প্যানক্রিয়াটাইটিস
প্যানক্রিয়েজ (Pancreas) বা অগ্নাশয় পেটের ভেতরে অবস্থিত অত্যন্ত জরুরী একটি অঙ্গ। হরহামেশা এটা রোগাক্রান্ত হয়না বলে এর সাথে আমাদের পরিচয় একটু কম বললে ভুল হবেনা। এর দুটি কাজ, এক হলো ইনসুলিন (Insulin), গ্লুকাগন (Glucagon) ও সোমাটোস্টেটিন (Somatostatin)এর মতো অত্যন্ত জরুরী হরমোন তৈরী করা আর দ্বিতীয়টি হলো জরুরী এনজাইম (Enzyme)নিঃসরন করে হজম বা বিপাকে সাহায্য করা, বিশেষ করে আমরা চর্বি জাতীয় যেসব খাবার খাই প্যানক্রিয়াজ এর এনজাইম ব্যতিত তাদের হজম করা কিন্ত একে বারেই দুঃসাধ্য।
প্যানক্রিয়াটাইটিস (Pancreatitis) হলো
প্যানক্রিয়েজ এর প্রদাহ জনিত একটি রোগ। পৃথিবীতে যত লোকের পেটে ব্যথা হয়
তার শতকরা প্রায় তিন শতাংশই এই কারনে হয়ে থাকে। প্যানক্রিয়াটাইটিস হলে খুব
তীব্র এবং যন্ত্রদায়ক পেট ব্যথা হয়, ব্যথাটা প্রথমে পেটের উপড়ের দিকে মাঝামাঝি থাকে পরে এটা পেটের দুপাশে কিংবা সমস্ত পেটেই ছড়িয়ে পরে, এমনকি
এটা বুকেও চলে যেতে পারে। শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথাটা
সরাসরি পেটের পিছনের দিকে ছড়িয়ে পরে। এই ব্যথার ধরন শুধু যে খুব তীব্র তাই
না এটা খুব দ্রুত খুব জঘন্য রকম তীব্রতায় পৌছে যেতে পারে, আর এটা স্থায়ী হতে পারে কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত।
সচরাচর
অন্য পেট ব্যথা গুলো যেমন ব্যথার অসুধ প্রয়োগে কমে আসে প্যানক্রিয়াটাইটিস
এর ব্যথা কিন্ত অতটা সুবোধ নয়। খুব উচ্চ মাত্রার ব্যথানাশক এবং ঘুমের অসুধ
দিয়ে এই ব্যথাকে নিয়ন্ত্রনে আনতে হয়। রোগীরা অনেক সময় নামাজের সিজদা দেবার (Mohammadan’s prayer position) মতো উপুড় হয়ে শুকে থাকলে ব্যথা অনেকটা লাঘব হতে দেখা যায়। এই ব্যথার সাথে রোগীর শ্বাস কষ্ট, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, হেঁচকি (Hiccough) হওয়া
এসব উপসর্গও দেখা যায়। রোগী একদম দুর্বল হয়ে যায় এবং এসময়ে তার তীব্র জ্বর
থাকাটাও অস্বাভাবিক নয়। অনেক রোগীর এসময়ে পেট এ পানি জমে পেট ফুলে যায় এবং
পেটের উপড়ের অংশ শক্ত হয়ে যায়। তাছাড়া ঘন ঘন শ্বাস টানা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ব্লাডপ্রেসার অন্ত্যন্ত কমে রোগীর শক (Shock) এ চলে যাওয়া, পায়ে লাল দানাদার ফুটকি উঠা সহ নানাবিধ উপসর্গ এ রোগকে ঘিরে আবর্তিত থাকে।
প্যানক্রিয়াটাইটিস হঠাৎ করেই হয়, আর এমনটি হবার শতকরা ৫০-৭০ ভাগ কারন হলো যে পথ দিয়ে প্যানক্রিয়েজ এর এনজাইম নিঃসরন হয় তার কোথাও পাথর (Biliary stone) হওয়া। শতকরা ২৫ ভাগ ক্ষেত্রেই এটি কিন্ত হয় অতিরিক্ত মদ্যপান করার কারনে, তাই
এলকোহল সেবিদের হঠাৎ পেটে ব্যথা হলে প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়েছে ভেবেই
চিকিৎসা শুরু করা উচিত। এর বাইরে অন্য কারনে যে এই রোগ হয়না তা কিন্ত নয়, প্যানক্রিয়াজ এর ক্যান্সার হলে, ই,আর,সি,পি (ERCP) করার পর, পেটের অন্য অপারেশনের পর, কিছু অসুধ সেবনে (এজাথ্রিওপিন, থায়াজাইড, ইস্ট্রোজেন ইত্যাদি), আঘাত পাবার পর, মাম্পস
বা এই জাতীয় ভাইরাসের ইনফেকশন হলে এমনকি অজানা কিছু কারনেও
প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। তাই চিকিতৎসা শুরুর আগেই নিশ্চিত হয়ে জেনে
নেয়া উচিত কি কারনে এ রোগটি হয়েছে।
