢ়ড় যে ভাষণ দিতেন, সেগুলো নিয়ে এখনও গবেষণা হয়। তিনি লিখিত যে সব ভাষণ দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে এত আলোচনা হয় না। বঙ্গবন্ধু কয়েক মিনিটে যা উচ্চারণ করেছেন এর সমগোত্রীয় কোন ভাষণ আজও আমার চোখে পড়েনি।

লেখক : গবেষক, সাবেক কূটনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ
wali.heritage@gmail.com
সূত্র-দৈনিক জনকন্ঠ-তারিখ:০৪মার্চ ২০১৪।












^উপরে যেতে ক্লিক করুন