টাইফয়েডের কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
টাইফয়েড রোগের জীবাণু হলো সালমোনেলা টাইফি (প্যারা টাইফয়েডের-সালমনেলা প্যারা টাইফি)।
লক্ষণঃ প্রথমে অল্প মাত্রার জর হলেও এর তীব্রতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং ৪ -৫ দিন পর তা অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পৌছে। এর সাথে মাথা ব্যথা, শরীর ও হাতে পায়ে ব্যথা সহ গা ম্যাজ ম্যাজ করা ভাব ও থাকে।
পরীক্ষাঃ ব্লাড কালচার এর নির্দিষ্ট পরীক্ষা, এ ছাড়া ভিডাল (widal) টেষ্ট দ্বারাও এরোগ নির্ণয় করা যায় ।
চিকিৎসাঃ ব্লাড কালচার এর ফলাফল অনুযায়ী
অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক সেবন করতে অথবা শিরায় গ্রহন করতে হয়।সাবধাণতাঃ চিকিৎসা না নিলে এ রোগের জটিলতা হিসাবে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
সাম্যালেরিয়া জ্বরের কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
প্লাজমোডিয়াম, ফেলসিপেরাম*, ভাইভক্স, ওভালে অথবা ম্যালেরি এর যেকোনো একটি জীবানু বহনকারী মশার দংশন থেকে এ রোগ হয়।
লক্ষনঃ খুব উচ্চ তাপমাত্রায় (চল্লিশ ডিগ্রি ফাঃ পর্যন্ত) কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা এবং তা ঘাম দিয়ে ছেড়ে যাওয়া। জ্বর আসা যাওয়া নিয়মিত ও নির্দিষ্ট বিরতিতে (যেমন ১ দিন পর পর ৩-৪ ঘন্টা দীর্ঘ) হতে পারে তবে এটা ঠিক কোন জীবানু টি আক্রমণ করেছে তার উপর নির্ভরশীল।
পরীক্ষাঃ রক্তের ব্লাড ফিল্ম নামক পরীক্ষাটি দ্বারা জীবানু নিশ্চিত করা যায়।
চিকিৎসাঃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্লোরোকুইন, কুইনাইন, ফেন্সিডার ইত্যাদি নির্দিষ্ট নিয়মে সেবন করতে হয়।
জটিলতাঃ রক্ত শুন্যতা, প্লিহা (Spleen) বড় হয়ে যাওয়া, কোমা সহ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
প্রতিরোধঃ কোনো অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব থাকলে সে স্থানে যাবার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কলোরোকুইন বা প্রগুয়ানিল জাতীয় ঔষধে এ রোগের প্রকোপ থেকে বাচা যায়।
চিকেন পক্সের লক্ষণ, চিকিৎসা, প্রতিকার
জীবানুঃ ভ্যারিসেলা জোস্টার নামক ভাইরাস।
বিবরণঃ খুব ছোয়াচে একটি রোগ, মূলত শিশুরাই এর আক্রমনের শিকার হয় তবে বয়স্করাও এর হাত থেকে নিরাপদ নয়।
লক্ষনঃ সাধারণত আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সংষ্পর্শে এলে ২-৩ সপ্তাহ পরে এই রোগের লক্ষন দেখা দেয়। প্রথম দিকে হঠাৎ করেই জ্বর আসে, পিঠের পিছনের দিকে ব্যথা হয় এবং গা ম্যাজ ম্যাজ করে। জর আসার ১ অথবা ২ দিন পর প্রথমে শরীরের উপরের অংশে এবং পরে মুখ ও হাতে পায়ে ফুস্কুরির মতো গোটা উঠে। ১ দিনের মধ্যেই এটা পেকে যায় বা এতে পুঁজ জমে।
অল্প কিছু দিনেই এটা শুকিয়ে চল্টা পড়ে।
জটিলতাঃ অনেক সময় এর জটিলতা হিসাবে নিউমোনিয়া, এনকেফেলাইটিস, গ্লুমেরুলোনেফ্রাইটিস সহ ইত্যাদি রোগ হতে পারে।
চিকিৎসাঃ শিশুদের লক্ষন উপশম ব্যতিত তেমন কোন চিকিৎসার প্রয়জন নেই। তবে ফুস্কুরিতে ইনফেকশন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়টিক খেতে হতে পারে। যেসব রোগীর রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কম অথবা যাদের বয়স বেশী কিংবা রোগের তীব্রতা বেশী তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিভাইরাল (এসাইক্লোভির) খেতে হতে পারে।
ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগের কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
উচেরেরিয়া ব্যানক্রফটি নামক জীবানু এই রোগের জন্য দায়ী। মূলত কিউলেক্স মশার কামড়ে এই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তবে অ্যানোফেলিস ও এডিস মশার কামড়ে ও এই পরজীবীর জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
লক্ষনঃ প্রথমে অল্প মাত্রার জর সেই সাথে লিম্ফ নালী বরাবর ব্যাথা এবং লাল হয়ে যাওয়া। কিছুদিন পরে আক্রান্ত অঙ্গ ফুলে যায় এবং
এটা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে যা এক সময় বিশাল আকৃতি ধারণ করতে পারে। সাধারণত পা, অন্ডকোষ সহ অন্যান্য অঙ্গ ও এতে আক্রান্ত হতে পারে। মেয়েদের
ক্ষেত্রে স্তনের চামড়া ফুলে পুরু হয়ে খসখসে হয়ে উঠে। দেখতে হাতির চামড়ার
মত মনে হয় বলে গোদ রোগের অন্য নাম এলিফ্যানটিয়াসিস।
পরীক্ষাঃ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি অথবা লিম্ফ নোড কালচার করে এর জীবানু নিশ্চিত করা যায়।
চিকিৎসাঃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডাইইথাইল কার্বামাজেপিন নামক ঔষুধ সেবন করতে হয়। ২ বছরের কম শিশুদের ও গর্ভবতী মহিলাদের এই ঔষধ সেবন করা যাবে না।
প্রতিরোধঃ মশা নিধন করতে হবে, ঘুমানোর সময় মশারী ব্যবহার করা উচিত।
কালাজ্বরের কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
হিন্দি দুটি শব্দ কালা এবং আজর থেকে কালাজ্বর শব্দটি এসেছে। কালা অর্থ কাল এবং আজর শব্দের অর্থ ব্যাধি। তাই
যে অসুখে ভুগলে শরীর কালো হয়ে যায় তাকে কালাজ্বর বলে। লিশমেনিয়া ডোনোভানি
জাতীয় প্রটোজোয়া যা স্যান্ড ফ্লাই দাড়া মানুষে সংক্রমিত হয়।
লক্ষনঃ প্রথমে অল্প মাত্রার জর থাকলেও পরবর্তীতে তা তীব্র মাত্রা ধারণ করে এবং নিয়মিত বিরতিতে আসা যাওয়া করে।
ধীরে ধীরে মুখের রঙ কালচে হয়ে যাওয়া সেই সাথে কাশি এবং ডায়রিয়া ও থাকতে পারে।
পরীক্ষাঃ অস্থি মজ্জা থেকে স্মেয়ার নিয়ে জীবানু সনাক্ত করা হয়, লিম্ফ নোড, লিভার বা প্লিহা (spleen) থেকেও স্মেয়ার নেয়া যায়, এসব কালচার করেও জীবানু নিশ্চিত করা যায়। রক্ত (সেরোলোজিকাল) পরীক্ষার মাধ্যমে ও এই রোগ নির্ণয় (৯৫%) করা যায়।
চিকিৎসাঃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সোডিয়াম স্টিলবোগ্লুকোনেট নামক ঔষধ শিরায় প্রয়োগ করতে হয়।
ডেংগু / ডেঙ্গী জ্বরের কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
দুই ধরণের ডেঙ্গু রোগ লক্ষ্য করা যায়, ক্লাসিকাল ডেংগু ও হেমোরেজিক ডেংগু। ক্লাসিকাল ডেংগু রোগ হলে হঠাৎ করে তীব্র জর, মাথা ব্যাথা, তীব্র শরীর ব্যাথা সেই সাথে rash উঠতে পারে, যা প্রথমে পায়ে এবং পরে বুকে এবং পিঠের দিকে ছড়ায়। সাধারণত ৩-৪ দিন পর জর চলে যায় এবং পরে তা আবার অল্প মাত্রায় আসতে পারে।
হেমোরেজিক ডেংগু হলো দুই ধরণের ডেঙ্গুর সবচেয়ে খারাপ ধরণ টি। সাধারণত একই রোগীর দ্বিতীয় বার ডেংগু জর হলে এমনটি হয় বলে ধরে নেয়া হয়। রোগটি শুরু হয় অল্প মাত্রার জর দিয়ে এবং শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়।
এ রোগ হলে হঠাৎ করেই রোগী শক এ চলে যেতে পারে এবং ত্বক, কান, নাক এমনকি পায়ুপথ দিয়ে রক্তপাত শুরু হতে পারে। এই ধরনের ডেংগু জরে রোগীর মৃত্যুর হার বেশী।