প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়েছে কিনা এটা নিশ্চিত করতে শুরুতেই রক্তের বা সিরাম এর এমাইলেজ (Amylase) নামক
এনজাইম এর মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা হয়। যদি এটা স্বাভাবিক এর চারগুন বা
আরো বেশী বেড়ে যায় তবে নিশ্চিত ধরে নিতে হবে যে রোগী প্যানক্রিয়াটাইটিস এ
আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া রোগের কারন নির্ণয়ে আরো কিছু পরীক্ষা করার প্রয়োজন
রয়েছে, এর মধ্যে আছে পেট এবং বুকের এক্সরে, পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, পেটের সিটি স্ক্যান সহ আরো কিছু রক্ত ও প্রসাব পরীক্ষা।
প্যানক্রিয়াটাইটিস হলে রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, হাসপাতালের HDU (High Dependency Unit) বা ICU (Intensive Care Unit) মতো
স্থানে নিবিড় পর্যবেক্ষনেই এধরন এর রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয় তবে রোগের
মাত্রা সাধারন পর্যায়ে থাকলে সাধারন বিছানায় রেখেও এর চিকিৎসা দেয়া যেতে
পারে। শুরুতেই রোগীর মুখ দিয়ে যেকোনো প্রকার খাদ্য, পানীয় এমনকি অসুধ গ্রহন বন্ধ রাখা হয় এবং নাকে নল দিয়ে পাকস্থলির সমস্ত খাদ্য বের করে দেয়া হয়, রোগীর শিরায় স্যালাইনের মাধ্যমে কৃত্রিম খাদ্য এবং অসুধ দেয়া হয় এবং প্রসাবের রাস্তায় একটি ক্যাথেটার (Catheter) বা নল পরিয়ে
দেয়া হয়। প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগীকে ব্যথা নিরসনের জন্য শিরায় উচ্চমাত্রার
ব্যথা নাশক এবং ঘুমের অসুধ দেয়া হয়। রোগের মাত্রা বেশী হলে খুব উচ্চ
মাত্রার এন্টিবায়োটিক ও শিরার মাধ্যমে দেয়া হয়।
চিকিৎসা শুরুর সাথে সাথে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগের কারন খুজে বের করা হয়, কারনটি যদি পিত্তনালিতে পাথর হয়ে থাকে তাহলে ERCP করে
পাথরটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়। সাধারনত এক সপ্তাহের মধ্যেই
প্যানক্রিয়াটাইটিস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনে চলে আসে তবে অনেক সময় তীব্র মাত্রার
প্যানক্রিয়াটাইটিস হলে প্যানক্রিয়াজ নষ্ট (Necrosis) হয়ে যেতে পারে, ঐ সকল ক্ষেত্রে জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন করে রোগীর নষ্ট হয়ে যাওয়া প্যানক্রিয়াজ ফেলে দেয়া হয়।
আসলে প্যানক্রিয়াটাইটিস বেশ জটিল এবং মারাত্মক একটি রোগ। এ রোগে কিডনি, ফুসফুস সহ অনেক অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে এবং অনেক সময়ই রোগের মৃত্যু হতে পারে, তবে
মৃদু মাত্রার প্যানক্রিয়াটাইটিস এ মৃত্যুর হার ১% এর চেয়েও কম। তীব্র
মাত্রার প্যানক্রিয়াটাইটিস হলে মৃত্যুর হার বেড়ে শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ
পর্যন্ত হতে পারে, আর
প্যানক্রিয়াজ নষ্ট হয়ে গেলে বা নেক্রোসিস হলে মৃত্যুর হার শতকরা ৫০ ভাগ
পর্যন্ত হতে পারে। তাই তীব্র পেটে ব্যথা হওয়া রোগী নিয়ে অবহেলা করার কোনো
সুযোগ নেই। মদ্যপান থেকে দূরে থাকলে যেমন এ রোগ থেকে অনেকাংশে নিস্তার
পাওয়া যায় তেমনি পিত্তনালীতে পাথর (Biliary stone) থাকলে যথাসময়ে তার অপারেশন করিয়েও এ রোগ হবার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যেতে পারে।