পরীক্ষাঃ বিভিন্ন পরীক্ষার (নিউট্রালাইজেশন, সিএফটি, হিমাগ্লুটিনেশন) মাধ্যমে রক্তে ডেংগুর এন্টিবডি দেখে এই রোগ শনাক্ত করা হয়। রক্তে প্লাটেলেট কমে যায় বলে বার বার প্লাটেলেট কাউন্ট ও এস,জি,পি,টি পরীক্ষা সহ অন্য পরীক্ষাও করা হয়ে থাকে।
চিকিৎসাঃ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হয়েই এই রোগের চিকিৎসা নেয়া উচিত।
ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) এর কারন, লক্ষণ ও চিকিৎসা
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এ অথবা বি মানব দেহে এই রোগ করে থাকে।
লক্ষনঃ কাপুনি দিয়ে জর, সমস্ত শরীর ও হাতে পায়ে ব্যথা, তীব্র মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা এবং শুকনো কাশি এই রোগের লক্ষন হিসাবে পরিচিত।
পরীক্ষাঃ তেমন কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয়না তবে সি,এফ,টি পরীক্ষাটি করে অনেক সময় রোগ নির্ণয় করা হয়।
চিকিৎসাঃ বিশ্রাম নেয়া সেই সাথে জর উপশমের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষুধ খেলে এই রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে যায়, তবে সাথে অন্য ইনফেকশন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়।
জটিলতাঃ এ রোগের জটিলতা হিসাবে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন, নিউমনিয়া সহ অন্যান্য রোগ দেখা দিতে পারে।
সোয়াইন ফ্লু (Swine Flu)
সোয়াইন
ফ্লু নামটি শুনলেই বোঝা যায় এটা শুকরের একটি অসুখ। আসলে শুকরের
ইনফ্লুয়েঞ্জার অপর নামই হচ্ছে সোয়াইন ফ্লু। একে হগ ফ্লু বা পিগ ফ্লু নামেও
ডাকা হয়। শুকরের এমন রোগ হলে তা শুকরের মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক
শুকর মারা যায়। তাহলে তাতে মানুষের এতো ঘাবড়ানোর কি আছে?
আছে, যারা শুকর লালন পালন বা চাষাবাদ করে শুকর থেকে তাদের এ রোগ আসতে পারে, আবার
যে সকল মানুষ ঐসব খামারির সংস্পর্শে আসবে তাদেরও এই রোগ হতে পারে। তবে
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই যে ২০০৯ সালে যে সোয়াইন ফ্লু নিয়ে আমরা এতো
চিন্তিত তা কিন্ত শুকর থেকে আসেনি তবে হ্যা শুকরের এমন রোগ হতে পারে কিংবা
হয়েও থাকে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগটি ভাইরাস জনিত একটি রোগ, বর্তমান সোয়াইন ফ্লু রোগটি যে ভাইরাস দ্বারা হয়েছে তা হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ‘সি’ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ‘এ’ এর কিছু সাবটাইপ দিয়ে (H1N1-এইচ ওয়ান এন ওয়ান)। এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কিংবা কাশির মাধ্যমে একজন সুস্থ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে সৃষ্ট বাষ্পকনা বাতাসে ভেসে বেড়িয়ে এই সংক্রমন ঘটায়, এটা নিত্য ব্যবহার্য্য কোন স্থানে বা পাত্রে জমে থেকেও সংক্রমন ঘটাতে পারে। ঐ পাত্র বা স্থান (যেমন টেবিল, চেয়ার, টেলিফোন, দরজার হাতল ইত্যাদি) একজন সুস্থ ব্যক্তি যদি হাত দিয়ে স্পর্শ করে এবং ঐ হাত দিয়ে তার নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করে তাহলে তা থেকে সুস্থ ব্যক্তির সোয়াইন ফ্লু হতে পারে। এজন্য এ রোগের হাত থেকে বাঁচতে হলে আক্রান্ত রোগীর হাঁচি কাশি থেকে দূরে থাকতে হবে, যেহেতু জনসমাগম বেশী এসকল স্থানে কারো এই রোগ থাকতে পারে তাই ঐ সকল স্থানের কোনো কিছু স্পর্শ করে সাথে সাথে নাকে, মুখে বা চোখে হাত দেয়া যাবেনা। তবে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিলে হাতে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস থাকেনা।
এজন্য জনসমাগমে বা Public place এ যেতে হয় এমন লোকজনদের দিনে বেশ কয়েকবার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। বার্ড ফ্লু এর মতো সোয়াইন ফ্লু শুকরের মাংসের মাধ্যমে ছড়ায় না কারন এসকল মাংস ভালো করে রান্না করে প্রস্তত করলে তা ভাইরাস মুক্ত হয়ে যায়। তবুও এই সময়ে শুকরের মাংসভোজীদের বিশেষ সাবধান থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
কিভাবে বুঝবেন আপনার বা আপনার আশেপাশের কারো সোয়াইন ফ্লু হয়েছে কিনা? সোয়াইন ফ্লু আক্রান্ত রোগী অন্যান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত রোগীর মতোই উপসর্গে ভোগে। যেমন জ্বর, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা, গা ব্যথা, মাথা ব্যথা, ক্লান্তি লাগা বা অতিরিক্ত দুর্বল লাগা এবং শীত শীত লাগা। তাই এই সব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিসৎকের পরামর্শ নিন এবং আপনার হাঁচি এবং কাশির মাধ্যমে অন্য কেউ যেনো আক্রান্ত না হয় এজন্য হাঁচি -কাশি হলে তা রুমাল, গামছা বা অন্য কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারনত প্রথম ৫ দিন এই রোগ ছড়িয়ে থাকে তবে শিশুদের এই রোগ হলে তারা ১০ দিন পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে।
দুটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায় কারো সোয়াইন ফ্লু হয়েছে কিনা, একটি হলো গলার ভিতর থেকে সোয়াব (Nasopharyngeal swab) নিয়ে তার ভাইরাল কালচার (viral culture) করা, এটির মাধ্যমে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, অন্যটি হলো রক্তে H1N1 ভাইরাসের এন্টিবডি PCR (পলিমারেজ চেইন রিয়েকশন) এর মাধ্যমে নির্নয় করা, এটি অনেকটা ভাইরাসের উপস্থিতির পরোক্ষ প্রমান বহন করে।
সোয়াইন ফ্লু প্রতিরোধের জন্য এখনো কার্যকরি কোনো টিকা বা ভেক্সিন আবিস্কৃত হয়নি তবে আশা করা যায় ২০০৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে এমন ভেক্সিন বাজারে আসতে পারে; তবে এর চিকিৎসার জন্য এন্টিভাইরাল অসুধ এখন বাজারে বেশ সহজ লভ্য। ট্যামিফ্লু (Tamiflu) যার প্রকৃত নাম ওসেলটামিভির (oseltamivir) বা Relenza (zanamivir) নামে এই অসুধ গুলো বাজারে পাওয়া যায়। ৫ দিনে দুইবেলা করে মোট ১০ অসুধ এই ভাইরাসকে দুর্বল করে রোগের প্রকোপ কমিয়ে নিয়ে আসে। চিকিৎসা নিতে দেরী করলে বা অবহেলা করলে এ রোগে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সাধারনত রেস্পিরেটরি ফেইলুর হয়ে এই মৃত্যু হয়, তবে নিউমোনিয়া, পানি শুন্যতা, তীব্র জ্বর বা ইলেক্ট্রোলাইট ঘাটতির জন্যও মৃত্যু হতে পারে।
সোয়াইন ফ্লু এমন একটি রোগ যা একটু সাবধান হলে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য জনসচেতনতা তৈরী করা খুব জরুরী। আপনি নিজে যা জানেন অপরকে তা জানিয়ে সাবধান ও সতর্ক করে দিন। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে নিরাপদ দুরত্বে থাকুন, খোলা স্থানে গেলে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাক-মুখ-চোখ স্পর্শ করুন, সম্ভব হলে জনসমাগম এড়িয়ে চলুন, রোগের সন্দেহ হলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ীই শুধু অসুধ সেবন করুন, বিশ্রাম নিন যথেষ্ট পরিমানে তরল খাবার গ্রহন করুন। কফ বা থুতু নিরাপদ স্থানে ফেলুন এবং হাঁচি কাশির সময় মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন।
অজানা কারনে তীব্র জ্বর
অনেক সময় কিছু রোগীকে দীর্ঘ মেয়াদি জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা যায় যার সঠিক কারন জানা যায়না এবং অনেক অষুধ খাবার পরেও নিরাময়ের কোনো লক্ষন দেখা যায়না। এমন একটি জ্বরই পি,ইউ,ও বা Pyrexia of Unknown Origin. সাধারনত এই জ্বর তিন সপ্তাহের বেশী স্থায়ী হয় এবং রোগীর তাপমাত্রা ৩৮.৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশী থাকে।
টিবি, ম্যালেরিয়া, কালাজর, লিভারের ফোড়া, হৃদপিন্ডের ইনফ্লামেশন (Endocarditis), কিছু ক্যান্সার জাতীয় রোগ, এসএলই(SLE), পিএএন(PAN), গ্রানুলোমেটাস ডিজিজ (Granulomatous disease), শিরার ইনফ্লামেশন (Thromboflebitis) সহ নানা কারনে পিইউও হতে পারে।
এ ধরনের রোগীকে জ্বরের কারন নির্নয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব, সিরাম, এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, লিভার ও বোন মেরো বায়োপসি সহ নানাবিধ পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হতে পারে। PUO এর নিরাময় সম্ভব। অভিজ্ঞ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এর তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি থেকে এ রোগের চিকিৎসা করানো উচিত।
বার্ড ফ্লু (Bird flu, Avian flu)
বার্ড ফ্লু হলো একধরনের ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় রোগ। ভাইরাস বাহিত এই রোগটি পাখিদের সংক্রমিত করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ নামক এই ভাইরাসটির জন্য একেক সময় বার্ড ফ্লু পাখির মহামারি হিসেবে দেখা দেয়ায় প্রান হারিয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন পাখি। বার্ড ফ্লুকে, বার্ড
ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং এভিয়ান ফ্লু নামেও ডাকা হয়। পাখিরা খুব দ্রুত একস্থান
থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে দেখে এই রোগ পুরো বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়তে
খুব একটা সময় লাগেনা।
আর প্রকৃতিতে স্বাধীন ভাবে বিচরন করা পাখি থেকে গৃহপালিত পাখিতে এই রোগ ছড়ানোও খুব সহজ ব্যাপার, এর ফলে পোল্ট্রি ফার্মাররা প্রচুর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে বারবার, এমন কি অনেকে একদম নিঃস্ব ও হয়ে গেছে।শুধু এতটুকু হলেও কথা ছিলোনা, পাখির এই রোগটি ছড়াতে শুরু করলো খামারিদের মধ্যেও। ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ ভাইরাসের চারটি সাব টাইপ H5N1, H7N3, H7N7 এবং H9N2 মানুষের মধেও রোগ ছড়ালো ব্যাপক ভাবে, এমনকি মানুষের মৃত্যুর কারন হয়ে দাড়ালো। এর মধ্যে H5N1 ভাইরাসটি মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং বর্তমানে বার্ডফ্লু নিয়ে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য একক ভাবে এই ভাইরাসটিই দায়ী।
বার্ড ফ্লু এর লক্ষন গুলো সাধারন ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই, জ্বর আসা, ঠান্ডা লাগা, হাঁচি, কাশি, মাথা ব্যথা, শ্বাস
কষ্ট এই সব। তাই হঠাৎ করেই কারো বার্ড ফ্লু হয়েছে কিনা বোঝা বড় দুস্কর।
তবে কারো কারো ক্ষেত্রে যেমন এই রোগ একদম স্বল্প মাত্রায় হয় তেমনি কারো
কারো ক্ষেত্রে এটা দ্রুত তীব্র রূপ ধারন করে এবং রোগীর মৃত্যু বয়ে আনে।
সহজ করে বললে বলতে হবে বার্ডফ্লু হলো ইনফ্লুয়েঞ্জার তীব্র একটি রূপ।
বার্ড
ফ্লু পাখি থেকে মানুষে ছড়ালেও মানুষ থেকে মানুষে অত সহজে ছড়িয়ে পড়তে
দেখা যায়না তবে ইদানিং কালের মহামারি আকারে দেখা যাওয়া H5N1
ভাইরাসটি মানুষ থেকেও মানুষে ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাই কোথাও একই সাথে অনেক
মানুষের যদি ফ্লু জাতীয় রোগ তীব্র মাত্রায় দেখা যায় তা হলে তাদের বার্ড
ফ্লু সন্দেহ করে চিকিৎসা নেয়া শুরু করা উচিত।
বার্ডফ্লু সন্দেহ হলে রক্তে এই ভাইরাসের এন্টিবডি পি,সি,আর
পদ্ধতিতে দেখে বোঝা যায় ভাইরাসটি মহামারির ভাইরাস কিনা। এছাড়া গলার
পেছনের দিক থেকে ন্যাজোফেরিঞ্জিয়াল সোয়াব নিয়ে ভাইরাস কালচার করে রোগটির
ব্যাপারে পূর্ন নিশ্চিত হওয়া যায়। টেমিফ্লু বা ওসেল্টামিভির নামক ভাইরাস
নাশক অসুধ ব্যবহারে বার্ডফ্লুর ভাইরাস কাবু হয়ে যায়। তাই রোগের সন্দেহ
হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অসুধ সেবন শুরু করে দেয়া উচিত।
আক্রান্ত
পাখিদের বিষ্ঠায় মাত্রাতিরিক্ত পরিমানে এই ভাইরাস পাওয়া যায়। তাই যারা
ঘরে বিভিন্ন পাখি পালন করেন তাদের ঘরে পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে জীবানু ঢুকে
যেতে পারে, শিশুরা
যেহেতু যেকোন কিছু হাত দিয়ে স্পর্শ করে ফেলে তাই তাদের আক্রান্ত হবার ভয়
সবচেয়ে বেশী। মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম হলো হাঁচি বা
কাশি থেকে নির্গত বাষ্প (Droplet, Aerosol), তাই
আক্রান্ত ব্যক্তির ৫-৬ ফুট দূরে থাকলে এর সংক্রমন থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কিংবা কাশির বাষ্পকনা নিত্য ব্যবহার্য্য কোন
স্থানে বা পাত্রে জমে থেকেও সংক্রমন ঘটাতে পারে। ঐ পাত্র বা স্থান (যেমন
টেবিল, চেয়ার, টেলিফোন, দরজার হাতল ইত্যাদি) একজন সুস্থ্য ব্যক্তি যদি হাত দিয়ে স্পর্শ করে এবং ঐ হাত দিয়ে তার নাক, মুখ
বা চোখ স্পর্শ করে তাহলে তা থেকে সুস্থ্য ব্যক্তির বার্ড ফ্লু হতে পারে।
যেহেতু জনসমাগম বেশী এসকল স্থানে কারো এই রোগ থাকতে পারে তাই ঐ সকল স্থানের
কোনো কিছু স্পর্শ করে সাথে সাথে নাকে, মুখে বা চোখে হাত দেয়া যাবেনা। তবে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিলে হাতে সোয়াইন ফ্লুর ভাইরাস থাকেনা। এজন্য জনসমাগমে বা Public place এ যেতে হয় এমন লোকজনদের দিনে বেশ কয়েকবার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
একটা প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই থাকে, বার্ড ফ্লু হলে কি মুরগীর মাংশ বা ডিম খাওয়া যাবেনা? এর উওর হলো যাবে। ৭০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের উপর তাপমাত্রায় বার্ডফ্লু এর জীবানু বেচে থাকতে পারেনা, তাই
পুরো সিদ্ধ করা মাংশ বা ডিম খাওয়া যাবে। তবে মাংসের কোনো অংশ কাঁচা থাকলে
বা ডিম এর কুসুমও যদি কাঁচা থেকে যায় তবে এ রোগ সংক্রমের আশংকা থেকেই
যায়। রান্না করা মাংস নুতন করে বার্ডফ্লু আক্রান্ত হতে পারেনা। তবে পরিবহন
এর সময় বিশেষ সতর্কতা গ্রহন করা আবশ্যক, কারন এসব ক্ষেত্রে অসতর্ক হলে বার্ডফ্লুর জীবানু রয়েই যেতে পারে।